প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে তাগিদ দিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (ইপি)। পাশাপাশি মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে মিয়ানমারের বাণিজ্য সুবিধার যৌক্তিকতার ব্যাপারে ইইউ এখনো তদন্ত শুরু না করায় হতাশা প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের স্ট্রসবার্গে প্লেনারি অধিবেশনে মিয়ানমার, বিশেষ করে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আলোচনা শেষে গৃহীত প্রস্তাবে ওই হতাশা স্থান পায়। গৃহীত ১৫ দফা প্রস্তাবের একটি অনুচ্ছেদে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মিয়ানমার সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ ব্যবস্থার আওতায় মিয়ানমার ইইউয়ে যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) পাচ্ছে তার মৌলিক শর্ত হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকার।
ইইউয়ের নির্বাহী বিভাগ ইউরোপীয় কমিশন মিয়ানমারের জিএসপি পাওয়ার যৌক্তিকতা তদন্ত করবে বলে পার্লামেন্টে গৃহীত প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
আলোচনা পর্বে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন। তারা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে বাণিজ্যসহ সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা কাজে লাগাতে ইউরোপীয় কমিশন এবং ইইউর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানান। বিশেষ করে জেনোসাইড, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ গুরুতর সব অপরাধ সংঘটনের অভিযোগের বৈশ্বিক জবাবদিহির উদ্যোগকে সমর্থন করতে ইইউ, এর সদস্যবৃন্দ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা।
ইউরোপীয় কমিশনের কমিশনার ম্যারিন থাইসেন বলেছেন, রাখাইনে ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলোর পর গত ২ বছরে সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মিয়ানমার থেকে উৎখাত হয়ে কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১০ লাখেরও বেশি। এটি এখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির। আশ্রয় শিবিরের পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও উগ্রবাদের আশঙ্কা বাড়ছে। প্রত্যাবাসন শুরু করার উদ্যোগ দুই দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার সম্ভাবনা ক্রমেই ীণ হয়ে আসছে।
ম্যারিন থাইসেন আরো বলেন, মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ না থাকায় একজন রোহিঙ্গাও ফিরতে রাজি হয়নি। রোহিঙ্গা পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রভাব পড়ছে। ইইউ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। এ জন্য মিয়ানমারকে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিপীয় সব ফোরামে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানাচ্ছে ইইউ। একইভাবে মিয়ানমারের অপরাধীদের জবাবদিহির উদ্যোগকেও ইইউ সমর্থন করছে।
ওই কমিশনার বলেন, ইইউ এরই মধ্যে মিয়ানমারের ১৪ সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। আগামী দিনেও এ বিষয়টি পর্যালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দুর্দশা কমাতে ইইউ কাজ করবে।
ইপিতে গৃহীত প্রস্তাবে জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন এবং বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসার পাশাপাশি এ দেশে তাদের শিার পূর্ণ সুযোগ, চলাফেরার সুযোগ দেয়া এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার আহ্বান রয়েছে ওই প্রস্তাবে।
এদিকে ১৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে ইউকে অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের (এপিপিজি) সভাপতি অ্যানি মেইনের নেতৃত্বে ইউকে কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ (সিএফওবি) ও ইউকে এপিপিজি অন পপুলেশন, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিপ্রডাক্টিভ হেলথের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সাাৎ করেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের বোঝা’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এখন মিয়ানমারের উচিত তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। কারণ, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরাও একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। সে সময়ে ১ কোটি বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।
ইউকে অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের (এপিপিজি) সভাপতি অ্যানি মেইন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ইউকে এপিপিজি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের সফরের ওপর লেখা একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়ায় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে আবারও প্রতিশ্রুতি দেন।