প্রতিবেদন

ক্রমেই দৃশ্যমান বাস্তবতায় পদ্মাসেতু

নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বপ্নের পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। বছর চারেক আগেও পদ্মা নদীর ওপর পদ্মাসেতু হওয়া ছিল অলীক কল্পনা। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুর অর্থায়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দুর্নীতির অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে বিশ্বব্যাংক আবার পদ্মাসেতুতে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করলেও সরকার নিজস্ব অর্থায়নে দেশের দীর্ঘতম এ সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথমদিকে শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্তে ঘরে-বাইরে নানা সমালোচনা থাকলেও সেই পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা।
পদ্মাসেতুর অ্যালাইনমেন্ট ধরে এগোলে মাটির ওপর ও নদীর ওপরে নির্মিত অবকাঠামো দেখে যে কারোরই মনে হবে ২০২১ সালের জুনের আগেই এই সেতু দিয়ে যান চলাচল করবে। ৪২টি খুঁটিতে ৪১টি স্প্যান বসাতে হবে। এর মধ্যে ১৮টি খুঁটিতে স্প্যান বসানো হয়েছে ১৪টি। মাওয়া থেকে জাজিরা পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে সেতুর ২ হাজার ১০০ মিটার ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
পদ্মাসেতুর টোল প্লাজা এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। মাওয়া সংযোগ সড়কের নির্মাণও শেষ। সেই সড়কের ওপর দিয়ে পাথর নিয়ে ছুটে চলছে ভারী ট্রাক, মাথায় নিরাপত্তা টুপি পরা শ্রমিকদের চলাচলও চোখে পড়ার মতো।
মাওয়ার পদ্মাপাড়ে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড ২ কিলোমিটার জুড়ে। পাইল তৈরি বহু আগেই শুরু হয়েছিল এখানে। ট্রাস ফ্যাব্রিকেশন ইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে সেতুর ওপর বসানোর কাঠামো স্প্যান। স্প্যান হলো দুটি খুঁটির দূরত্বের মধ্যে বসানোর জন্য কাঠামো, যার ওপর দিয়ে গাড়ি চলাচল করে। চীন থেকে আনা মেম্বার ও জয়েন্ট একসঙ্গে জোড়া দিয়ে স্প্যানের কাঠামোর পূর্ণতা দেয়া হচ্ছে। একটি স্প্যানে লাগে ১২৯টি মেম্বার। প্রতিটি স্প্যান ১৫০ মিটার দীর্ঘ।
সেতুর ৪১টির মধ্যে ১৪টি স্প্যান বসানো হয়েছে। আরো ৫টি স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। বর্ষায় পদ্মা উত্তাল থাকায় এগুলো বসানো যায়নি। মাওয়া ও জাজিরার মধ্যস্থলে ২৪ ও ২৫ নম্বর খুঁটির দূরত্বের মধ্যে ১৫তম স্প্যানটি বসানোর সম্ভাবনা বেশি। এরই মধ্যে চীন থেকে ২৭টি স্প্যান মাওয়ায় পৌঁছেছে।
উল্লেখ্য, পদ্মাসেতু হবে দোতলা; যার ওপরে সড়কপথ ও নিচে থাকবে রেলপথ। সড়কপথের ওপরের অংশ নির্মাণের জন্য স্ল্যাব তৈরি হচ্ছে পুরোদমে। এসব স্ল্যাব তৈরি করে রাখা হচ্ছে প্রকল্প এলাকায়। সেতুর স্প্যান বসানোর পর স্ল্যাব বসাতে হচ্ছে। সড়কপথে ২ হাজার ৯৩১টি স্ল্যাব বসানো হবে, এর মধ্যে ১ হাজার ৩৭০টি তৈরি শেষ হয়েছে। নিচে রেলপথে স্ল্যাব বসানো হবে ২ হাজার ৯৫৯টি, এর মধ্যে ২ হাজার ৮১৯টি তৈরি শেষ হয়েছে।
মাওয়া ও জাজিরায় সংযোগ সেতু বা ভায়াডাক্ট নির্মাণকাজও সমানতালে এগিয়ে চলছে। মূল সেতুর ১১টি খুঁটিতে ঢালাইয়ের কাজ চলছে। সেতুর ২৯৪টি পাইল বসানো হয়েছে। মূল সেতু নির্মাণ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি)। নদীশাসনের কাজ করছে সিনো হাইড্রো করপোরেশন। ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে।
মাওয়ায় ৪ ও ৫ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয়েছে একটি স্প্যান। নদীর বুকে ১৩ থেকে ১৬ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয়েছে ৩টি স্প্যান। আরো একটি স্প্যান বসানো হয়েছে ২০ থেকে ২১ নম্বর খুঁটিতে। তবে ৩৩ থেকে ৪২ নম্বর খুঁটিতে আছে একের পর এক টানা ৯টি স্প্যান। সেতুর অবয়ব এখানে পুরো মাত্রায় ফুটে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুসারে, চলতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের মূল সেতুর কাজ হয়েছে ৮৩.৫০ শতাংশ। মূল সেতুর সব কয়টি খুঁটির ড্রাইভিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরায় সেতুর সংযোগের অংশ ভায়াডাক্টের পাইলিং ও খুঁটি বসানো শেষ হয়েছে। এখন পিয়ার ক্যাপের কাজ শেষ পর্যায়ে এবং গার্ডার স্থাপনের কাজ চলছে। মূল সেতুর নির্মাণকাজের চুক্তিমূল্য ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯০৩.৪২ কোটি টাকা। নদীশাসন কাজ এগিয়েছে ৬২.৫০ শতাংশ। ১৪ কিলোমিটার নদীশাসন কাজের মধ্যে ৬ দশমিক ৬০ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। নদীশাসন কাজের চুক্তিমূল্য ৮ হাজার
৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। দুই প্রান্তে সংযোগ সড়কের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। পুরো প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৩.৫০ শতাংশ।
এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০২১ সালের জুন নাগাদ পদ্মাসেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া সম্ভব হবে। এ সেতুর পরিচালন, রণাবেণ ও টোল আদায়ে দণি কোরিয়ার কোরিয়া এক্সপ্রেস করপোরেশন (কেইসি) ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপরে মধ্যে গত ১২ সেপ্টেম্বর সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, পদ্মাসেতুর টোল আদায়ে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) পদ্ধতি চালু করা হবে। কোনো যানবাহনকে টোল বুথে থামতে হবে না। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ট্রাফিক ইনফরমেশন অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হবে। তাতে প্রতি মুহূর্তে সড়ক, সেতু বা এর আওতাধীন অন্য যেকোনো অবস্থানে বিদ্যমান যানবাহন সংক্রান্ত তথ্যাদি মোবাইল ফোন, বেতার বা অন্য কোনো ডিভাইসের মাধ্যমে জানা যাবে।