আন্তর্জাতিক

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি উন্নয়নে বিশ্বজুড়ে শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
পরমাণু কর্মসূচি উন্নয়নের অংশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আরও গতিশীল করতে উন্নত ও দ্রুত গতির অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কাজ শুরু করেছে ইরান। এই সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান প্রকৃতপ্রস্তাবে তার পারমাণবিক বোমার ভা-ার সমৃদ্ধ করার মিশনে নেমেছে বলে মনে করছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের এই তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, এর মাধ্যমে বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের কাছে এই মুহূর্তে ৪০টি সেন্ট্রিফিউজ চালু রয়েছে। এ সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশটি আরো ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রিফিউজ তৈরির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
সেন্ট্রিফিউজ সাধারণত পরমাণু চুল্লিতে (রিঅ্যাক্টর ফুয়েল) জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগে। অধিক সমৃদ্ধ সেন্ট্রিফিউজ পরমাণু বোমা বানাতেও ব্যবহার হয়। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে, ইরান সাম্প্রতিক সময়ে সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়নের যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তা মূলত পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্যই।
২০১৫ সালে ৬ বিশ্বশক্তির সঙ্গে স্বারিত পরমাণু চুক্তির প্রতিশ্রুতি থেকে আংশিক সরে আসার অংশ হিসেবে তৃতীয়বারের মতো সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়নের পদপে নিল ইরান। তবে পরমাণু কেন্দ্র তদারকিতে জাতিসংঘ পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার আগের মতোই থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
৪ বছর আগে স্বারিত পরমাণু চুক্তি থেকে গত বছর সরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আগের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছে। এর জবাবে চলতি বছরের জুলাইয়ে ইরান চুক্তিতে দেয়া দুটি প্রতিশ্রুতি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এ উত্তেজনা যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করলেও যুক্তরাষ্ট্র তার পথ থেকে ফিরে আসেনি। ইরানও ক্রমেই শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছে বলে মনে করছে। একই সঙ্গে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি। বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেেিত তেহরানের তেল রপ্তানি প্রায় ৮০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ােভ জানিয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেলেও স্বারকারী অন্য ৫টি দেশ Ñ রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি চুক্তিটি বাঁচাতে নানান বিকল্প পদেেপর কথা ভাবছে। বিকল্প উপায় খুঁজতে দেশগুলোকে জাতিসংঘ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় সময় বেঁধে দিলেও তেমন কার্যকর কোনো উপায় বের করতে পারেনি তারা। ইরানের পরমাণু সংস্থা বলেছে, চুক্তি বাঁচাতে ইউরোপ যদি কিছু করতে চায়, সেটা দ্রুত করতে হবে।
এর আগে গত ১ জুলাই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ৩০০ কেজির নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ানোর কথা জানায় ইরান। এর এক সপ্তাহ পরই কর্মকর্তারা জানান, ইউরেনিয়াম মজুদের নির্দিষ্ট মাত্রা ৩.৬৭ ভাগ ছাড়িয়ে গেছে। তৃতীয় ধাপের মতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ গতিশীল করতে সেন্ট্রিফিউজ উন্নত করার ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।
এ প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেন, পরমাণু সমঝোতার ২৬ এবং ৩৬ ধারা অনুযায়ী তেহরান এরই মধ্যে দু’বার প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তির প্রতিশ্রুতি কমানোর তৃতীয় পদপে কার্যকর করা হবে।
২০১৫ সালে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কমিয়ে আনতে বিশ্বের মতাধর ৬ দেশের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। শর্ত ছিল ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি কমিয়ে আনলে দেশটির ওপর থেকে অবরোধ ধীরে ধীরে তুলে নেয়া হবে।
বারাক ওবামা আমলে স্বারিত ওই চুক্তিকে য়িষ্ণু ও পচনশীল আখ্যা দিয়ে গত বছরের মে মাসে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
পরমাণু সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলেও যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানি জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামের ওই চুক্তিটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০১৮ সালের নভেম্বরে তেহরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হয়। ইউরোপীয় দেশগুলো সমঝোতা বাস্তবায়নের কথা বললেও কার্যত তারা কোনো পদপে নেয়নি বলে অভিযোগ করছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালনে ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ােভ জানিয়ে গত মে মাসে তেহরানও চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়।
এদিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বৈঠক করেছেন। বরিস যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
জনসন ও নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্য-ইসরাইলের দৃঢ় সম্পর্কের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেন; এর মধ্যে বাণিজ্য, বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংযোগের মাধ্যমে সহযোগিতা রয়েছে। তারা বিতর্কিত ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
নেতানিয়াহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পরমাণু চুক্তির বিরোধী। তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার পে তারা কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হওয়ার বিষয়ে নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনকে সমর্থন করে। এমন পথ অনুসরণ করতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে চীন। পাশাপাশি ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে আসার জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চীন।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং বলেন, পরমাণু সমঝোতার পূর্ণ বাস্তবায়ন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের চাওয়া ছিল এবং এর মাধ্যমেই চলমান উত্তেজনা কমানো সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সব পকে ধৈর্য ধরতে হবে।