ফিচার

মহররম ও আশুরার তাৎপর্য

স্বদেশ খবর ডেস্ক
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। ইসলামি পরিভাষায় আরবি বর্ষপঞ্জি হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলে। আশুরা শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে। এর অর্থ দশ। আর আশুরা মানে দশম। অন্য কথায় বলতে গেলে এ মাসের ১০ তারিখ ১০টি বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণেও এ তারিখকে আশুরা বলা হয়।
সৃষ্টির পর থেকে আশুরার দিনে অনেক তাৎপর্যম-িত ঘটনা ঘটেছে বিধায় এই দিনের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অনেক বেশি। এ কারণে মহররম মাসও গুরুত্বপূর্ণ।
আশুরার দিন বা মহররমের ১০ তারিখ যেসব তাৎপর্যময় ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, সংক্ষেপে সেগুলো হলো :
১. এ দিনে আল্লাহ তাআলা পৃথিবী সৃষ্টি করেন। আর এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। ২. এ দিনে হজরত আদম (আ.) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসেন। মহররমের ১০ তারিখে আল্লাহপাক আদম (আ.)-এর দোয়া কবুল করেন এবং এ দিনে হযরত আদম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আ.)-এর সঙ্গে আরাফার ময়দানে সাক্ষাৎ করেন। ৩. হজরত নুহ (আ.)-এর জাতির লোকেরা আল্লাহর গজব মহাপ্লাবনে নিপতিত হওয়ার পর ১০ মহররম তিনি ঈমানদারদের নিয়ে নৌকা থেকে ভূমিতে অবতরণ করেন। ৪. হজরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকু-ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ৪০ দিন পর ১০ মহররম মুক্তি লাভ করেন। ৫. হজরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগ করার পর মহররমের এ দিনে আল্লাহর রহমতে সুস্থতা লাভ করেন। ৬. হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ১১ ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে কূপে পতিত হন এবং এক বণিক দলের সহায়তায় মিসরে গিয়ে হাজির হন। তারপর আল্লাহর বিশেষ কুদরতে তিনি মিসরের প্রধানমন্ত্রী হন। ৪০ বছর পর ১০ মহররম পিতার সঙ্গে মিলিত হন। ৭. হজরত ইউনুস (আ.) নিজ জাতির লোকদের প্রতি হতাশ হয়ে নদী অতিক্রম করে দেশান্তরিত হওয়ার সময় নদীর পানিতে পতিত হন এবং মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেট থেকে তিনি আল্লাহর রহমতে ৪০ দিন পর মুক্তি পান ১০ মহররম তারিখে। ৮. হজরত মুসা (আ.) ফেরাউনের অত্যাচারের কারণে তাঁর দলবলসহ অন্যত্র চলে যান। পথিমধ্যে নীল নদ পার হয়ে তিনি ফেরাউনের হাত থেকে আশুরার দিন মুক্তি পান। আর ফেরাউন তার দলবলসহ নীল নদের পানিতে ডুবে মারা যায়। ৯. হজরত ঈসা (আ.)-এর জাতির লোকেরা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করলে মহররমের ১০ তারিখ আল্লাহপাক তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে মুক্তি দান করেন। ১০. মহররম মাসের ১০ তারিখ কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার অবতারণা হয়। এদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইমাম হোসাইন কারবালা প্রান্তরে শাহাদত বরণ করেন।
ইসলামের ইতিহাসে ওপরে উল্লিখিত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলো মহররম মাসে সংঘটিত হওয়ার কারণে এ মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অতি সম্মানিত, বরকতময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। আশুরার এ দিনে অনেক আম্বিয়ায়ে কেরাম আল্লাহপাকের সাহায্য লাভ করেন এবং কঠিন বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি লাভ করেন। এই সাহায্যের শোকরিয়া হিসেবে নবী-রাসুল ও তাঁদের উম্মতরা এদিনে রোজা পালন করতেন।
ওপরের আলোচনা থেকে আমরা আশুরার দিনে সংঘটিত কতগুলো ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে আশুরার গুরুত্ব ও ফজিলত জানতে পারলাম। তবে এসব ঘটনার কোনো-কোনোটির বর্ণনাসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা বিষয়ে কারো কারো দ্বিমত আছে। কিন্তু এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই যে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এই দিনটি মহিমান্বিত ও তাৎপর্যময়। এ দিনটিকে মুসলমানরা পবিত্র ও বরকতময় হিসেবে পালন করছেন। কিন্তু অতীতের সব ঘটনা ছাপিয়ে ৬১ হিজরি সনের ১০ মহররম এমন একটি দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার অবতারণা হয়, যার কাছে বাকিসব ঘটনা ¤¬ান হয়ে যায়। ফলে এ দিনটি অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের রূপ নেয়।
১০ মহররম মহানবী (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমা (রা)-এর কলিজার টুকরা হজরত হোসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে শাহাদত বরণ করেন। ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসের সব ঘটনাকে অতিক্রম করে একটি শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে আজও মুসলমানদের বুক বিদীর্ণ করছে। স্মরণকালের ইতিহাসে কারবালার দুঃখজনক ঘটনার সঙ্গে আশুরার সম্পর্ক যেন একাকার হয়ে আছে। এদিন থেকে আশুরা নতুন এক মাত্রা লাভ করেছে।
মহররম ও আশুরা এখন অন্য রকম এক চেতনা নিয়ে পালিত হচ্ছে। মহররম মাস ও আশুরার দিন এখন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ত্যাগ, শক্তি ও প্রতিবাদের কথা। কারবালার মর্মান্তিক স্মৃতি থেকে মুসলমানরা শুধু শোকের আবহই লাভ করছেন না, তারা জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ারও চেতনা খুঁজে পাচ্ছেন। মহররম ও আশুরা আমাদের ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অসত্য ও অন্যায়কে প্রতিরোধ করার সাহস জোগায়। আশুরা আমাদের আল্লাহর ওপর ভরসা করে জুলুমের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার জন্য সদাপ্রস্তুত থাকার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
আসুন, পবিত্র মহররম মাস ও আশুরার দিনে (১০ মহররমের আগে বা পরে এক দিনসহ) আমরা রোজা রেখে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ লাভ করার সুযোগ গ্রহণ করি। বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার ও দান-খয়রাত করে এবং পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ রাব্বুল আলআমিন মহররম ও আশুরা থেকে আমাদের অফুরন্ত ফজিলত দান করুন। আমিন!