ফিচার

শিক্ষার মান নিয়ে যে কারণে প্রশ্ন ওঠে

ড. শরীফ এনামুল কবির
উন্নয়ন ও অগ্রগতির মহাসড়কে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বেশ পাকাপোক্ত। দারিদ্র্যের খাঁচা থেকে বের হয়ে সমৃদ্ধির পথে সাবলীল গতির সৃষ্টি হয়েছে। শিা, স্বাস্থ্য, খাদ্যসহ জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি অর্জনেও বাংলাদেশের অবস্থান বেশ সন্তোষজনক। স্বাবলম্বী হওয়ার কঠিন যুদ্ধে বড় অর্জন মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। বিশ্বব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। সময়ের পরিক্রমায় বেড়েছে শিার হার। উচ্চশিা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক।
উচ্চশিা-প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা বিতরণ। অথচ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সার্বিক গবেষণা কার্যক্রমের চিত্র হতাশাজনক। মানসম্মত শিা কিংবা গবেষণায় উদাসীন
হলেও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যতিব্যস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অপরিকল্পিতভাবে শিার্থীসংখ্যা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় বিভাগ চালু, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিষয়টি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মানসম্মত শিা ছাড়া কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন তলাবিহীন ঝুড়ির মতো। একুশ শতকের উপযোগী শিা ও উন্নয়ন সহায়ক মানবসম্পদ তৈরিতে শিার মানোন্নয়ন ও গুণমানের দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। শিার মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার ২০১০ সালে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস করেছে। দেশে বর্তমানে ৪৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে শতাধিক। উচ্চশিার প্রসারে বর্তমান সরকার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ৬টি এবং ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৩টি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। উচ্চশিার প্রসারে সরকার প্রথম দেশে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছে। রাজশাহী ও চট্টগ্রামে নতুন দু’টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়েছে। এছাড়া সিলেটে আরো একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
উচ্চশিার প্রসারে বর্তমান সরকার ‘প্রধানমন্ত্রী শিা সহায়তা’ ট্রাস্ট গঠন করেছে। উচ্চশিার গুণমান নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন’ পাস হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসমৃদ্ধ করা এবং তাদের তদারকি, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ‘উচ্চশিা কমিশন’ প্রতিষ্ঠার কাজও এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, উচ্চশিার প্রসার ও মানোন্নয়নে সরকারের এত এত পদেেপর পরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক শিা সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং-২০২০-এর প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ১ হাজারের ভেতর স্থান পায়নি। তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১ হাজারের পর। র‌্যাংকিংয়ে বিদেশি ছাত্রের েেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে শূন্য। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়টির শিার্থীদের মধ্যে কোনো বিদেশি শিার্থী নেই কিংবা থাকলেও সেই সংখ্যা সন্তোষজনক নয়।
তালিকাটি ল্য করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ ভালো করেছে। এই তালিকায় ৩০০ থেকে শুরু করে ১ হাজারের মধ্যে রয়েছে ভারতের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি রাজনীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিতিশীল দেশ পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থানও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। তালিকায় ১ হাজারের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানের ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়।
আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ের েেত্র সাধারণত বেশ ক’টি নির্দেশক গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হলো ছাত্র-শিক অনুপাত, বিদেশি ছাত্রছাত্রী ও শিকসংখ্যা, গবেষণাসংখ্যা, গবেষণা প্রকল্প, গবেষণার সাইটেশান সংখ্যা, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিা ও গবেষণা পরিচালনা, সাবেক ছাত্রছাত্রীদের অবস্থান প্রভৃতি।
