অর্থনীতি

ঊর্ধ্বমুখী মূল্য মোকাবিলায় খোলাবাজারে পিঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ টিসিবির

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারত রপ্তানি মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে পিঁয়াজ নিয়ে হুলুস্থুল কা- বেধে যায়। সবাই পিঁয়াজ কেনার জন্য ছুটছেন। দাম আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যার ১ কেজি প্রয়োজন, তিনি ৫ কেজি কিনে মজুদ করছেন।
পিঁয়াজ নিয়ে ক্রেতাদের এই টানাটানিতে বিক্রেতাদের হয়েছে পোয়াবারো। তারা দুই-তিন লাফে পিঁয়াজের দর ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়েছেন।
ক্রেতাদের মতো সরকারের সংশ্লিষ্টরাও পিঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধিতে মনে হয় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টিসিবিকে সঙ্গে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে। টিসিবির মাধ্যমে কত পিঁয়াজ বাজারে ছাড়া যায়, কোন কোন দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানি করা যায়, কত কম দামে ক্রেতার হাতে পিঁয়াজ তুলে দেয়া যায় Ñ এসব নিয়ে অনেকের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড় হয়েছে। বললে বেশি হবে না যে, ডেঙ্গু নিয়ে যত মাতামাতি হয়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে পিঁয়াজ নিয়ে। ভাবখানা এমন, পিঁয়াজ না খেলে লোকজন দম আটকে মারা যাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ক্রেতার হাতে কম দামে পিঁয়াজ তুলে দিতেই হবে!

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পিঁয়াজের দর বাড়ার প্রোপটে দেশটির সরকার সম্প্রতি পিঁয়াজ রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করার পরই বাংলাদেশের পিঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ঘোষণার পরপরই চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পিঁয়াজের পাইকারি দর কেজিপ্রতি ৭০ টাকায় উঠে যায়। ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তগুলোতে পাইকারি দর ৭৫ টাকায় ওঠে। প্রশ্ন দেখা দেয়, ভারতে মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণার অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশে পিঁয়াজের দর কী করে ৮০ টাকায় উঠে যায়? তাহলে বাংলাদেশে মজুদ হাজার হাজার টন পিঁয়াজ কোথায় গেল?
ভোক্তাদের দাম কমানোর আশ্বাস দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুচরা বাজারে পিঁয়াজের দাম কমে আসবে। বর্তমানে দেশে ২৮ লাখ টন পিঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এই পিঁয়াজ বাজারে এলে ভোক্তারা সহনীয় মূল্যে পিঁয়াজ কিনতে পারবেন। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবি খোলা বাজারে ৪৫ টাকা কেজিতে পিঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে।
১৭ সেপ্টেম্বর পিঁয়াজের দাম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করেন নবনিযুক্ত বাণিজ্যসচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন। এতে ট্যারিফ কমিশনের সদস্য আবু রায়হান আল বিরুনি ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় দাম বৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করে সচিব বলেন, ভারতের মহারাষ্ট্রে পিঁয়াজের ফলন ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হলে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে দর বেশ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ভারত সরকার পিঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে। আগে যেখানে ২৫০-৩০০ ডলারে আমদানি করা যেত, তা ৮৫০ ডলারে উঠেছে।
বাণিজ্যসচিব আরও বলেন, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি রোধে ন্যায্য মূল্যে ট্রাক সেলের মাধ্যমে খোলা বাজারে পিঁয়াজ বিক্রির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পিঁয়াজ আমদানির েেত্র এলসি মার্জিন এবং সুদের হার হ্রাসের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এক থেকে দেড় মাসের জন্য এই সমস্যা হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, আশা করি টিসিবি কার্যকর ভূমিকা পালন শুরু করেছে। শিগগিরই এ সাময়িক সংকটটি কেটে যাবে।
গত কোরবানি ঈদের আগে থেকে পিঁয়াজের দাম বাড়ছে। ঈদুল আজহার সময় ৫০ টাকার নিচে কোথাও পিঁয়াজ পাওয়া যায়নি। এমনকি কোরবানি শেষ হলেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ছে। তাই দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিসিবির মাধ্যমে ট্রাক সেলে পিঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বর্তমান খোলা বাজার থেকে ৪৫ টাকা দরে টিসিবির পিঁয়াজ কিনছে নগরবাসী। কম দামে টিসিবির পিঁয়াজ কিনতে ট্রাকগুলোর সামনে লাইন লম্বা হচ্ছে মানুষের।
এদিকে পিঁয়াজের বাজার ও আমদানি পরিস্থিতি তুলে ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন। তাতে পিঁয়াজের স্থানীয় বাজারদর অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে পিঁয়াজ আমদানির েেত্র ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পিঁয়াজ আমদানির বিকল্প উৎস মিয়ানমার, পাকিস্তান, মিশর, চীন ও তুরস্ক থেকে আমদানির েেত্র ব্যবসায়ীদের সহায়তা করা যেতে পারে। পিঁয়াজ আমদানির সময় জাহাজীকরণের েেত্র কয়েকজন আমদানিকারকের একত্রে পণ্য পরিবহনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
স্থানীয় বাজারে পিঁয়াজ সরবরাহ নির্বিঘœ রাখার পরামর্শ দিয়ে ট্যারিফ কমিশন বলেছে, চীন ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পিঁয়াজ যেহেতু চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আসে, তাই আমদানি করা পিঁয়াজ দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। মিয়ানমার থেকে আমদানি হওয়া পিঁয়াজ টেকনাফ থেকে সারাদেশে সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজার মনিটরিং জোরদার করার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
এদিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা দোকানিদের নিজেদের ইচ্ছামতো দরে পিঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারের একজন মুদি দোকানদার স্বদেশ খবরকে বলেন, দেশি কিংবা ভারতীয় সব ধরনের পিঁয়াজের দরই ৮০ টাকা কেজি।
ওই এলাকার অন্য এক দোকানদার জানান, ৭৫ টাকা কেজি দরে পিঁয়াজ বিক্রি করছেন তিনি। ফকিরাপুল কাঁচা বাজারের মুদি দোকানের কোনোটিতে ৭৫ টাকা, কোনোটিতে ৮০ টাকা কেজি দরে পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। দামের পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতারা একবাক্যে জানান, ভারত পিঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে। তাই দেশেও বেড়েছে।