প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

মাদকের বিস্তার সারাদেশে: প্রতিরোধে দরকার সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিস্তার ও মাদকাসক্তি বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। শুধু শহর নয়, গ্রাম পর্যায়েও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, প্যাথেডিনসহ নানা নেশাজাতীয় দ্রব্য। মাদকের এ ভয়াবহ আগ্রাসনের কারণে সমাজ ও পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসছে, বেড়েছে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে। ধনী-দরিদ্র উভয় পরিবারের কিশোর-কিশোরী, বিশেষ করে তরুণসমাজ বিপথগামী হচ্ছে। সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে অধিক সক্রিয় করে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে রক্ষা করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক উদ্যোগের অভাবে মাদকের বিস্তার রোধে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকের বিস্তার রোধে সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

মাদকের সাম্রাজ্য বেড়েছে
মাদক শুধু কৈশোর-তারুণ্যে ছোবল বসায়নি। কাজ না পেয়ে হতাশ, শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেনি, চাকরিজীবনে সাফল্য পায়নি, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিংবা পারিবারিক জটিলতায় আছে, এমন মানুষেরাই শুধু মাদকে দংশিত হচ্ছে না, সাফল্যের চূড়ায় বসে থাকা মানুষেরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। বিত্ত ও সাফল্যের প্রদর্শন বা বিলাস করতে গিয়েও অনেকে মাদকের কাছে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গদোষে মাদককে বন্ধু ভেবে নেয়ার ঘটনা আছে আগের মতোই। সব কিছুর যোগফল হলো, মাদকের সাম্রাজ্য বেড়েছে।
আগে এক মহল্লায় এক বা দু’জন পাওয়া যেত যাদের মাদকে আসক্তি আছে। এখন এক মহল্লায়, এক অ্যাপার্টমেন্টের প্রায় ঘরে ঘরে মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। পেশাজীবীদের মধ্যে গাড়িচালক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সংবাদকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে শিক্ষকরাও এখন মাদকের কালো জলে সাঁতার কাটছে।
মাদক সকল সভ্যতাতেই ছিল। কোনো রাষ্ট্রই কোনো কালে মাদকের পীড়নমুক্ত ছিল না, বাংলাদেশও নয়। গাঁজা, আফিম, হেরোইন, প্যাথেড্রিন, ফেন্সিডিল পেরিয়ে এসে ইয়াবায় এখন হাবুডুবু খাচ্ছে দেশ। ইয়াবার বিস্তার যেকোনো মাদকের চেয়ে ভয়াবহ। অন্যান্য যেকোনো মাদক গ্রহণের সময় আশপাশের মানুষেরা আঁচ করতে পারে। কিন্তু ইয়াবা একটি ট্যাবলেট মাত্র। এটি সেবন যেকোনো মাদকের চেয়ে সহজ হওয়ায় গ্রহণের মাত্রা ও পরিমাণ বেড়েছে। বলা হচ্ছে, কোনো কোনো পেশার মানুষ ও শিক্ষার্থীরা রাত জেগে থাকতে বা দীর্ঘক্ষণ কাজের উদ্দীপনা পাওয়ার লোভে ইয়াবা সেবন করছে। নারীরা স্লিম বা জিরো ফিগারের আশায় ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে। যদিও তাদের এই উদ্দীপনা ও আশা ক্ষণিকের মাত্র। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে। হারিয়ে ফেলে কর্মক্ষমতা। আর নারী হারায় তাদের রূপ-লাবণ্য।

