ফিচার

ফাইভ জি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে যেসব তথ্য জানা দরকার

স্বদেশ খবর ডেস্ক
মোবাইল ফোনের পঞ্চম জেনারেশন ইন্টারনেটকে সংেেপ ডাকা হয় ফাইভ-জি; যেখানে অনেক দ্রুত গতিতে ইন্টারনেট তথ্য ডাউনলোড ও আপলোড করা যাবে। সেবার আওতা হবে ব্যাপক।
এটা রেডিও তরঙ্গের আরো বেশি ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং একই সময় একই স্থানে বেশি মোবাইল ফোন ইন্টারনেটের সুবিধা নিতে পারবে।
এখন আমরা আমাদের স্মার্টফোন দিয়ে যা-ই করি না কেন, ফাইভ-জি হলে তা আরো দ্রুত গতিতে এবং ভালোভাবে করতে পারব। অগমেন্টেড রিয়েলিটি, মোবাইল ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, উন্নত মানের ভিডিও Ñ এসব ইন্টারনেট এখনকার শহুরে জীবনকে আরো স্মার্ট করে তুলছে। কিন্তু ফাইভ-জির মাধ্যমে এমন অনেক নতুন সেবা আসবে, যা আমরা এখনও ভাবতে পারছি না। ফাইভ-জি মোবাইল নেটওয়ার্ক হয়ত ড্রোনের মাধ্যমে গবেষণা এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবে, অগ্নিনির্বাপণে সহায়তা করবে। অনেকে মনে করেন, চালকবিহীন গাড়ি, লাইভ ম্যাপ এবং ট্রাফিক তথ্য পড়ার জন্যও ফাইভ-জি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর মাধ্যমে মোবাইল গেমাররা আরো বেশি সুবিধা পাবেন। ভিডিও কল আরো পরিষ্কার হবে। অতি সহজে কোনোরকম বাধা ছাড়াই মোবাইলে ভিডিও দেখা যাবে। শরীরে লাগানো ফিটনেস ডিভাইসগুলো নিখুঁত সময়ে সংকেত দিতে পারবে, জরুরি চিকিৎসাবার্তাও পাঠাতে পারবে।
ফাইভ-জি প্রটোকলের মান এখনও নির্ধারিত হয়নি। ৩.৫ গিগাহার্জের থেকে ২৬ গিগাহার্জের মতো হায়ার ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডউইথের অনেক মতা রয়েছে, কিন্তু তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে স্বল্পতার কারণে তাদের আওতা থাকে কম। ফলে সামনে কোনো বাধা পেয়ে সেগুলো সহজেই আটকে যায়।
ফোর-জির তুলনায় এটি অনেক আলাদা। এটা একেবারে নতুন একটি রেডিও প্রযুক্তি। কিন্তু প্রথমেই হয়ত দ্রুত গতির বিষয়টি নজরে আসবে না। কারণ নেটওয়ার্ক অপারেটররা বর্তমান ফোর-জি নেটওয়ার্ককে ফাইভ-জিতে বাড়িয়ে গ্রাহকদের আরো উন্নত সেবা দিতে চাইবেন।
দ্রুত গতির বিষয়টি নির্ভর করবে কোন স্পেকট্রাম ব্যান্ডউইথে ফাইভ-জি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং মোবাইল কোম্পানিগুলো মাস্ট এবং ট্রান্সমিটারের পেছনে কতটা বিনিয়োগ করছে।
বর্তমানের ফোর-জি প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক গড়ে সর্বোচ্চ ৪৫ এমবিপিএস গতি সুবিধা দিতে পারে। যদিও আশা করা হচ্ছে যে, এই নেটওয়ার্কেই ১ গিগাবাইট পার সেকেন্ড গতি একসময় দেয়া যাবে। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোয়ালকম বলছে, ফোর-জির তুলনায় ফাইভ-জি ১০ থেকে ২০ গুণ গতি দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি ভালো মানের চলচ্চিত্র হয়ত মাত্র এক মিনিটেই ডাউন লোড করা যাবে।
সারা বিশ্বই এখন মোবাইলনির্ভর হয়ে উঠছে এবং প্রতিদিনই আমরা আরো বেশি তথ্য ব্যবহার করছি। বিশেষ করে ভিডিও এবং সংগীত ব্যবহার অনেক বাড়ছে। বর্তমান নেটওয়ার্কে অনেক সময় এসব সেবা নিতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়। হয়ত ডাউনলোডের সময় মাঝপথে ভেঙে যায়। বিশেষ করে যখন কোনো একটি এলাকায় একসঙ্গে অনেক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখন বেশি সমস্যা দেখা যায়। এরকম পরিস্থিতিতে ফাইভ-জি অনেক ভালো সেবা দিতে পারবে।
