কলাম

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস-২০১৯: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

তপন কুমার ঘোষ
‘খরঃবৎধপু ধহফ গঁষঃরষরহমঁধষরংস’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। ১৯৬৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কো প্রথম সাক্ষরতা দিবস পালন করে। তখন থেকে প্রতি বছর সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। স্বাধীন বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ১৯৭২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করা হয়।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন। জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের প্রবেশদ্বার হচ্ছে সাক্ষরতা। সাক্ষরতার সংজ্ঞা সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হয়েছে এবং বিস্তৃতি লাভ করেছে। অতীতে সাক্ষরতা বলতে অক্ষরজ্ঞান বা স্বাক্ষর (ঝরমহধঃঁৎব) করাকে বোঝানো হতো। কিন্তু বর্তমানে সাক্ষরতা (খরঃবৎধপু) বলতে বোঝায় ‘মাতৃভাষায় পড়তে পারা, পড়ে অনুধাবন করতে পারা, লিখতে পারা, লিখিতভাবে বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারা, যোগাযোগ স্থাপন করতে পারা এবং গণনা করতে পারা’।
জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের অধিকাংশ মানুষ বহুভাষিক। বর্তমান বিশ্বে ৭ হাজার ৯৭টি ভাষা মৌখিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২৩টি ভাষা বেশি ব্যবহৃত হয়; বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ এই ২৩টি ভাষায় কথা বলে। গঁষঃরষরহমঁধষরংস বলতে বোঝায় বহুভাষিক সমাজে আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা ও অনানুষ্ঠানিক ভাষার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা।
‘সাক্ষরতা’ই শিক্ষার প্রথম সোপান। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের এ বিশ্বে সাক্ষরতার বিকল্প নেই। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি ততো বেশি উন্নত ও ক্ষমতাবান। সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, মানুষ সচেতন হয়, স্বনির্ভর হয়, দেশে জন্মহার কমে, স্বাস্থ্য সূচকের উন্নয়ন ঘটে, গড় আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। সাক্ষরতার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় স্বল্প সময়ের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নব্যসাক্ষরদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। আর সে লক্ষ্যেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ট্রেড নির্বাচন করে থাকে। এজন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দেশব্যাপী সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল আমাদের জনসংখ্যাধিক্য দেশকে জনসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে। তাহলেই শিক্ষিত, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল উন্নত জাতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে সমাদৃত হবে।
বাংলাদেশে সাক্ষরতা কর্মসূচি
স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণীত হয় এবং এ সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সাক্ষরতা বিস্তারে আন্তর্জাতিক ফোরামের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সাক্ষরতা দিবস উদযাপিত হয়। ১৯৭৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ঠাকুরগাঁওয়ে সাক্ষরতা অভিযান শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রধান অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ঠাকুরগাঁওয়ে। উল্লেখ্য, এ দিনে ঠাকুরগাঁওয়ের কচুবাড়ী-কৃষ্টপুর গ্রামকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম নিরক্ষরতামুক্ত গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেন।
১৯৭৩ সালে সকলের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতির পিতা শেখ মুজিবুুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও অবৈতনিক করেন। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বয়স্ক শিক্ষা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নামে একটি অধ্যায়ে দেশে সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে ‘বাংলাদেশ সাক্ষরতা সমিতি’ গঠনের মাধ্যমে ১৮টি জেলায় ৬৮টি থানার ৩২৫টি গ্রামে গণশিক্ষা কেন্দ্র চালু করা হয় এবং এর মাধ্যমে ১৮ হাজার নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করে তোলা হয়।
নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ অর্জনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের জমতিয়েনে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশও ‘সবার জন্য শিক্ষা’ বিস্তারে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সাক্ষরতা বিস্তারে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ সময় সাক্ষরতা বিস্তারে বিভিন্ন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় এবং ‘সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন’ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে সারাদেশে সাক্ষরতা কর্মসূচিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা হয়। এ ‘সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রথমে দু’টি জেলা লালমনিরহাট ও চুয়াডাঙ্গা এবং পরে আরও পাঁচটি জেলা মাগুরা, গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীকে নিরক্ষরতামুক্ত ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান প্রদান করা হয়। ফলে সাক্ষরতার হার ২০০০ সালে ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়।
সাক্ষরতা বিস্তারে এ বিশাল অর্জনের জন্য সরকার ইউনেস্কো কর্তৃক প্রদত্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিস্বরূপ ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার ১৯৯৮’ লাভ করে, যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো
সাক্ষরতা অর্জনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য সত্ত্বেও ২০০৩ সালে আকস্মিকভাবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে অকার্যকর করা হয়। এ সময় সাক্ষরতা বিস্তারের জন্য দেশব্যাপী চলমান ‘সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন (টিএলএম)’ কর্মসূচির মতো একটি সফল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ২০০৫ সালে সরকারের রাজস্ব খাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার ২০০৬ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ২০০৫ সাল থেকে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪
শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অক্ষরজ্ঞানদান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধমে জীবিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদে পরিণতকরণ, আত্ম-কর্মসংস্থানের যোগ্যতা সৃষ্টিকরণ এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরেপড়া শিশুদের শিক্ষার বিকল্প সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন প্রণীত হয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-৪ এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ভূমিকা