মাদকের চোরাচালান ও এর
বাণিজ্যিক প্রসার কেন বাড়ছে
দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে আনুষ্ঠানিকভাবে। সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন মাদকবিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করছে। গুণীজন, তারকা শিল্পী ও খ্যাতিমান কলাকুশলীরাও মাদকবিরোধী অভিযানে যুক্ত হচ্ছেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও মাদকবিরোধী নানা উদ্যোগ ও অভিযান চলছে, তবুও মাদক আরো কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে।
মাদকের চোরাচালান ও এর বাণিজ্যিক প্রসার বাড়ছে কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই আন্তরিকতা ও সততার ঘাটতি আছে। দেশি-বিদেশি অনুদান খরচ করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংগঠন মাদকবিরোধী অভিযানের আয়োজন করছে। যারা আয়োজক তারাও মাদক থেকে দূরে নয়। তারকা ও গুণীজন যারা মাদককে ‘না’ বলতে বলছেন, তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে মাদকে অভ্যস্ত। কেউ কেউ মাদকসহ পুলিশের কাছে আটকও হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যতটা মাদক আটক করছে, তারচেয়ে বেশি অভিযোগ তাদের কতিপয় সদস্য ও কর্মকর্তা মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মাদক চোরাচালানে রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত থাকা, প্রশ্রয় দেয়ার বিষয়টি এখন খোলামেলা। এই বাস্তবতায় মাদক নিয়ে আমাদের লোকদেখানো বা দেশদেখানো সব উদ্যোগই ভেস্তে যাচ্ছে। পরিণাম হিসেবে রাষ্ট্র পাচ্ছে ঝিমিয়ে পড়া প্রজন্ম, অক্ষম জনশক্তি।

মাদকাসক্তরাই সন্ত্রাসী কাজে জড়িত
মাদকের নাটের গুরু ধূমপান। মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী। এর মধ্যে ৪৪ ভাগই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজে জড়িত। বর্তমানে তামাকবিরোধী আইন অনেকটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে। সিগারেট-বিড়ির বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে, জনসমক্ষে ধূমপান করলে জরিমানার বিধানও আছে। কিন্তু অন্য মাদকের দিকে তরুণ ও কিশোররা ঝুঁকে পড়ছে। এই তরুণ মাদকাসক্তরা তৈরি করছে কিশোর গ্যাং। এখন নেশার রাজা হয়েছে ইয়াবা। এর প্রতিরোধে যেন কোনো সমাধানই কাজে আসছে না।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান এমন জায়গায় যেখানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ মাদক চোরাচালানের ট্রানজিট রুট হিসেবে এদেশকে ব্যবহার করে। বলা যায়, ভৌগোলিক কারণে আমাদের দেশে মাদকের প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। অন্যান্য মাদকের চলাচল কমানো গেলেও ইয়াবা কমানো যাচ্ছে না। কারণ এটি সহজে বহনযোগ্য।
তাছাড়া বাংলাদেশের কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে এখন লাখ লাখ ইয়াবা কারিগরের বসবাস। প্রায় সব রোহিঙ্গাই ইয়াবা বানাতে জানে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছে রোহিঙ্গারা এখন তুরুপের তাস। তাদের আর কষ্ট করে বিজিবির চোখ এড়িয়ে নাফ নদীর ওপার থেকে ইয়াবার চালান নিয়ে আসতে হয় না। রোহিঙ্গারাই লাখ লাখ পিস ইয়াবা তৈরি করে দেয় ব্যবসায়ীদের। তারা নিজেরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম তো চালাচ্ছেই উপরন্তু ইয়াবা তৈরি করে দেয়ার মাধ্যমে তারা দেশে নতুন নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ বিশেষ করে কিশোর গ্যাং গ্রুপ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে প্রবলভাবে।

চাহিদার লাগাম টানতে না পারায়
নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জোগান
মাদকের চাহিদা কমানোর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা আর জোগানের লাগাম টেনে ধরার জন্য প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা। কিন্তু চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা কাজে আসছে না। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য নিজেরাই মাদক সেবন ও ব্যবসায় জড়িয়ে যাওয়ার ফলে মাদকের বিস্তার রোধে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

