কলাম

ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু যেভাবে হলেন ইন্দিরা গান্ধী

স্বদেশ খবর ডেস্ক
ইন্দিরা গান্ধী কে ছিলেন? এই প্রশ্ন করলে অনেকেই বলে থাকেন, ইন্দিরা গান্ধী হচ্ছেন মহাতœা গান্ধীর কন্যা, যিনি পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
যখন বলা হয়, ইন্দিরা গান্ধী মহাতœা গান্ধীর কন্যা নয়, বরং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর কন্যা, তখন তারা জিভে কামড় দিয়ে বলেন, ওহ, ভুল হয়েছে। আসলে কন্যা না, ইন্দিরা গান্ধী মহাতœা গান্ধীর পুত্রবধু ছিলেন।
কেউ কেউ আবার নাতনিও বলেন।
এবারও যখন বলা হয়, এটাও ভুল, ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মহাতœা গান্ধীর পারিবারিক কোনো সম্পর্কই নেই, তারা বিশ্বাসই করতে চায় না।
এরকম ভুল ধারণা অনেকেরই আছে। উপমহাদেশের পারিবারিক রাজনীতির ধারাবাহিকতার কারণে এরকম ধারণা অস্বাভাবিক নয়। নামে যেহেতু গান্ধী আছে সেহেতু এরকম মনে করাটাই বরং স্বাভাবিক।
ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু, যিনি পরবর্তীতে ইন্দিরা গান্ধী নামেই খ্যাত হয়েছেন তিনি আসলে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কন্যা। জওহরলাল নেহেরু ইন্দিরাকে অক্সফোর্ডে পাঠান উচ্চ শিা লাভ করতে। সে সময় ভারত থেকে আরেকজন যুবক অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করছিলেন। তার নাম ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধী। উল্লেখ্য, এই গান্ধী আসলে ভারতের ‘এধহফযর’ নয়। এটি পার্সিয়ান পদবি এযধহফু, কিন্তু ভারতে গান্ধীই উচ্চারণ করা হতো।
ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধী বা সকলের কাছে ফিরোজ গান্ধী নামে পরিচিত ব্যক্তির পূর্বপুরুষরা পারস্য থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ফিরোজ গান্ধীকে অনেকে মুসলিম বলেন আবার অনেকে অমুসলিম বলেন। তবে তিনি হিন্দু ছিলেন না।
ফিরোজ অক্সফোর্ডে যাওয়ার আগেই ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য হন। পার্টির কাজের সুবাদে নেহেরু পরিবারের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয় ফিরোজের। একপর্যায়ে ১৬ বছরের ইন্দিরাকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করেন ২২ বছরের যুবক ফিরোজ। ইন্দিরার মা কমলা গান্ধীকে তা জানালে তিনি সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিয়ে সে সময় অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল, নেহেরু পরিবারের মতো রাজনৈতিক পরিবারের জন্য তো বটেই। কিন্তু অক্সফোর্ডে গিয়ে ইন্দিরা ও ফিরোজের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, একে অন্যের গভীর প্রেমে পড়েন।
পিতা জওহরলাল নেহেরুর সাথে কন্যা ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরুর সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ। কন্যাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন পিতা। লন্ডন থেকে পিতাকে অনেকগুলো চিঠি পাঠিয়েছিলেন কন্যা। পিতাও দিতেন উত্তর। একপর্যায়ে নিজের প্রেমের কথা জানালেন ইন্দিরা। কিন্তু পিতা জোরালো আপত্তি তুললেন। কোনোভাবেই ভিন্ন ধর্মের কারো সাথে বিয়ে দিতে রাজি নন তিনি। এরপর প্রতিটি চিঠিতে ইন্দিরা তার প্রেমের সম্পর্কের গভীরতার কথা জানিয়েছেন। ফিরোজকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবেন না এমন প্রতিজ্ঞা শুনিয়েছেন। জওহরলাল নেহেরু বুঝতে পেরেছিলেন, কন্যাকে থামানো সম্ভব নয়।
দিশেহারা জওহরলাল নেহেরু ছুটে গেলেন মহাতœা গান্ধীর কাছে। ইন্দিরাকে বিশেষ স্নেহ করতেন তিনি। গান্ধী হয়ত বোঝাতে পারবেন ইন্দিরাকে – এরকম ীণ আশা নিয়েই হয়ত গিয়েছিলেন নেহেরু। কিন্তু মহাতœা গান্ধীও পারলেন না অথবা চেষ্টা করলেন না।
মহাতœা গান্ধী জওহরলাল নেহেরুকে বললেন, আমার পুত্রের সাথে ইন্দিরাকে বিয়ে দিতে রাজি হবে? জওহরলাল নেহেরু সম্মতি জানালেন। মহাতœা গান্ধী বললেন, আজ থেকে ফিরোজ আমার পুত্র। ততদিনে ফিরোজ গান্ধী এমনিতেও মহাত্মা গান্ধীর নামের সাথে মিল রেখে নামের এযধহফু কে এধহফযর লিখে গান্ধী নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন।
১৯৪২ সালে হিন্দু রীতি মেনে বিয়ে হয় ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু ও ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর। শেষ পর্যন্ত আপত্তি থাকলেও পিতা জওহরলাল নেহেরু মেনে নিলেন বিয়ে। আসলে মেনে নিতে বাধ্য হলেন। ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু হয়ে গেলেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী, যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হলেন ইন্দিরা গান্ধী নামে।
অবশ্য এ বিয়ের বিতর্ক আজীবনই শুনতে হয়েছে ইন্দিরাকে এবং কংগ্রেসকে। বিরোধী প ফিরোজ গান্ধীকে মুসলমান বলে প্রচার করেছে। বলেছে, ইন্দিরা গান্ধী আসলে মুসলমান হয়ে গেছে। সে অন্য ধর্মের লোককে বিয়ে করে হিন্দুত্ব ত্যাগ করেছে। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর নাম পরিবর্তন করে নাকি মায়মুনা বেগম রাখা হয়েছে।
বিয়ের পর দু’জন আলাদা ধর্মই বজায় রেখেছিলেন, নাকি ফিরোজ হিন্দু ধর্মই মেনে চলতেন নাকি ইন্দিরা হিন্দু ধর্মও মানতেন না সে নিয়ে আছে নানা মত। ভারতের রাজনীতিতে গোঁড়া হিন্দু ও অশিতি সাধারণ মানুষের কাছে এ প্রচারণা ভালোই গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রকৃতপে মহাতœা গান্ধীর সাথে ইন্দিরা গান্ধীর পারিবারিক কোনো সম্পর্ক নেই। ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর সাথে বিয়ের কারণেই গান্ধী পদবি লাভ করেন ইন্দিরা। আর ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর পরিবার এসেছিলেন পারস্য থেকে। ফিরোজের পিতার নাম ফরিদুন জাহাঙ্গীর খান গান্ধী (এযধহফু)।
ফিরোজ গান্ধী নিজেও রাজনীতিবিদ ছিলেন। লোকসভার (ভারতীয় পার্লামেন্ট) নির্বাচিত সদস্যও ছিলেন তিনি।