রাজনীতি

রংপুর-৩ আসনে নিশ্চিত জয়ের পথে মহাজোট প্রার্থী এরশাদপুত্র সাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
এরশাদপুত্র সাদকে মহাজোট প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে শেষ পর্যন্ত রংপুর-৩ আসনটি জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের মনোনীত প্রার্থী, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম ১৬ সেপ্টেম্বর তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এ অবস্থায় আসনটির উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেন ৬ জন প্রার্থী। তারা হলেন জাতীয় পার্টির রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ, বিএনপির রিটা রহমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুর রহমান ম-ল, গণফ্রন্টের কাজী শহিদুল্লাহ ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির রংপুর জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে পুরোদমে প্রচারে নেমে পড়েছেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রার্থীরা যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। ভোট পেতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
ভোটাররা বলছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী রেজাউল করিম প্রার্থীতা প্রত্যাহার করায় রংপুর-৩ আসনে নিশ্চিত জয়ের পথে আছেন মহাজোট প্রার্থী এরশাদপুত্র সাদ। ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে সাদ-ই যে জয়লাভ করবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, এই আসনটি এরশাদের। এরশাদ এই আসন থেকে ৬ বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। লাঙলের ঘাঁটি বলা যায় এই আসনটিকে। এই আসন থেকে লাঙলের মনোনয়ন যাকে দেয়া হবে, তিনিই নির্বাচিত হবেন, প্রার্থী যে-ই হোক না কেন।
তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালালেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ তা মানতে নারাজ। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, লাঙ্গলের প্রার্থীর এমন বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। নৌকার প্রার্থী রাজনৈতিক কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। লাঙ্গলের প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি কোনো পর্যায়ে।
তবে ভোটাররা বলছেন, নৌকার সমর্থকরা যদি লাঙলকে ভোট না-ও দেয়, তাতে জাতীয় পার্টির কোনো সমস্যা হবে না। কারণ এই আসনে এককভাবে জাতীয় পার্টির যে ভোট আছে, তা সব দলের সম্মিলিতভাবে নেই। তাছাড়া জাতীয় পার্টি মহাজোটের অংশ। মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এখন সেই নেত্রীর নির্দেশেই আওয়ামী লীগ সমর্থকরা লাঙলে ভোট দিতে বাধ্য। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অর্ধেকও যদি লাঙলে ভোট দেয়, তাহলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রায় তিন দশক রংপুর-৩ (সদর) আসনের এমপি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কারণে শূন্য হওয়া আসনটিতে আগামী ৫ অক্টোবর উপনির্বাচন। উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বড় দলগুলো প্রার্থী ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থীকে প্রত্যাহার করে নিল। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল জাপাকে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চায়। এ জন্য এরশাদের আসনে তাঁর পুত্রকে যোগ্য প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। আবার জাতীয় পার্টি চাচ্ছে তাদের দুর্গ বলে পরিচিত রংপুর-৩ আসনটি ধরে রাখতে; যদিও জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে কোন্দলের পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার।
এদিকে নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরে দাঁড়ানোতে দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে না পারার আপে প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপনির্বাচনে ভোটকেন্দ্র বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে দলের নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়েই সাদ এরশাদের পে মাঠে থাকবে।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম রাজু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ায় তৃণমূল ভোটারদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, রেজাউল করিম রাজু যোগ্য প্রার্থী হলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ায় তিনি ‘বলির পাঁঠা’ হয়েছেন।
জাতীয় পার্টিতে জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের সমঝোতা হলেও রংপুরে দলের একাংশে এখনো ােভ বিরাজ করছে। তা দূর করতে না পারলে দলের জন্য তি হবে বলে মন্তব্য করছেন জাপার অনেকে। তারা বলছেন, সাদের শক্ত প্রতিপ এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়ায় এখন সাদের শক্ত প্রতিপ হবেন আসিফ।
সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, আমরা চেয়েছিলাম স্থানীয় প্রার্থীকে লাঙল প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হোক। এ কারণে সাদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। পার্টি বৃহত্তর স্বার্থে সাদকে মনোনয়ন দিয়েছে। সময় আছে, দেখা যাক কী হয়।
তবে জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফ শাহরিয়ার Ñ দু’জনকেই সাদের পক্ষে মাঠে নামতে হবে। কারণ সাদের পক্ষে মাঠে নামার জন্য দু’জনের ওপরই মহাজোটের চাপ আছে।
তবে জানা গেছে, সাদের পক্ষে এখনও রংপুরে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়নি। কারণ, জি এম কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাঠে দেখা যায়নি। এমনকি সাদের মা রওশন এরশাদও এখনো পুত্রের পক্ষে মাঠে নামেননি। তিনি হয়তো জি এম কাদেরের অপেক্ষায়ই আছেন। রওশন চাচ্ছেন, জি এম কাদের এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে সাদের পক্ষে মাঠে নামতে।
ভোটাররা বলছেন, রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের একযোগে সাদের পক্ষে মাঠে নামলে মুহূর্তেই ভোটের চিত্র পাল্টে যাবে। ভোটাররা তাই রওশন ও জি এম কাদেরকে একসঙ্গে ভোটের মাঠে চাচ্ছেন। তারা মনে করছেন ভাবি-দেবর একসঙ্গে সাদের পক্ষে প্রচারে নামলে তাদের সঙ্গে দেখা যাবে সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আসিফ শাহরিয়ারকেও। আর তখনই সাদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়ে যাবে।