মাদকের বিপক্ষে জনমত তৈরি না হলে
সমাজ থেকে মাদক নির্মূল অসম্ভব
ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক নিয়ে সারাদেশের অভিভাবকদের মনে বিরাট উৎকণ্ঠা। ঢাকা এবং সারাদেশে মাদক যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করছে, তা দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একার পক্ষে নির্মূল করা সম্ভব নয়। বাবা-মা তার সন্তানের প্রতি নজর না রাখলে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন বন্ধ হবে না। এমনকি যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি জেলা, প্রতিটি শহর এবং প্রতিটি এলাকার মানুষ মন থেকে মাদককে ‘না’ বলবে, মাদকের বিপক্ষে জনমত তৈরি না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজ থেকে মাদক নির্মূল হবে না।
কিভাবে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে? কিভাবে মাদক বাজারজাত হচ্ছে? কী করে মাদকের আগ্রাসন বন্ধ এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব Ñ এ সম্পর্কে জানতে হবে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও চীনের মতো উন্নত দেশগুলো এক সময় মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনে বন্দি ছিল। তারা মৃত্যুদ-ের মতো শাস্তি ধার্য করে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করেছে। আইনকে কাজে লাগিয়ে মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাফিয়া চক্রকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তার করলেও তারা জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। এই জায়গাগুলোতে সরকারকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, দেশে ৭০ লক্ষাধিক মাদকসেবী রয়েছে। এর সঠিক সংখ্যা বলা বেশ কঠিন হলেও আসলে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। এই বাস্তবতায় কেবল সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে সমাজের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবারকে। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থানে ঠিক থাকলে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল সম্ভব। মাদকাসক্তদের প্রথমেই পরিবার ও সমাজ থেকে সচেতন করতে হবে। চিকিৎসা করাতে হবে। এমনকি চিকিৎসা শেষে তাকে আরও ১ বছর নজরদারিতে রাখতে হবে।
হতাশা, বেকারত্ব, খেলাধুলা ও সময় কাটানোর জায়গার অভাবই কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ বলে ধরে নেয়া হয়। এই জায়গায়ও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দিতে হবে।

মাদকাসক্ত সন্তানকে দোষারোপের
আগে বাবা-মারও দর্পণে
নিজের চেহারা দেখা উচিত
সন্দেহ নেই, দেশ পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় মাদক কিংবা ফ্যাশন, বিউটি কনটেস্ট এবং হাল আমলের নারীদের সৌন্দর্যের যে প্রতিযোগিতা সেটিও চলে এসেছে। নারী অধিকারের কথা বলা হচ্ছে, নারীদের আত্মসম্মানের কথা বলা হচ্ছে বটে কিন্তু এখানে যখন জিরো ফিগারের কথা শোনা যায় তখন কিন্তু নানাবিধ প্রশ্ন চলে আসে। জিরো ফিগারের জন্য অনেক মেয়েই ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে।
পারিবারিক বন্ধন একটা বিশাল বিষয়। আমাদের একটি পারিবারিক বন্ধন আছে বা ছিল, ধর্মীয় মূল্যবোধ আছে, কিছু অনুশাসন আছে। যৌথ পরিবার ভেঙে এখন আমরা একক পরিবারের দিকে ঝুঁকছি। সেখানে একজন বাবা, একজন মা তার সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না। অনেক সময় মা-বাবা উভয়ই পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে একক পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বাসায় একা থাকে। এভাবে এক সময় তারা মাদকে আসক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। তাছাড়া আমরা অনেক বেশি ক্যারিয়ার সচেতন হয়ে অসম প্রতিযোগিতায় ঢুকে যাচ্ছি। টাকার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে সন্তানকে মাদকাসক্ত বানিয়ে ফেলছি। তারপর সব দোষ ঢেলে দিচ্ছি সন্তানের বন্ধু-বান্ধবের ওপর। শুধু মাদকাসক্ত সন্তানকে দোষারোপ করার আগে বাবা-মারও দর্পণে নিজের চেহারা দেখা উচিত। তাদের ভেবে দেখা উচিত, সন্তানকে সময় না দিয়ে তারা যে টাকার পেছনে ছুটেছেন, সেই টাকার গরমেই তার সন্তানটি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে কি না!

দেশের মোট মাদকসেবীর মধ্যে
৪১ ভাগ বেকার, ১৪ ভাগ শিক্ষার্থী
পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৪৫টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বছরে ৯ হাজার ২২০ জন মাদকসেবীর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যেখানে প্রতি বছর নতুন ৫ লাখ মাদকসেবী যুক্ত হচ্ছে। এভাবে প্রতিনিয়তই মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর দেশের মোট মাদকসেবীর মধ্যে ৪১ ভাগই বেকার এবং ১৪ ভাগ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ৫৫ ভাগ লোক মাদকের টাকা জোগাতে কারো না কারোর ওপর নির্ভরশীল। কোনো না কোনোভাবে এরা মাদকের টাকা জোগাড় করছেই। মাদকসেবীদের থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত তাদের চাহিদা বাড়ছে।
শিক্ষক কি জানেন তার ছাত্র মাদকাসক্ত, বাবা-মা কি জানে তার সন্তান মাদকাসক্ত? আমাদের বিচার ব্যবস্থায় প্রতি বছর ৫০ হাজার মামলা আসে। কিন্তু সমাধান হয় মাত্র হাজারখানেকের। ফলে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে, মাদকের বিস্তার ঘটছে।

নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের
ফলে মাদকের আগ্রাসন বাড়ছে
এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকার মাদক কেনা-বেচা হয়। ইয়াবাসেবীদের বয়স গড়ে ১৫ থেকে ২৯ বছর। এটি সমাজের জন্য বেশ ভয়াবহ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনও অনেক ক্ষেত্রে এই মাদক পরিবহনে জড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন আগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তার গাড়িতে ৩০ লাখ টাকার ইয়াবা পাওয়া যায়। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও মাদক ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। কিন্তু এ দেশগুলো মাদক সেবনে মৃত্যুদ-ের বিধান কার্যকর করায় তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। একজন ইয়াবাসেবী নিজের পরিবার, অফিস ও সমাজের সবাইকে অস্বস্তিতে রাখে। তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, ফলে সবার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে। সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। এই অবস্থা প্রতিরোধে কঠিন আইন করা প্রয়োজন। আইনের বাস্তবায়নও জরুরি। এ জন্য অপরাধ দমনে যারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভূমিকা রাখছে তাদের পুরস্কৃত করতে হবে।

মাদক ব্যবসায়ীরা আইনের
ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যায়
মাদক সমস্যার মূলে রয়েছে আইন প্রয়োগকারী, তদন্তকারী কর্মকর্তার ত্রুটিপূর্ণ জব্দতালিকা। যে কারণে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যায়।
পর্যায়ক্রমে সবার অবহেলা এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখে। অনেক সময় দেখা যায় মূল ব্যবসায়ী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে কিন্তু বহনকারীরা ধরা পড়ে। গডফাদাররা বেঁচে যায়। এতে ন্যায় বিচার হয় না। দেখা যায় যারা মাদক ব্যবসায়ী তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন। বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিবেচনায় নেয়া উচিত। আরেকটি বিষয় জনগণকে বিবেচনায় নিতে হবে; সেটি হলো মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তবেই মাদকের ভয়াবহতা কমিয়ে আনা যাবে।

মেধা, মনন, শারীরিক শক্তি
সব ধ্বংস করে দিচ্ছে মাদক
মানুষের মস্তিষ্কে একটি জায়গা আছে যেখানে ভালো লাগা ও খারাপ লাগার তীব্র অনুভূতি সাড়া দেয়। যদি কোনোভাবে এই জায়গাটি উদ্দীপিত করা যায় তাহলে মানুষ আনন্দিত হয়। মাদকের এই ভয়াবহ ক্ষমতা আছে মানুষকে সেভাবে উদ্দীপিত করার। মাদকের আছে সেই বৈশিষ্ট্য, যা গভীর গহনে উদ্দীপিত করতে পারে। প্রথমদিকে মানুষ শখ করে মাদক নেয়। পরে যখন তারা এর প্রতি আসক্ত হয়ে যায় তখন তাকে অস্থির করে ফেলে। ভীষণ যন্ত্রণায় ফেলে দেয়। সেই যন্ত্রণা থামাতেই মূলত মাদক নিতে হয়। মাদক মেধা, মনন, শারীরিক শক্তি সব ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাই মাদককে বিদায় দিতে হবে সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। সরকার ও প্রশাসনের একার পক্ষে এ কঠিন কাজ করা আদৌ সম্ভব নয়।

জনসচেতনতা তৈরিতে দেশজুড়ে
৫ লাখ মসজিদের ইমামকে
কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশের ৫ লাখ মসজিদের ইমাম হলেন একটি কার্যকর অনানুষ্ঠানিক মিডিয়া। প্রশাসন যদি এই ৫ লাখ ইমামকে মিডিয়া হিসেবে কাজে লাগাতে পারে তাহলে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতার বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে যাবে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মাদক বন্ধ করার জন্য অন্তর থেকে চেষ্টা করতে হবে। মসজিদের ইমামদের মাদকবিরোধী প্রচারণা চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে ঈসা নবী, মুসা নবীর জীবনীভিত্তিক গল্প বলার চেয়ে বর্তমান বাস্তবতায় মাদকের বিরুদ্ধে কথা বললে তা প্রতিটি পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

