রাজনীতি

অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে জামায়াত!

নিজস্ব প্রতিবেদক
বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে জামায়াত। অনেকটা অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথেই রয়েছে দলটি। দলের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে নতুন নামে যাত্রা অথবা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য মা চেয়ে সামগ্রিক পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে পাপস্খলনের চেষ্টা, নাকি বিদ্যমান অবস্থানে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা Ñ এ নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকদের মাঝে মতবিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে। এর জের ধরে মাসচারেক আগে এক শীর্ষ নেতা পদত্যাগও করেছেন, যা দলের ভেতরে আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। জামায়াতের ভেতরে চলমান ঘটনাবলি দলটিকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেয়ার মধ্যেই সীমিত থাকবে, নাকি পুরো রাজনীতিতে (বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক) ওলটপালট ঘটাবে, এ নিয়ে দলের ভেতের-বাইরে চলছে আলোচনা। কৌতূহলী নজর রাখছেন রাজনীতিসচেতন মহলও।
বিতর্ক কখনো পিছু ছাড়েনি মওদুদীবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াতকে। বিশেষত একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা ও শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের কারণে ধিকৃত হয়ে আসছে দলটি। স্বাধীনতার পর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আনুকূল্যে পুনর্গঠিত হয় জামায়াত। এরপর সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক ছাত্রসংগঠন গড়ে তোলা এবং বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কারণে অনেকের কাছে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট হিসেবে বিবেচিত হয় জামায়াত।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নামে আর্থিক সুবিধাসহ নানা প্রলোভনে যুবসমাজের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয় জামায়াত। তবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার কারণে ব্যাপক জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যায় দলটি। বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে রাষ্ট্রমতার স্বাদ নেয়ার পাশাপাশি রাজনীতিতেও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে জামায়াত।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট মতায় আসার পর ট্রাইব্যুনাল গঠন করে শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এ বিচারে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার শেষে রায় কার্যকর করা হয়। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচারের মধ্য দিয়ে ফাঁসি হলেও এ বিষয়ে নিশ্চুপ ছিল জোট শরিক বিএনপি। তবে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের মা চাওয়ার বিষয়ে বিএনপিরও সায় আছে বলে জানা যায়। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলটির শীর্ষ নেতৃত্বও চায় জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে মা প্রার্থনা করুক।
যে ইস্যুতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশিষ্ট আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন, একই ইস্যুতে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুকে। জামায়াতের সংস্কার চাওয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
অতীতে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরে কয়েকবার ভাঙন ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটলেও এই প্রথম জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের কোনো নেতা সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে পদত্যাগ করলেন, যা জামায়াতকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেয়া, নতুন নামে দল গঠন করাসহ আরো কিছু কর্মপন্থা নিয়ে জামায়াতের ভেতরে একটি অংশ বেশ সক্রিয়। মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত এই অংশের বিরুদ্ধে তৎপর কট্টরপন্থি অংশও। এ নিয়ে দলটির ভেতরে দুটি ধারার সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপন্থি অংশটি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার ঐতিহাসিক লজ্জা থেকে মুক্ত হতে চায়। তাদের অন্যতম ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। যদিও দলের ভেতরে মধ্যপন্থা বা উদার নীতিকৌশল গ্রহণে আগ্রহী এই অংশের বেশিরভাগ অপোকৃত তরুণ এবং একাত্তরের পরের প্রজন্ম। তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মানুষের আবেগ, মানবতাবিরোধী অপরাধে নেতাদের সাজা ও ইসলামপন্থি রাজনীতির বিশ্ব প্রোপট বিবেচনায় নিয়ে দলের নাম পরিবর্তন করে আধুনিক ধাঁচের দল গড়ার প।ে কারাগারে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এ চিন্তার পে সক্রিয় ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী। কামারুজ্জামান কারাগার থেকেও এর পে চিঠি লিখেছিলেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের পর গুঞ্জন ওঠে জামায়াতের ভাঙন নিয়ে। আলোচনায় উঠে আসে, তবে কী রাজ্জাকের নেতৃত্বে দলের সংস্কারপন্থিদের নিয়ে নতুন দল গঠন করা হবে? অবশ্য এ বিষয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, নতুন দল করার কোনো চিন্তা তিনি করছেন না। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে দেশের সেবায় কাজ করে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
একই সঙ্গে তিনি পদত্যাগপত্রের শেষ দিকে লিখেছেন, এখন থেকে তিনি নিজ পেশায় আত্মনিয়োগ করবেন। সেই সঙ্গে ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধি ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও মজিবুর রহমান মঞ্জু এখনো কোনো নতুন দলের ঘোষণা দেননি। জামায়াত ভেঙে তারা নতুন দল বানাবেন সে সম্ভাবনা ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। মূল জামায়াতের ভঙ্গুর অবস্থা দেখে তারা হয়ত নতুন দল গঠনে সাহস পাচ্ছেন না।
রাজ্জাক ও মঞ্জুবিহীন জামায়াত এখন অনেকটা খাদের কিনারে। তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা এখন নেই বললেই চলে। জামায়াত ও ছাত্রশিবির এখন অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বড় মিত্র বিএনপিও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। ফলে এখন অনেকটা অস্তিত্ব বিলীনের পথেই রয়েছে জামায়াত।