অর্থনীতি

পুঁজিবাজারে ুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে যে উদ্যোগ নিল বিএসইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ারবাজারে চরম মন্দা বিরাজ করছে। দলে দলে শেয়ারবাজার ছাড়ছেন ুদ্র বিনিয়োগকারীরা। ক্রমাগত লোকসান ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একচেটিয়া দাপটে শেয়ার লেনদেনের বিও হিসাব বন্ধ করে বাজার ছাড়ছেন তারা। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে কোটা সুবিধা বাড়িয়ে ুদ্র বিনিয়োগকারী বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আইপিওর মাধ্যমে মূলধন উত্তোলনে আগ্রহী কোম্পানির শেয়ার বরাদ্দে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
পুঁজিবাজারে সংখ্যার দিক থেকে বেশি ুদ্র বিনিয়োগকারী। এককভাবে তাদের মূলধন বেশি না হলেও সম্মিলিতভাবে তাদের বিনিয়োগ একেবারে কম নয়। অপরদিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সংখ্যায় কম হলেও তাদের বিনিয়োগ অনেক বেশি। তাই শেয়ারবাজার থেকে মূলধন উত্তোলনের স্থির মূল্য ও বুক বিল্ডিং দুই পদ্ধতিতেই সাধারণ বিনিয়োগকারীর কোটা সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ এখন থেকে আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ১০ শতাংশ বেশি শেয়ার বরাদ্দ পাবেন। এই সুবিধা বাস্তবায়ন হলে ুদ্র বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেয়ারবাজারে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে। ২০১০ সালে ধসের পর একটি বড় অংশ এই বাজার ছেড়েছে। গত ৩ বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সাল থেকে ৬ লাখের বেশি বিনিয়োগকারী হিসাব বন্ধ করে শেয়ারবাজার ছেড়েছেন।
ইলেকট্রনিক শেয়ার সংরণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশের (সিডিবিএল) তথ্যানুযায়ী, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ সেকেন্ডারি মার্কেট ও একটি অংশ প্রাইমারি মার্কেটে বা আইপিওতে বিনিয়োগ করে। কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে চাইলে শেয়ার বরাদ্দের জন্য আইপিও আহ্বান করে। আইপিও থেকে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ার সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি করেই মুনাফা পান ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। বিগত কয়েক বছর যাবৎ শেয়ারবাজারে কোম্পানি আসা কমেছে। এতে প্রাইমারি মার্কেটে আইপিওতে শেয়ার বরাদ্দ না পেয়ে হতাশায় বাজার ছেড়েছেন তারা।
সিডিবিএলের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের ২০ জুন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৩টি। তবে ৩ বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগকারী কমেছে ৬ লাখ ৪১ হাজার। চলতি সেপ্টেম্বরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৪৮ হাজার।
বিএসইসি সূত্র জানায়, বাজার নিম্নমুখী হলে ুদ্র বিনিয়োগকারীরা না জেনে, না বুঝেই শেয়ার বিক্রি করতে থাকেন। আর বাজার ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকলে শেয়ার কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। এতে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বাজার নিম্নমুখী অবস্থায় ুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এেেত্র আইপিওতে শেয়ার বরাদ্দ না পাওয়া আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ, যার জন্য ুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কোটা সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
স্থির মূল্য ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে মূলধন উত্তোলনে আগ্রহী কোম্পানিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীর কোটা বাড়িয়ে পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধন করেছে কমিশন। এই কোটা সুবিধায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে সংস্থাটি মনে করছে।
পাবলিক ইস্যু রুলস অনুযায়ী, স্থির মূল্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীর কোটা ছিল ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলন করলে ৪০ কোটি টাকার শেয়ার বরাদ্দ পেত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থে কোটা সুবিধা ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীর কোটা ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বিএসইসির দেয়া এই সুবিধাও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পকেটেই যাবে। সরকার ইতোমধ্যেই শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের প্রায় সব দাবিই প্রত্য ও পরোভাবে পূরণ করেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হয়েছে, প্রাথমিক শেয়ারে (আইপিও) বিশেষ কোটা প্রদান করা হয়েছে, বিভিন্ন আইনকানুন শিথিল করা হয়েছে এবং ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এরপরও সুবিধা আরো বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সিন্ডিকেটটি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। এরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য গলা ফাটিয়ে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করছে। অথচ দিনে দিনে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয় শত শত কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে শেয়ারবাজারের একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট। এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প থেকেও শক্ত পদপে না নিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, যা যথেষ্ট নয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারের মূল সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। এ সংকট কাটাতে ১০ শতাংশ কোটা বাড়ানো নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ডিএসইতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সিন্ডিকেটের দাপটে দীর্ঘ দিন থেকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সিন্ডিকেট ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য মায়াকান্না কাঁদছে, আবার তাদের মধ্যে যাতে আস্থা তৈরি না হয় সে জন্য নানা ফাঁদও সৃষ্টি করছে। ফলে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল ও স্বস্তিদায়ক হওয়ার তেমন কোনো লণ দেখা যাচ্ছে না।