বেশিরভাগ দেশ ২০২০ সাল নাগাদ ফাইভ-জি সেবা চালু করতে চায়। তবে কাতারের ওরেডো কোম্পানি জানিয়েছে, তারা এরই মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সেবাটি চালু করেছে। দণি কোরিয়ায় ইতোমধ্যে সেবাটি চালু হয়েছে। ২০২০ সালে ফাইভ-জি সেবা চালু করতে চায় চীনও।
ফাইভ-জির বেতার তরঙ্গের তেজষ্ক্রিয়তা থেকে ক্যানসার হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যে এক গবেষণায় বেতার তরঙ্গের তেজষ্ক্রিয়তা ও ইঁদুরের মধ্যে ক্যানসারের সম্পর্ক দেখিয়েছিল। আইফোন ও স্যামসাং গ্যালাক্সির মতো স্মার্টফোনে এই তেজষ্ক্রিয়তা আরও বেশি। তবে স্মার্টফোন ও ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক বললে একটু বেশি বলা হয়ে যায়। কারণ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য অনেক যন্ত্রপাতি থেকেই কিছু না কিছু তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে থাকে।
অবশ্য এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য ফাইভ-জি সমর্থিত হ্যান্ডসেটের প্রয়োজন হবে। বর্তমানের বেশিরভাগ স্মার্টফোনেই তা নেই। তবে কিছু কিছু সূত্র বলছে, ফাইভ-জি চালু হলে ফোর-জি নেটওয়ার্কেও বেশি গতি পাওয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া ফোর-জি নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করেই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ চলছে। এর মানে হলো ফাইভ-জি চালু হলেও ফোর-জি নেটওয়ার্কে দিব্যি কাজ চালানো যাবে।
জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বের সব মোবাইল ফোন সংযোগের ১৫ শতাংশ হবে ফাইভ-জি নির্ভর। ওই একই বছরে ফোর-জি এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালের ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৯ শতাংশে পৌঁছাবে। সোজা কথায়, ফাইভ-জি এলেও ফোর-জি নেটওয়ার্কের বিস্তার শিগগিরই থামছে না। তাছাড়া যারা ফাইভ-জি ব্যবহার শুরু করবেন, তাদের দখলে যেটুকু ফোর-জি ব্যান্ডউইডথ ছিল, তা মুক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং বলা যায়, ফোর-জির গতি আরও বাড়বে।
এ বছরের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে ফাইভ-জি সংযোগের সাহায্যে কিভাবে একজন ডাক্তার দূর থেকে রোগীকে ভিডিও দেখে দেখে নির্দেশনা দেবেন, তা দেখানো হয়েছে। তবে এখনই পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে বলে মনে হয় না। আর স্বাস্থ্যসেবা খাতে ফাইভ-জি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে না বলেও মনে করেন অনেকে। তবে ভিডিও সম্মেলনের গতি যে বাড়বে, তা নিশ্চিত। আর স্বয়ংক্রিয় গাড়ির ব্যবহারও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেটফিক্সসহ অন্যান্য ভিডিও দেখার ওয়েবসাইটে ভিডিওর মান সাধারণত এইচডি বা ফুল-এইচডি হয়ে থাকে। বর্তমানের গতি তা দেখার জন্য যথেষ্ট। তবে ধীরে ধীরে ফোর-কে বা আরও বেশি রেজল্যুশনের ভিডিওর পরিমাণ বাড়লে ফাইভ-জি থেকে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
ফাইভ-জি এলে ডিজিটাল বিভাজন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়ত অন্যদের তুলনায় এগিয়ে আছে। তবে বিশ্বের অনেক দেশে ফোর-জিই ঠিকমতো চালু হয়নি। এতে এক অঞ্চলের মানুষ উচ্চ গতির ইন্টারনেট সেবা পেলেও বাকিরা ফোর-জি বা আগের প্রজন্মের নেটওয়ার্কে পড়ে থাকবে। এর ফলে বিভাজন বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।