ফিচার

যেভাবে আমরা আমাদের দাঁত নষ্ট করছি

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী
প্রতিরোধের সহজ সস্তা নিয়মগুলো না মেনে আমরা একটি দাঁতকে চিকিৎসা করে বাঁচাতে কয়েক হাজার টাকা খরচ করি। অথচ দাঁতের যতেœ বিশেষ কয়েকটি ভুল সংশোধন করে সময়মতো সঠিকভাবে যতœ নিলে মূল্যবান দাঁতকে রক্ষা করা যায় অনায়াসেই। যেসব কারণে আমাদের মূল্যবান দাঁত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, তা স্বদেশ খবর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো :
১. দাঁত ব্রাশ অনেকক্ষণ এবং অতি জোরে জোরে : আপনি যদি অনেকক্ষণ ধরে ব্রাশটি দাঁতের ওপর ঘষতে থাকেন তবে দাঁতের ওপরের শক্ত আবরণ (এনামেল) ক্ষয় হয়ে যাবে। কয়েক দিনের মধ্যে তখন আপনার দাঁত অতিরিক্ত ঠা-া পানি বা গরম পানিতে শিরশির করবে, খেতে পারবেন না কোনো কিছু। এর ফলে মাড়ি থেকে দাঁত সরে আসবে। সুতরাং নরম ধরনের ব্রাশ দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওপর থেকে নিচে সব দাঁত আস্তে আস্তে পরিষ্কার করতে হবে।
২. প্রতিদিন বেশি পরিমাণে অ্যাসিডিক ফুড খাওয়া : সোডা, কমলার রস, মদ, খেলাধুলার সময় ব্যবহৃত পানীয়, ক্যান্ডি, কমলা ইত্যাদি খাবারে থাকে প্রচুর অ্যাসিড। একটি বরফের টুকরা যেমন পানিতে ছেড়ে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে গলে অদৃশ্য হয়ে যায়, তেমনি আমাদের দাঁতের সবচেয়ে শক্ত এনামেলও কিন্তু এ ধরনের অ্যাসিডিক ফুডের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যদি এসব খাদ্য খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি বা চিজজাতীয় খাদ্য খাওয়া না হয়, তবে মুখের ভেতর লালার পিএইচ লেভেল কমে গিয়ে দাঁতের ক্ষয় শুরু হবে। যদি কমলা বা আনারসের জুস খাওয়ার সময় স্ট্র ব্যবহার করা যায়, তাতেও কিছুটা রক্ষা হয়। তবে সবচেয়ে ভালো হয় এজাতীয় ফলের রস খাওয়ার পর ভালোভাবে কুলিকুচি ও সেই সঙ্গে দাঁত ব্রাশ করলে।
৩. দাঁতকে অতিরিক্ত সাদা করার চেষ্টা : বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁতের রঙ পরিবর্তন হয়, তখন এগুলো আর সাদা থাকে না। কিন্তু এ দাঁতগুলোকে সাদা করার জন্য যদি অতিরিক্ত ব্লিচিং করা হয় তবে দাঁতের এনামেল বা আবরণ অ্যাসিডের আক্রমণের শিকার হয় এবং এনামেলের আবরণ ফেটে একটু ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে দাঁত শিরশির করে।
৪. হট পিজ্জার সঙ্গে ঠা-া পানীয় : যখনই আমরা অতিরিক্ত গরম পিজ্জা বা সিঙাড়া বা পেঁয়াজুতে কামড় দেই তখনই কিন্তু আমরা আমাদের দাঁতের শক্ত আবরণ এনামেলকে বাড়িয়ে ফেলি এবং সেই সঙ্গে যখন ঠা-া পানীয়তে চুমুক দেই তখনই কিন্তু এনামেলে একটা চুলের চেয়ে সুক্ষ্ম ফাটল সৃষ্টি হয়। হঠাৎ গরম, হঠাৎ ঠা-া খাওয়ার ফলে এনামেল কিছুটা প্রসারিত হয় বা বেড়ে যায় এবং ফাটল ধরে। সুতরাং গরম খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ঠা-া খাবার খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।
৫. ভুল টুথপেস্ট ব্যবহার : দাঁতের সুস্থতার জন্য অতিরিক্ত কর্কশ বা রুক্ষ টুথপেস্ট ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক ধরনের বিজ্ঞাপনেই বলা হয় টুথপেস্টের মধ্যে আছে এমন কিছু পদার্থ যা আপনার দাঁত রাতারাতি ঝকঝকে সাদা করে দিতে সক্ষম। এই ধরনের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে যারা এই পেস্ট ব্যবহার করবেন তাদের দাঁত অতি তাড়াতাড়ি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট না হয়ে সবসময় ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা ভালো।
৬. দাঁত দিয়ে বোতলের ছিপি খোলা: অনেকেই দাঁতের শক্তি দেখানোর জন্য দাঁত দিয়ে কোল্ড ড্রিংকসের বোতল খোলার চেষ্টা করেন কিংবা দাঁত দিয়ে শক্ত কিছু ভেঙে কৃতিত্ব নিতে চান। আসলে দাঁত আমাদের প্রয়োজন সৌন্দর্যে, শব্দ উচ্চারণে আর খাদ্যদ্রব্যকে পিষিয়ে পাকস্থলীতে পাঠানোতে; অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য নয়। বোতলের ছিপি খোলার কারণে অনেক সময় দাঁত ভেঙে যায়, ফেটে যায় ও ফাটল ধরে। পরবর্তীতে তার চিকিৎসা জটিলতা ছাড়া ব্যয়ও কিন্তু বেড়ে যায়, সেই সাথে কমে যায় দাঁতের আয়ু।
৭. নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লসিং না করা : প্রতি দিন অন্তত দুই বেলা Ñ সকালে নাশতার পর ও রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত তিন থেকে চার মিনিট দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন। সেই সাথে দাঁতের ফাঁক থেকে ময়লা বা খাদ্যকণা বের করে আনার জন্য ডেন্টাল ফ্লস (এক ধরনের সিল্ক সুতা) ব্যবহার করা ভালো। যদি আপনার কর্মস্থলে দাঁত ব্রাশ না থাকে, তবে বাসার মতো করে সেখানেও একসেট টুথব্রাশ, পেস্ট ও ফ্লস রাখুন। কারণ, অনেক সময় অফিসেই নাশতা বা মধ্যাহ্ন ভোজ বা রাতের আহার সারতে হয়। তখন সেখানেও যাতে দাঁত ব্রাশ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখাটা জরুরি। তবে ব্রাশের আগে অবশ্যই ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করবেন, পরে নয়। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস না করলে সহজেই দাঁতের গর্ত বা ক্যাভিটি হয় এবং ব্যথা ও প্রদাহ থেকে আরো জটিলতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস করুন প্রতিদিন অন্তত দুইবার।
৮. বছরে অন্তত একবার দাঁত পরীক্ষা করা : বছরে অন্তত একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনকে দিয়ে দাঁতের স্কেলিং করানো যেমন জরুরি, তেমনি দাঁতগুলো পরীক্ষা এবং সেই সাথে মুখের বিভিন্ন অংশের পরীক্ষা করানোও জরুরি। তাতে মুখ ও দাঁতের সামান্য গর্তকে ফিলিং করিয়ে যেমন রক্ষা করা যাবে তেমনি একটি প্রি-ক্যানসার ঘা বা প্রদাহকে ক্যানসারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যাবে। কারণ প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর বা প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই শ্রেয়, সস্তা ও নিরাপদ।
লেখক: মুখ ও দন্ত রোগ বিশেষজ্ঞ
১৫/এ গ্রিন স্কয়ার, গ্রিন রোড