প্রতিবেদন

সংসদের কোরাম সংকট নিরসনে সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান টিআইবির

নিজস্ব প্রতিবেদক
সংসদের কোরাম সংকট নিরসনে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটি জানিয়েছে, দশম জাতীয় সংসদের মোট ২৩টি অধিবেশনে কোরাম সংকটের কারণে ১৯৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট অপচয় হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ১৬৩ কোটি ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।
টিআইবি জানিয়েছে, দশম সংসদে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি ছিল। তবে ওই সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের অভাবও দেখা গেছে, আইন প্রণয়ন কাজে সময় ব্যয় হয়েছে কম, কোরাম সংকটের কারণে আইন প্রণয়নের কাজ বিঘিœত হয়েছে।
দশম সংসদ নিয়ে টিআইবি’র প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন পার্লামেন্টওয়াচে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২৮ আগস্ট ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
দশম সংসদের কার্যকাল ছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। দশম সংসদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রায় ১ বছর পর টিআইবি দশম সংসদ নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করল।
টিআইবির এ প্রতিবেদনে সংসদকে কার্যকর করতে ১১ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে বহুল আলোচিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের প্রস্তাব রয়েছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ২৩টি অধিবেশনের মধ্যে কোরাম সংকটের কারণে ব্যয় হওয়া সময় মোট সময়ের ১২ শতাংশ। ২৩টি অধিবেশনে কোরাম সংকটের কারণে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ২৮ মিনিট অপচয় হয়েছে। তবে গড় কোরাম সংকট আগের সংসদের তুলনায় কিছুটা কমেছে। অষ্টম সংসদে প্রতি কার্যদিবসে কোরাম সংকটের কারণে অপচয় হয় ৩৭ মিনিট। আর নবম সংসদে ছিল ৩২ মিনিট। সেক্ষেত্রে অষ্টম সংসদের তুলনায় ৯ মিনিট এবং নবম সংসদের তুলনায় ৪ মিনিট সময় অপচয় কম হয় দশম সংসদে।
সংবিধান অনুযায়ী, ন্যূনতম ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না থাকলে সংসদের কোরাম হয় না। কোরাম না থাকলে বৈঠক স্থগিত বা মুলতবি করতে হয়।
দশম সংসদে সদস্যদের গড় উপস্থিতি ছিল ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল ৬২ শতাংশ। আর নারী সদস্যদের উপস্থিতি ৭১ শতাংশ। সংসদ নেতা শেখ হাসিনার উপস্থিতি ছিল ৮২ শতাংশ। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের উপস্থিতি ছিল ৫৯ শতাংশ। অধিবেশনের কোনোটিতে প্রধান বিরোধী দল বা অন্যান্য বিরোধী সদস্য সংসদ বর্জন করেননি। তবে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধীদলীয় সদস্যরা ১৩ বার ওয়াকআউট করেন। এ সময় সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা, আর্থিক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও মন্ত্রিসভার অংশ হওয়ায় সংসদে জোরালো ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি।
দশম সংসদের ২৩টি অধিবেশনে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে ১৬৮ ঘণ্টা ১২ মিনিট সময় ব্যয় হয়, যা অধিবেশনগুলোর মোট ব্যয়িত সময়ের ১২ শতাংশ। আর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম বিল পাসের আলোচনায় সরকারি দল ১১ শতাংশ, প্রধান বিরোধী দল ৬৭ শতাংশ এবং অন্যান্য বিরোধী দল ২২ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সব মিলিয়ে ১৯৩টি সরকারি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে সংশোধনী বিল ছিল ৫১টি। তবে ১৬টি বেসরকারি বিল উত্থাপিত হলেও কোনোটি পাস হয়নি। সংসদের ৩৫০ জন সদস্যের মধ্যে আইন প্রণয়ন (বাজেট ব্যতীত) আলোচনায় মাত্র ৯৪ জন অংশ নিয়েছেন। ফলে এতে কম সময় ব্যয় হয়েছে। বিলগুলো উত্থাপন, বিলের ওপর সংসদ সদস্যদের আলোচনা ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি বিল পাস করতে গড়ে সময় লেগেছে ৩১ মিনিট। দশম সংসদে ৭১ শতাংশ বিল পাস হয়েছে এক থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে। যেখানে পাশের দেশ ভারতের ১৬তম লোকসভায় প্রতিটি বিল পাসে গড়ে ১৪১ মিনিট ব্যয় হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন টিআইবির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) নিহার রঞ্জন রায় ও মোরশেদা আক্তার। তারাই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, উপদেষ্টা সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দশম সংসদে বিরোধী দল সংসদ বর্জন পরিহার করলেও প্রকৃত বিরোধী দল বলতে যা বোঝায়, তাদের সেই ভূমিকা আমরা দেখিনি। সেখানে বিরোধী দলের আত্মপরিচয়ের সংকট ছিল।
সংসদকে কার্যকর করতে টিআইবি ১১ দফা সুপারিশ করে বলেছে, নিজ দলের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ও বাজেট ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সদস্যদের নিজ বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দেয়ার সুযোগ রেখে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সরকারি দলের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে কার্যকর বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশযোগ্য নয় এমন বিষয় ছাড়া আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন এবং আইনের খসড়ায় জনমত গ্রহণের জন্য অধিবেশনে উত্থাপিত বিলগুলো সংসদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের সম্পদের প্রতি বছর হালনাগাদ তথ্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে টিআইবি।