ফিচার

ঘুরে আসুন তিস্তা ব্যারেজ থেকে

স্বদেশ খবর ডেস্ক
উত্তর জনপদের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার অনাবাদী জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাড়তি ফসল উৎপাদনের ল্েয ১৯৩৭ সালে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মূল পরিকল্পনা গৃহীত হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৭ সালে প্রকল্পের কাজ শুরুর উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে লালমনিরহাট ও নীলফামারী মহকুমার সীমান্তে তিস্তা নদীর ওপর ৪৪টি রেডিয়াল গেট সংবলিত ৬১৫ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট ব্যারেজটির নির্মাণকাজ শুরু হয়, শেষ হয় ১৯৯০ সালে। বাইপাস ক্যানেলের ওপর নির্মিত গেটসহ এ ব্যারেজের মোট গেট সংখ্যা ৫২টি।
লালমনিরহাট-নীলফামারী জেলার সীমানা পয়েন্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প হলো তিস্তা ব্যারেজ। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমানা থেকে এক কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী নামের স্থানে তিস্তা নদীর ওপর এ ব্যারেজ, যা তৈরি হয়েছিল নদীভিত্তিক সেচের জন্য। কিন্তু ভারত উজানে ব্যারেজ নির্মাণ করায় এবং বাংলাদেশকে পানি না দেয়ায় এই ব্যারেজের পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়নি।
এ ব্যারেজের চারপাশে প্রকৃতির নিয়মে সৃষ্টি হয়েছে সবুজ বন আর পাখির আবাসভূমি। পর্যটনের সুবিধা না থাকার পরও তিস্তার পাশে সারা বছরই আসেন পর্যটকরা। তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য উঁচু কন্ট্রোল টাওয়ার, স্লুইচ খালের পানি থেকে বালি উত্তোলনের সিলট্রাপ, নদীর ডান তীরে বাঁধের ওপর নির্মিত স্পার দেখতেই পর্যটকদের আগ্রহ বেশি। সবকিছু মিলিয়ে সাজানো-গোছানো ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ।
বর্ষা মৌসুমে এলে দেখা যায় ভারতের গজলডোবা থেকে ধেয়ে আসা প্রবল তিস্তার ধারা মিশেছে এখানে। গ্রীষ্মকালে ধু-ধু চর। মাইলের পর মাইলজুড়ে ধু-ধু চরের সৌন্দর্যও কিন্তু উপভোগ্য।
তিস্তা নদীর স্পেশাল হচ্ছে বৈরালি মাছ। টাটকা মাছ কিনতে পারবেন নৌকা ভ্রমণ করতে করতে। তিস্তার ক্যানাল দিয়ে রংপুর পর্যন্ত যেতে পারবেন। ক্যানাল দিয়ে নৌকা ভ্রমণ দারুণ মজার। দরদাম করে নৌকায় উঠুন। ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া দিতে হয়। তবে প্রতি ঘণ্টায় ২০০ টাকার বেশি কিছুতেই নয়।
তিস্তা ব্যারেজের নদীর দুই তীরে গড়ে তোলা হয়েছে সবুজ বেষ্টনী। এছাড়াও ব্যারেজ এলাকায় রয়েছে কয়েকটি পিকনিক স্পট। ব্যারেজের কালো পিচের রাস্তা ধরে ছুটে চলা কিংবা চারপাশের পরিবেশের মনভোলানো সৌন্দর্য এখানে আগত পর্যটকদের এক অলৌকিক মায়ায় কাছে টানে।

কিভাবে যাবেন
রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য শহর থেকে তিস্তা ব্যারেজ যেতে চাইলে আপনার সুবিধামতো নীলফামারী অথবা লালমনিরহাট জেলায় চলে যান। ঢাকা থেকে নীলফামারী যেতে ট্রেনই সুবিধা। কমলাপুর থেকে সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল আটটায় ছেড়ে যায় নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন। নীলফামারী থেকে তিস্তা ব্যারেজ যাওয়ার জন্য রিকশা, স্কুটার ও মোটরসাইকেল ভাড়ায় পাবেন। আর ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যাওয়ার জন্য বাস অথবা ট্রেনকে বেছে নিতে পারেন। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে শুক্রবার ছাড়া বাকি ৬ দিন রাত ১০টা ২০ মিনিটে লালমনি এক্সপ্রেস যাত্রা করে। এছাড়া গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে হানিফ ও শাহ আলী পরিবহনের বাস লালমনিরহাটে চলাচল করে। লালমনিরহাট সদর থেকে সড়ক পথে তিস্তা ব্যারেজ যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের যানবাহন আছে।

কোথায় থাকবেন
তিস্তা ব্যারেজের পাশে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অবসর রেস্ট হাউজ। যদিও এ রেস্ট হাউজ সকলের জন্য উন্মুক্ত নয়, তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এখানে রাত্রিযাপন করা যায়। এছাড়া রাত্রিযাপনের সুবিধার্থে আপনাকে নীলফামারী বা লালমনিরহাট জেলা সদরের আবাসিক হোটেলগুলোর সাহায্য নিতে হবে। বেশিরভাগ হোটেলের রুম ভাড়াই ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার মধ্যে।

কোথায় খাবেন
তিস্তা ব্যারেজের পাশে বেশ কিছু খাবার হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে রাহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড ফুড কর্ণার, মোহাম্মদিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, বিসমিল্লাহ হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ, টাঙ্গাইল মিষ্টি ঘর ও মাতৃ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের খাবারের মান ভালো।

আরও যা দেখতে পাবেন
তিস্তা ব্যারেজ দেখতে গিয়ে আরও দেখতে পাবেন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় দেশের বড় ছিটমহল দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা। এ ছিটমহলের সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানের মূল ভূখ-ের যোগাযোগের জন্য একটি প্যাসেজ ডোর রাখা হয়েছিল, যার আয়তন ৩ বিঘা। এটিই ৩ বিঘা করিডোর নামে পরিচিত।
তিস্তা ব্যারেজ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের ৩ বিঘা করিডোর ও আঙ্গরপোতা জিরো পয়েন্টে যেতে পারবেন। যাকে বলতে পারেন বাংলাদেশের শেষ বাড়ি।
আরও দেখতে পারেন ৩০ কিলোমিটার দূরের বুড়িমারী স্থলবন্দর। পাটগ্রাম থেকে ১২ কিলোমিটার। এখান থেকে শিলিগুড়ি খুব কাছে। শিলিগুড়ি শহর আবছা আবছা দেখতে পাওয়া যায় সীমান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে। এপার থেকে কেনাকাটা করতে পারবেন রেলিংয়ের ফাঁক গলিয়ে।
তিস্তা ব্যারেজ ঘুরতে গিয়ে ৩ বিঘা করিডোর, আঙ্গরপোতা জিরো পয়েন্ট, বুড়িমারী স্থলবন্দর ও ভারতের শিলিগুড়ি শহর দেখা যাবে সামান্য কিছু টাকা বেশি খরচ করলেই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনার নতুন ভ্রমণ তালিকায় নিঃসন্দেহে স্থান দিতে পারেন তিস্তা ব্যারেজকে।