এসডিজি-৪ লক্ষ্য হচ্ছে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি’। এসডিজি-৪ এর সকল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) প্রণয়ন করেছে।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর গৃহীত কর্মসূচিসমূহ
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪, ৭ম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা এবং এসডিজি-৪ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ কর্মসূচিসমূহ হচ্ছে:
ক্স মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা): দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ১৫ এবং তদূর্ধ্ব বয়সী নিরক্ষর নারী-পুরুষকে সাক্ষরতাজ্ঞান প্রদানের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা)’ বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলায় নির্বাচিত ২৫০টি উপজেলার ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লক্ষ নিরক্ষরকে সাক্ষরতাজ্ঞান প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের ১৩৪টি উপজেলায় ৩৯ হাজার ৩১১টি শিখন কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪১ জন নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদান করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১৬টি উপজেলায় ৩৫ হাজারটি শিখন কেন্দ্রের মাধ্যমে ২১ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদানের কাজ চলমান রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীতে অর্থাৎ মুজিব বর্ষে ২১ লক্ষ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে সাক্ষরতাজ্ঞান প্রদান করা হবে।
ক্স পিইডিপি-৪ এর আওতায় বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুদের জন্য উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা: সকল শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪)’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় বিদ্যালয় গমনোপযোগী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে এবং ঝরে পড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীতকরণ, ঝরে পড়া রোধ এবং মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, মিড-ডে মিল, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কমানো ইত্যাদি।
ক্স প্রাথমিক শিক্ষার অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জনের পরও দারিদ্র্য, অনগ্রসরতা, শিশুশ্রম, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতাসহ নানাবিধ কারণে এখনও অনেক শিশু বিদ্যালয় বহির্ভূত রয়েছে। উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এসব শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পিইডিপি-৪ এর সাব-কম্পোনেন্ট ২.৫ এর আওতায় ৮-১৪ বছর বয়সী বিদ্যালয় বহির্ভূত ১০ লক্ষ শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কর্তৃক ইতোমধ্যে ৬টি জেলায় Ñ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, গাইবান্ধা ও কিশোরগঞ্জে ৪টি মডেলে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১ লাখ শিশুর শিখন কার্যক্রমের পাইলটিং শুরু করা হয়েছে। বাকি ৯ লাখ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের শিখন কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ক্স উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বোর্ড: উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন, ২০১৪-এর আলোকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বোর্ডের মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা, সাক্ষরতা বা মৌলিক শিক্ষা, প্রি-ভোকেশনাল-১ ও স্তরের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হবে। বোর্ডের মাধ্যমে সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান যারা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে জড়িত তাদের প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন, শিক্ষকদের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিরূপণ, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদান করা হবে।
ক্স উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (এনএফইডিপি): উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু থেকেই প্রকল্পনির্ভর কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যে কারণে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সাব-সেক্টরে কোনো টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশে নিরক্ষরতা সম্পূর্ণ দূরীকরণসহ জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বর্তমান সরকার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি বৃহৎ কর্মসূচিভিত্তিক প্রস্তাবনা ‘ঘড়হ-ঋড়ৎসধষ ঊফঁপধঃরড়হ উবাবষড়ঢ়সবহঃ চৎড়মৎধস (ঘঋঊউচ)’ তৈরি করেছে, যা বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এনএফইডিপি’র আওতাভুক্ত
বিভিন্ন কম্পোনেন্ট
ক্স ১৫+ বয়সী ৫০ লক্ষ নিরক্ষরকে মৌলিক সাক্ষরতা প্রদান করা হবে।
ক্স ১৫-৪৫ বছর বয়সী ১৫ লক্ষ যুব ও বয়স্ক নব্যসাক্ষরকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
ক্স ৮-১৪ বছর বয়সী ১০ লক্ষ বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করা হবে।
ক্স ৬৪ জেলায় ৬৪টি জীবিকায়ন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
ক্স দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে এবং কিছু শহর এলাকায় সর্বমোট ৫০২৫টি ওঈঞ বেইজড স্থায়ী কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার (সিএলসি) নির্মাণ করা হবে।
রূপকল্প-২০২১ ও জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ)-এর লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। জীবনব্যাপী শিক্ষার দ্বার অবারিতকরণে সবার আগে প্রয়োজন সাক্ষরতা অর্জন। বিবিএস-এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী (জবঢ়ড়ৎঃ ড়হ ইধহমষধফবংয ঝধসঢ়ষব ঠরঃধষ ঝঃধঃরংঃরপং ২০১৮) বর্তমানে দেশের সাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ অর্থাৎ এখনও ২৬.১ শতাংশ লোক নিরক্ষর। এ বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতা জ্ঞান দান ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার বিকল্প নেই। তাই শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এজন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে সকল রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। যাতে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিটি সেক্টরে স্বনির্ভরতাসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবেই আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সক্ষম হবো।
লেখক: মহাপরিচালক
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো