অর্থনীতি

যে কারণে আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
গেল আগস্ট মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে ৫ দশমিক ৪৯ ভাগ হয়েছে। জুলাই মাসে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৬২ ভাগ।
সম্প্রতি শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কে একনেক বৈঠক শেষে মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
তিনি জানান, আগস্টে ঈদুল আজহা শেষে বাজারে ক্রেতাদের চাপ কম ছিল। তাছাড়া বৃষ্টিও কমে এসেছে এবং যোগাযোগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এজন্য মূল্যস্ফীতির চাপ আগের মাসের চেয়ে কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এক মাসের ব্যবধানে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে বলে পরিকল্পনামন্ত্রী উল্লেখ করেন।
হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগস্টে দেশে সার্বিকভাবে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২৭ ভাগ, যা আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ৫ দশমিক ৪২ ভাগ। আগস্টে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮২ ভাগে, যা জুলাই মাসে ছিল ৫ দশমিক ৯৪ ভাগ।
ঈদুল আজহার মাস হওয়া সত্ত্বেও আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমে আসার বিষয়ে বিবিএসের মহাপরিচালক ড. কৃষ্ণা গায়েন বলেন, বিবিএস প্রতি মাসের ১৩ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির তথ্য সংগ্রহ করে। এ সময়ের তথ্যের ভিত্তিতেই মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয়েছে।
গ্রাম পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, আগস্টে দেশের গ্রামীণ এলাকার মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৪ ভাগ, যা জুলাই মাসে ছিল ৫ দশমিক ৪৯ ভাগ। এ সময় গ্রামীণ পর্যায়ে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬০ ভাগ হতে কমে ৫ দশমিক ৩৮ ভাগ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ২৭ ভাগ হতে কমে ৫ দশমিক ২৫ ভাগ হয়েছে।
অন্যদিকে আগস্টে শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ ভাগে, যা জুলাই মাসে ছিল ৫ দশমিক ৮৮ ভাগ। এ সময় শহরাঞ্চলে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক শূন্য তিন ভাগ হতে কমে ৫ দশমিক শূন্য ২ ভাগ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ৮৪ ভাগ হতে কমে ৬ দশমিক ৬০ ভাগ হয়েছে।
কোনো কালপরিধিতে পণ্য-সেবার মূল্য টাকার অংকে বেড়ে গেলে অর্থনীতির ভাষায় তাকে মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি বলে। সাধারণত পণ্যের দাম বেড়ে গেলে স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে ওই পণ্য ক্রয়ে বেশি পরিমাণ মুদ্রার প্রয়োজন কিংবা একই পরিমাণ মুদ্রা দিয়ে আগের পরিমাণ পণ্য কিনতে গেলে পরিমাণে কম পাওয়া যায়। সুতরাং মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়মতা কমে যায়। একইভাবে অর্থনীতিতে পণ্যের আসল বিনিময়মূল্য কমে যায়।
মূল্যস্ফীতি একটি দেশের অর্থনীতিতে একাধারে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে মানুষ নগদ অর্থ সঞ্চয়ের বদলে তা খরচ করে ফেলতে বাধ্য হয়। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঞ্চয়ের অভাবে ভোগে এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে আসে। এছাড়াও মূল্যস্ফীতির ফলে গৎ বাঁধা আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে আসে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের প্রকৃত হার পুনরায় নিরূপণ করতে হয়।
অপরদিকে ইতিবাচক প্রভাবগুলো হলো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী হয়, যার ফলে অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং যার মাধ্যমে নতুন উপভোক্তা তৈরি হয়।
আধুনিক অর্থনীতিবিদরা সবসময় একটি স্বল্প কিন্তু স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতির পে মত দেন। কারণ, স্বল্পমাত্রার ও স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির সূচকগুলোকে চলমান রাখে এবং এর বাজারগুলোকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও সচল ও স্থিতিশীল রাখে।
উল্লেখ্য, দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির গড় হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থবছরের শুরুতে গ্যাসের বাড়তি দর কার্যকর হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দিনেই এ ধরনের বার্তা সাধারণের কাছে অনেকটা হতাশা আর বিরক্তির কারণ। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) আশঙ্কা, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে যাপিত জীবনে ব্যয় বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ।
সংস্থাটির মতে, বাসাবাড়ি ও শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হয়েছে। গৃহ, শিল্প, বাণিজ্য পরিবহনসহ সব খাতেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ লেগেছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের মাসের খরচ আরও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। দাম বাড়ছে হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবারের। পোশাক, বস্ত্র, স্টিল মিলসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতি বছরই বাড়ছে। বিশেষ করে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, খাবার, যাতায়াত, সন্তানের পড়ালেখার খরচ বেড়েই চলেছে। অথচ এসব খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত আয়সীমা এক টাকাও বাড়ানো হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। এরপর প্রতি বছরই পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে। তবু এ সীমা চলতি অর্থবছর পর্যন্ত একই আছে।
২০১৬ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। এর পরের বছর এ বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশের বেশি। আর গত বছর জীবনযাপনের খরচ বেড়েছে ৬ শতাংশ। প্রত্যেককে পরো কর হিসেবে দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে ও সেবা কিনতে একটা নির্দিষ্ট অংকের অর্থ সরকারকে দিতে হচ্ছে। সাধারণ আয়ের মানুষ এসব খরচে হিমশিম খাচ্ছে। এজন্য প্রত্য করে ছাড়ের প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। এ েেত্র করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানোর পরামর্শও আছে তাদের।