প্রতিবেদন

উন্নত বিশ্বের আদলে সমন্বিত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব বিশিষ্টজনদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে উন্নত বিশ্বের আদলে ‘বাংলাদেশ সমন্বিত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ’ গঠনের সুপারিশ করেছেন সমাজের বিশিষ্টজনরা। গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ সুপারিশ করেন বিশিষ্টজনরা।
কনসাস কনজ্যুমার সোসাইটি আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জাকির হোসাইন খান। সেই প্রবন্ধের ওপর আলোচনার সময় বক্তারা বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে একটি সংস্থাকেই দায়িত্ব দিতে হবে। সরকার যদি আন্তরিক হয়, তাহলে শক্তিশালী একটি সংস্থা গড়ে তোলা যাবে, যার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কাজ বেগবান হবে।
এ সময় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) ঢেলে সাজানোর তাগিদ দেয়া হয়। এ ছাড়া খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ খাদ্য-সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন বা সংশোধনী নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরের আদলে সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞসহ সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘বাংলাদেশে সমন্বিত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ’ গঠনের সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরণ আইন-২০০৯ সংশোধন করে ভোক্তার সরাসরি মামলা করার অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাজার পরিদর্শন ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেট, প্রসিকিউটিং এজেন্সি ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সহায়তার বাধ্যবাধকতা রাখার বিধান নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এ সংশোধনী এনে প্রতিটি জেলা ও মহানগরে এক বা একাধিক খাদ্য আদালত গঠনেরও সুপারিশ করা হয় আলোচনায়।
খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ ও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা, আমদানি পণ্যগুলোর প্রবেশমুখে মান পরীা করে বাজারে ছাড়া, ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি ও বেনাপোল স্থলবন্দরের পরীাগারে জনবল নিয়োগ, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করে ভোক্তা অধিকার সংরণ কমিটির কার্যক্রম বেগবান করার সুপারিশও করা হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
মূল প্রবন্ধে জাকির হোসাইন খান বলেন, জনসাধারণের কাছে খাদ্যের গুণগত মান সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য অনেক েেত্রই পৌঁছায় না, যার ফলে তারা মানহীন খাদ্য ক্রয় করতে বাধ্য হয়। এছাড়া ভেজাল খাদ্য খেয়ে তিগ্রস্ত কিংবা অসুস্থ ভোক্তার সরাসরি মামলা দায়ের করার বিধান নেই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়, সহযোগিতার অভাব আছে।
এ সময় কিছু সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত সব ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং কনভেনশন মেনে চলার েেত্র সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটাতে হবে।
আলোচনায় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, আমি মনে করি আমরা যদি সবাই মিলে কাজ করি, উৎপাদন থেকে শুরু করে সমস্যাগুলোর প্রতি একটু মনোযোগ দেয়া উচিত। আর একইসঙ্গে আমাদের দায়িত্বশীল যেসব সংস্থা আছে তাদের ৫২ নিম্নমানের পণ্যের বিষয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া উচিত ছিল। কারণ প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ল্যাব আছে। তাদের মান নিয়ন্ত্রক বিভাগ উপো করে এই পণ্য বাজারে এলো কিভাবে? এখানে দায়ী কে ছিল – এই বিষয়গুলো ভালোভাবে দেখতে হবে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (মার্কেটিং) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এখানে ৪-৫টি সংস্থা কাজ করে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপ, বিএসটিআই, সিটি করপোরেশন, ভোক্তা অধিকার সংরণ অধিদপ্তর তো আছেই, এর বাইরে র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী কাজ করে। আমার মনে হয়, একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানকে যদি দায়িত্ব দেয়া হয় সেেেত্র কাজের সমন্বয় ভালো হতে পারে।
সুপারশপ মীনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন খান বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে যা যা করা হচ্ছে এর ফাঁকে অনেক জিনিস বাদ পড়ে গেছে, যা কেউ দেখছে না। বিএসটিআই নির্দিষ্ট সংখ্যক পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা যদি সে ক’টি পণ্যের দিকে তাকাই, তাহলে কি তাদের মান সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে? সেটা হয়ে থাকলে, সেই পণ্যে যখন ভেজাল পাওয়া যায়, তার জন্য কেন হাইকোর্টের নির্দেশ লাগবে পণ্যের উৎপাদন বন্ধ করতে? তার মানে বিএসটিআইতেও ভেজাল আছে যার কারণে ভেজাল পণ্যকে তারা মার্কেট থেকে তুলে নেয়ার মতা রাখছে না।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, নানা পর্যায়ে আমাদের সমতার অভাব আছে। সমতা ছাড়া কর্তৃত্ব একটি সমস্যা হতে পারে। এই বাস্তবতা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব আছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব আমাদের সমতা ছাড়া। তরুণদের বলব এদিকে খুব বেশি নজর দিতে। এই দায়িত্ব নিজেরা নিতে চাচ্ছি কিন্তু নিজেদের সম করে গড়ে তুলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর আদলে একক সংস্থার ধারণার প্রয়োজন আছে। এখানে একক সংস্থার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। এটা নিয়ে আলোচনা এবং এটা নিয়ে আগানো খুব প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এতে আরও বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহকারী সম্পাদক সফিউল্লাহ আল মামুন ও শামীমা শাহরিয়ার এমপি।