শেষ কথা
বাংলাদেশে ইয়াবা নামের মাদকের প্রবেশ ও বিস্তার বলতে গেলে অবাধ। মূলত মিয়ানমার থেকে আগত ইয়াবা টেকনাফ হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গাদের কারণে। শুরুতে দাম একটু বেশি হওয়ায় ইয়াবা সেবনে ধনী ঘরের সন্তানদের প্রাধান্য বেশি ছিল। ক্রমান্বয়ে সহজলভ্য হওয়ায় এর বিস্তার এখন গোটা দেশেই। টেকনাফ অঞ্চলের চোরাকারবারিরা ইয়াবাকে তাদের প্রধান কারবার হিসেবে বিবেচনা করে।
ইয়াবার ভয়াবহতা যখন চরমে তখন ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এরই অংশ হিসেবে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি চলতি বছর আত্মসমর্পণ করেছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ইয়াবা কারবারিদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এবং কৃত অপরাধের জন্য সাজার বিষয়ে নমনীয় হওয়ার আশাও ব্যক্ত করেন।
তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৭৩ জন ইয়াবা কারবারিকে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়নি।
এতে আত্মসমর্পণ ও ইয়াবা কারবার রোধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। যেসব রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারে অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আত্মসমর্পণ না করে এবং তাদের শাস্তির আওতায় না আনা যায়, তাহলে এ কারবার রোধ করা সম্ভব হবে কিভাবে?
র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে ৭০ থেকে ৮০ লাখ লোক মাদক সেবন করে। এতে ১ লাখ কোটি টাকা বছরে খরচ হয়।
বাস্তবে মাদকসেবীর সংখ্যা ও ব্যয় হয়ত আরো বেশি। সম্প্রতি সরকার প্রতিটি বিভাগে একটি করে বিশেষায়িত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে। অথচ এ অর্থ দিয়ে দেশের প্রচুর অবকাঠামো নির্মাণ করা যেত, যা মানুষের কল্যাণমূলক কাজে লাগত। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো গতি পেত এবং মানুষের জীবনমান আরো উন্নত হতো।
এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ স্বদেশ খবরকে বলেন, বিশ্বায়নের এ যুগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একার পক্ষে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া কঠিন। কেননা এটি আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং এর পেছনে বহু সুবিধাভোগী ব্যক্তির হাত রয়েছে। যে কারণে এর বিস্তার, তার অন্যতম কারণ হলো এর সহজলভ্যতা। এতে লাভবান হচ্ছে গুটিকয়েক মাদক ব্যবসায়ী আর ক্ষতির শিকার হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ এবং প্রভাব পড়ছে গোটা অর্থনীতির ওপর। বেড়ে যাচ্ছে অপরাধ, বিশৃঙ্খলা এবং বিচ্যূত আচরণ। ব্যাহত হচ্ছে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনধারা। ক্ষতি হচ্ছে দক্ষ ও শক্তিশালী জনবলের। কেননা মাদক ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্র ও সমাজের বোঝা এবং উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই মাদক ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিটি পরিবার তথা জনগণ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি জামাল উদ্দীন আহমেদ আরো বলেন, খেয়াল রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। এক্ষেত্রে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয়তাসহ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন পুলিশ-র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্যরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব বাহিনীকে সহায়তা করতে পারে। ইয়াবার প্রকোপ যদি আমরা বন্ধ করতে না পারি, তাহলে এখন যারা ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে, তারা জেলে থাকলেও নতুন নতুন ইয়াবা কারবারি তৈরি হতে সময় লাগবে না। সীমান্ত এলাকা ও বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দিকে কঠোর নজরদারি এবং এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছাই পারে ইয়াবার করাল গ্রাস থেকে আমাদের রক্ষা করতে। অবশ্য এক্ষেত্রে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ, সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রকে মাদকমুক্ত করা যাবে না।