রাজনীতি

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে আন্দোলন প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত শীর্ষ নেতৃত্ব: ক্ষুব্ধ ও হতাশ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রায় দুই বছর যাবৎ কারাবন্দি আছেন। এ দীর্ঘ সময়ে বিএনপির নেতা, কর্মী, সমর্থক ও দলীয় আইনজীবীরা আন্দোলন বা আইনিভাবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা বেশ ক্ষুব্ধ ও হতাশ এবং এ কারণে তারা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়ী করছেন। তারা মনে করছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এ ব্যাপারে যথাযথ কর্মকৌশল প্রণয়ন, নেতাকর্মীদের যথাযথ নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে যথাযথ আন্দোলন কর্মসূচি প্রণয়নেও ব্যর্থ হয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব কেবল জাতীয় প্রেসকাব ও টিভি ক্যামরার সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে জোরালোভাবে কথা বলেছেন, আন্দোলনের মাঠে থেকেছেন নিষ্ক্রিয়।
তাছাড়া প্রায় প্রতিদিনই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বিভিন্ন ফোরামে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিচ্ছিন্নভাবে কথা বললেও এক্ষেত্রে দলের নেতারা শুরু থেকেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছেন। কোনো কোনো নেতা আইনি পথে শান্তিপূর্ণ উপায়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির ফর্মুলা দিচ্ছেন আবার অনেকেই কঠোর আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবে কেউই কার্যকর পথে হাঁটছেন না, কেবল দায়সারা গোছের কথার কথা বলছেন। তাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ বিএনপির তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব গত ২ বছরে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে পারেননি।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারাও খালেদা জিয়া জেলে থাকায় রিলাক্স মুডে আছেন। খালেদা জিয়া জেলে এবং তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় এসব নেতা নেতাগিরি ফলানোর যথেষ্ট স্পেস পাচ্ছেন। কিছু তৃণমূল নেতা অবশ্য স্পষ্ট করেই বলেছেন, মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা চাচ্ছেন, খালেদা জিয়া আজীবন জেলে এবং তারেক রহমান আজীবন বিদেশে থাকুন। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের এক নেতা এ প্রসঙ্গে স্বদেশ খবরকে বলেন, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় না বলেই তাঁকে ছাড়া, এমনকি নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ ছাড়াই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছে। আবার খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়াই পুনরায় সংসদে যোগদান করে বর্তমান সংসদকে বৈধতা দিয়েছে। এখন তো দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির ইস্যুতে সরকারের সাথে দরকষাকষির কোনো জায়গাই বাকি থাকলো না। এতে বুঝা যায়, বিএনপি নেতাদের মনোভাব আসলেই খালেদা জিয়ার মুক্তির পক্ষে নেই। কারণ খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেই সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করে দেবেন। ফলে দীর্ঘদিন পরিশ্রমের পর বিএনপি নেতারা সরকারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যে সখ্য গড়ে তুলেছেন, তা ভেস্তে যাবে। তাদের আয়েশী জীবনযাপনের অবসান হবে, শুরু হবে রাজপথের কষ্টের জীবন; যা তাদের কাম্য নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়, খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন বাদ দিয়ে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ছাত্রদলের কাউন্সিল নিয়েই ব্যস্ত। একেক সিনিয়র নেতা একেক লবিতে ভাগ হয়ে পড়েন। ফলে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বহু প্রার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়। সিনিয়র নেতাদের এই কামড়াকামড়িতে শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ছাত্রদলের কাউন্সিল স্থগিত হয়ে যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ছাত্রদলের কাউন্সিলে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ১২ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন ছাত্রদলের সদ্যবিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমান উল্লাহ।
বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে, আমান উল্লাহ মামলা করার মতো সাহস পেলো কোথায়। বিএনপির কোন সিনিয়র নেতার ইন্ধনে আমান আদালতের দ্বারস্থ হলেন?
জানা গেছে, উক্ত আমান উল্লাহ এখানে কোনো ফ্যাক্টরই নন। তিনি তার গুরুর (সিনিয়র নেতা) কথামতো কাজ করেছেন। ওই সিনিয়র নেতা যখন নিশ্চিত হয়েছেন, তার আশীর্বাদপুষ্ট প্রার্থী ভোটাভুটিতে কিছুতেই ছাত্রদল সভাপতি হতে পারবে না, তখনই তিনি আমানকে দিয়ে মামলাটি করান। আবার মামলার জন্য বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনটিকে বেছে নেন। শুক্র ও শনিবার (১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর) কোর্ট বন্ধ থাকায় উচ্চ আদালতে রিট করে ১৪ সেপ্টেম্বর রবিবার যাতে কাউন্সিল আয়োজন করা না যায়, সেজন্যই বৃহস্পতিবার দিনটিকে বেছে নেয়া হয়েছে বলে বিএনপির অনেক তৃণমূল নেতা মনে করেন। তাদের মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় সমস্যা। কোনো নেতাই আরেক নেতাকে বিশ্বাস করেন না, একজনের প্রার্থীর নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা জেগে উঠলে আরেকজনের পালপিটিশন শুরু হয়ে যায় আর তিনি দৌড়ে আদালতে গিয়ে ওঠেন।
বিএনপির এক তৃণমূল নেতা জানান, আদালতের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ আছে Ñ বিএনপির এমন এক সিনিয়র নেতাই ছাত্রদলের কাউন্সিল স্থগিতের কাজটি করেছেন।
শুধু ছাত্রদলের কাউন্সিলই নয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে বিএনপির নেতারা যে হারে এখনই মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন, তার ছিটেফোঁটাও ফেলছেন না খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে। সব নেতাই ব্যস্ত আছেন যার যার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে। জেলে যাওয়ার ভয় এখন আর বিএনপি নেতাদের নেই। সরকার থেকে তারা তেমন সিগন্যালই পেয়েছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে আলোচনার বাইরে নিয়ে যাওয়াই এখন তাদের একমাত্র কাজ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেমন মনে করেন খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে তিনি মহাসচিব থাকতে পারবেন না, তেমনি স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতারাও মনে করেন, তারাও থাকতে পারবেন না স্বপদে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন, বিএনপির মহসচিবসহ সব সিনিয়র নেতাই এখন কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছেন, ‘খালেদা জিয়া যেন জেলেই পচে মরেন’!