রাজনীতি

খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার শপথ নিলেন ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ ২৭ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে এবার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইকবাল হোসেন শ্যামল।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে ভোট গণনা শেষে এই ফলাফল ঘোষণা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টায় রাজধানীর শাহজাহানপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ৬টি বুথে ৫৩৩ জন কাউন্সিলরের ভোট প্রদান করার কথা থাকলেও ভোট পড়ে ৪৮১টি।
১৮৬ ভোট পেয়ে ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন খোকন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ পেয়েছেন ১৭৮ ভোট।
১৩৯ ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন ইকবাল হোসেন শ্যামল। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাকিরুল ইসলাম জাকির পেয়েছেন ৭৬ ভোট।
নির্বাচনে সভাপতি পদে ৯ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
ছাত্রদলের নবনির্বাচিত সভাপতি ফজলুর রহমান খোকনের বাড়ি বগুড়া জেলায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স করেছেন। তিনি সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র। ছাত্রদলের গত কমিটিতে গণশিা বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন তিনি।
সাধারণ সম্পাদক শ্যামলের বাড়ি নরসিংদীতে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সায়েন্সের শিার্থী ছিলেন। শ্যামল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
ছাত্রদলের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর। নির্বাচনের আগে স্কাইপেতে প্রার্থী ও কাউন্সিলদের মতামত নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচন শেষে আবারো স্কাইপেতে ছাত্রদলের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তারেক রহমান।
খোকন ও শ্যামল দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থী। তাদের নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে কাউন্সিলররা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করলেন। সরাসরি ভোটে নেতা নির্বাচিত হওয়ায় সবাই ফল মেনে নিয়েছেন, দেখা যায়নি কোনো বাদ-প্রতিবাদ ও বিােভ।
ষষ্ঠ কাউন্সিলে ৯ জন সভাপতি প্রার্থী এবং ১৯ জন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীর মধ্য থেকে এই দু’জনকে বেছে নিয়েছেন কাউন্সিলররা। সারাদেশে ছাত্রদলের ১১৭টি সাংগঠনিক শাখার ৫৩৪ কাউন্সিলরের মধ্যে ৪৮১ জন ভোটাভুটিতে অংশ নেন।
নির্বাচিত হওয়ার পর ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক শ্যামল তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান, নানা কারণে ছাত্রদল তাদের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করবেন তারা।
এই দুই নেতা আরো জানান, রাজপথে থেকে বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে তারা কাজ করবেন। এ মুহূর্তে দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন ত্বরান্বিত এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম বেগবান করাই তাদের অন্যতম ল্য। শিাঙ্গনে শিার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, মুক্তচিন্তার পরিবেশ সৃষ্টি, হলে সব সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিতে তারা ছাত্রসমাজকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন বলে জানান।
জানা গেছে, বিএনপির সিনিয়র নেতাদের স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন অনেকটা ভেস্তে যেতে বসেছিল। তাদের রেষারেষির কারণে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। একেক সিনিয়র নেতা একেক লবিতে ভাগ হয়ে পড়েন। ফলে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বহু প্রার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়। সিনিয়র নেতাদের এই কামড়াকামড়িতে শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ছাত্রদলের কাউন্সিল স্থগিত হয়ে যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ছাত্রদলের কাউন্সিলে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ১২ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন ছাত্রদলের সদ্যবিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আমান উল্লাহ।
জানা গেছে, আমান উল্লাহকে মামলা করার মতো সাহস জুগিয়েছেন বিএনপিরই এক সিনিয়র নেতা। কাউন্সিল স্থগিত করে দেয়ার জন্য আমান উল্লাহ আসলে কোনো ফ্যাক্টরই ছিলেন না। তিনি তার গুরুর (সিনিয়র নেতা) কথামতো কাজ করেছেন। ওই সিনিয়র নেতা যখন নিশ্চিত হয়েছেন, তার আশীর্বাদপুষ্ট প্রার্থী ভোটাভুটিতে কিছুতেই ছাত্রদল সভাপতি হতে পারবে না, তখনই তিনি আমানকে দিয়ে মামলাটি করান। আবার মামলার জন্য বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনটিকে বেছে নেন। শুক্র ও শনিবার (১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর) কোর্ট বন্ধ থাকায় উচ্চ আদালতে রিট করে ১৪ সেপ্টেম্বর রবিবার যাতে কাউন্সিল আয়োজন করা না যায়, সেজন্যই বৃহস্পতিবার দিনটিকে বেছে নেয়া হয়েছে বলে বিএনপির অনেক তৃণমূল নেতা মনে করেন।
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় সমস্যা। কোনো নেতাই আরেক নেতাকে বিশ্বাস করেন না, একজনের প্রার্থীর নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা জেগে উঠলে আরেকজনের মাথা খারাপ হয়ে যায়। সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে কিভাবে কাউন্সিল বা নির্বাচন স্থগিত করে দেয়া যায়, সে চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেন।
বিএনপির এক তৃণমূল নেতা জানান, আদালতের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ আছে Ñবিএনপির এমন এক সিনিয়র নেতাই ছাত্রদলের কাউন্সিল স্থগিতের কাজটি করেছেন। সরকারি দলের একটি অংশের প্ররোচনায় তিনি এ কাজটি করেছেন বিএনপি যাতে খালেদা জিয়ার মুক্তিপ্রশ্নে আন্দোলনমুখী হতে না পারে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে। ওই নেতা এখন ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন। বলছেন, বিএনপির একজন নেতার বাসায় ভোটাভুটি হয়েছে। এটি একটি অগণতান্ত্রিক পন্থা। মির্জা আব্বাসের বাসায় আসলে ইলেকশন হয়নি, সিলেকশন হয়েছে।
শুধু ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনই নয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে বিএনপির নেতারা যে হারে এখনই মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন, তার ছিটেফোঁটাও ফেলছেন না খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে। সব নেতাই ব্যস্ত আছেন যার যার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে।