কলাম

মাদক: যা মৃত্যুর পথে এগিয়ে নেয়

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক। বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের প্রতি মাদক হুমকিস্বরূপ। মাদক বর্তমানে জাতীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা। মাদক বলতে এমন বস্তুসমূহকে বোঝায়, যা কোনো মানুষকে আসক্ত করে তোলে এবং শরীরে প্রবেশ করার পর কিছু স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার উদ্রেক ঘটায় এবং পুনরায় এসব দ্রব্য গ্রহণে তীব্র আগ্রহ জন্মায়।
মাদক এমন একটি বস্তু, যা অশ্লীলতার মূল কারণ। মাদক বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বিবেক আচ্ছন্ন হলে জ্ঞান লোপ পায়। ফলে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। যার ফলে মানুষ গুরুতর অন্যায় করে থাকে। এক পর্যায়ে মাদক তাকে মৃত্যুর পথে এগিয়ে নেয়।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান হাফিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলেন, বৈশ্বিক মাদক নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে বাস্তবতার বাইরে আবেগ ও ভাবাদর্শই প্রাধান্য পেয়েছে। অতিরিক্ত হোরোইন সেবনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। কিন্তু এর আইন ও শাস্তি আগের মতোই রয়েছে। গত ৫০ বছরে নীতির কারণে মাদকের দ্বারা যে সহিংসতা, দুর্নীতি ও অস্থিতিশীলতার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ সৃষ্টি হয়েছে, তাকে জাতিসংঘ মাদক ও অপরাধসংক্রান্ত অপ্রত্যাশিত ফল বলে আখ্যায়িত করেছে।
কফি আনান তার প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেন, মাদক পাচারসংক্রান্ত অপরাধে ২০১৩ সালে মেক্সিকোতে ১৬ হাজার হত্যাকা- ঘটেছে। বৈশ্বিকভাবে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সফল হয়নি। অনেকে হিসাব করছেন বছরে মাদকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায় খরচ ন্যূনতম ১ বিলিয়ন ডলার তথা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ৩০ কোটি মানুষ মাদক গ্রহণ করছে এবং এজন্য ব্যয় করছে ৩৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ মোটামুটি ২৬ লাখ কোটি টাকা। এটি বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বৃহৎ পণ্যবাজার।
মাদক আমাদের সমাজ ও পরিবারকে ধ্বংস করছে, বিপর্যস্ত করছে আমাদের অর্থনীতিকে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিমাত্রই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি। মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের জন্য কোনো অবদান রাখা সম্ভব নয়, বরং তারা সমাজ ও পরিবারের বোঝা। তারা নৈতিকভাবে স্খলিত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং সামাজিকভাবে ঘৃণিত। যেকোনো অপরাধ করতে তারা দ্বিধাবোধ করে না।
অত্যন্ত উদ্বেগ, দুঃখ আর চিন্তার বিষয় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশু-কিশোর ও যুবসমাজই ক্রমান্বয়ে মাদকের ছোবলে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে মাদকের অপব্যবহার বৃদ্ধির অনেকগুলো সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এর সহজপ্রাপ্যতা। কারণ হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, মদ, গাঁজা ইত্যাদি মাদকদ্রব্যের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সর্বত্র পৌঁছে গেছে।
ইদানীং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকদ্রব্য অজ্ঞাত স্থানে রেখে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে তা বিক্রি করছে। তাছাড়া শরীরের বিভিন্ন অংশে কয়েক বোতল ফেনসিডিল বা কয়েক পুরিয়া গাঁজা, হেরোইন লুকিয়ে বিভিন্ন জায়গায় হেঁটে হেঁটে বিক্রি করে। গাড়ির হেডলাইট, ব্যাটারি, সিটের ও পাটাতনের নিচে অভিনব কায়দায় মাদকদ্রব্য বহন করা হচ্ছে। ফেনসিডিলকে পলিথিনের মধ্যে ঢেলে অভিনব কায়দায় বহন ও বিক্রয় করা হচ্ছে। মুদি দোকান, বিউটি পার্লার, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি ব্যবসার আড়ালে অনেক ব্যবসায়ী মাদক বেচাকেনা চালিয়ে থাকে। বসতবাড়িতে অভিনব কায়দায় পাকা কুঠুরি তৈরি করে সেখানে সঙ্গোপনে ফেনসিডিল লুকিয়ে রেখেও ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
মদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, লাইসেন্সধারী ডিলার তথা ব্যবসায়ীরা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে তাদের দোকান থেকে পারমিটবিহীন অর্থাৎ যাদের মদ কেনার বৈধ অনুমতি নেই তাদের নিকট মদ বিক্রি করে। খুচরা মদ ব্যবসায়ীরা এসব দোকান থেকে মদ কিনে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে। লাইসেন্সধারী ডিলাররা প্রতি বছর বহু ভুয়া পারমিট হোল্ডারের নিবন্ধন করিয়ে তাদের মদ উত্তোলনের পরিমাণ বাড়িয়ে অবৈধ ব্যবসা চালায়। এতে মদের অপব্যবহার বাড়ছে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে মাদকের মতো একটি সামাজিক ক্ষতকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের সচেতন অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মাদক নির্মূলে অবশ্যই সামাজিক প্রতিরোধ সৃষ্টি হওয়া দরকার। মাদক ব্যবহার ও পাচাররোধে বাংলাদেশের রয়েছে নানামুখী কার্যকরী ভূমিকা। তবে এ বাস্তবায়নে সর্বাগ্রে প্রয়োজন জনসাধারণের সার্বিক সহযোগিতা ও গণসচেতনতা। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণকে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে, নচেৎ নয়।
লেখক: সাবেক পুলিশ-র‌্যাব কর্মকর্তা