আধুনিক উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিার মান নিশ্চিতকরণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মৌলিক গবেষণার মান নিশ্চিত করা জরুরি। পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন আর মৌলিক কোনো গবেষণা হয় না বললেই চলে।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই প্রাইভেট। আমাদের দেশের চিত্র ভিন্ন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নাজুক চিত্র বিদ্যমান। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ব্যাপারটি স্বস্তিদায়ক নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা খুব একটা চোখে পড়ে না। বিশ্বজনীনতার যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও উন্নয়ন হচ্ছে। প্রতি বছর সফটওয়্যার নতুন ভার্সন, নতুন নতুন প্যাকেজ ও টুল বের হচ্ছে। এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সর্বশেষ আর্টিকেল, বই, রিপোর্ট সম্পর্কে অবগত না থাকলে আমাদের গবেষণার মান উন্নত হবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য, অনেক বিভাগের শিকই শিকতা শুরুর দিকেই কেবল বিভাগের নোটপত্র তৈরি করেন, অথবা তার ছাত্রকালীন নোটই কাস নেয়ার জন্য ব্যবহার করেন। এভাবে চলতে থাকে বছরের পর বছর। ফলে তার জ্ঞানের গভীরতা ও পরিধি যেমন বাড়ে না, তেমনি শিার্থীরাও বঞ্চিত হয় প্রাগ্রসর জ্ঞানের সংস্পর্শ থেকে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েরই সমঝোতা স্মারক রয়েছে। সমঝোতা স্মারকের ল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক-শিার্থীদের ফেলোশিপ দিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো এবং উচ্চশিা ও যৌথ গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি। এর মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিম-লে আরো বেশি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়; কিন্তু যুগোপযোগী জ্ঞানার্জন ও যৌথ গবেষণার এই সুযোগ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। অথচ এসব বিষয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্রিয় তৎপরতা চোখে পড়ে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের দেশের বিদ্যমান শিাব্যবস্থায় কেবল পদোন্নতির জন্যই শিকদের একটি অংশকে আর্টিকেল লেখা বা গবেষণা সংক্রান্ত কাজে দেখা যায়। এ শিকগণকে পদোন্নতির পর আর গবেষণা বা আর্টিকেলের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে দেখা যায় না। অথচ কেবল শিক-শিার্থীদের গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত এগিয়ে রাখতে পারে। এই তো কয়েক বছর আগেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিার্থীদের উপস্থিতি ভালোভাবেই চোখে পড়ত। বর্তমানে সে সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। একটি বিভাগ থেকে বছরের পর বছর যদি মানসম্মত জার্নাল বের না হয়, উল্লেখযোগ্য গবেষণা না করা হয়, শিক-শিার্থীদের আর্টিকেল না প্রকাশিত হয়, তবে কেন বাইরের শিার্থীরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে আকৃষ্ট হবে।
এেেত্র আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হলে তার গবেষণাকর্মে অর্থায়ন অপরিহার্য। এটি করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারকে। একজন ভালো গবেষককে গবেষণাকর্মে উৎসাহিত করতে হলে তার জন্য চাই প্রণোদনা প্যাকেজ। ইউজিসি দেশের সেরা গবেষকদের স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এমন উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও নিতে হবে। ভালো পরিবেশ, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা না পেলে মেধাবীরা শিকতা পেশায় আসবেন না। সরকার শিাখাতে যে বরাদ্দ দেয়, তা আরো বাড়াতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ফল অর্জনকারী শিার্থীদের একটি অংশ নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে দেশের বাইরে গেছেন, তাদের বড় এক অংশ নিজ নিজ েেত্র অত্যন্ত কৃতিত্বের স্বার রাখছেন। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণেও এদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। শিার মান নিশ্চিতকরণ ও সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য যোগ্য শিক নিয়োগ, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধিতে জোর দেয়া প্রয়োজন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ভূমিকাটা নিতে হবে ইউজিসিকেই।
পরিশেষে জোর দিয়ে বলতে চাই, আমাদের দেশের পড়ালেখার েেত্র গুণমান একেবারে পানির স্তরের মতো নিচে নেমে যায়নি, উড়েও যায়নি কর্পূরের মতো। শিার মান ও পদ্ধতির ব্যাপারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখনো শিার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। আগের যুগে জিপিএ পদ্ধতি ছিল না। প্রতি শিা বোর্ড থেকে মাত্র ২০ জন করে শিার্থী বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান পেত। আমার মনে আছে, আমার দেখা এমন কয়েক জন শিার্থী, যারা বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান করেছিল, পরবর্তীকালে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিা অর্জন করেছে। আবার প্রথম বিভাগ না পাওয়া অনেক শিার্থীও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফল লাভ করে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক বা বিসিএসে সেরা হয়েছে। বর্তমানেও বিরাজ করছে একই অবস্থা।
তবে আমাদের উচ্চশিাব্যবস্থায় যেমন হতাশার দিক রয়েছে, ঠিক তেমনি আশার দিকও রয়েছে। বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব শিার্থী ভর্তি হচ্ছে, তাদের অনেকেই অত্যন্ত মেধাবী। গবেষণা, শিা, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, লেখালেখি, সামাজিক উদ্যোগ ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এসব শিার্থী অনেকেেত্র শিকদেরও পেছনে ফেলে যাচ্ছে। তাদের কারো কারো গবেষণার মান অনন্য। আমি শিক, তত্ত্বাবধায়ক হয়ে সম্ভাবনাময় সে শিার্থীকে ছোট করে উপস্থাপন করতে পারি না। তার প্রতিভার বিকাশ রোধে তাকে অবহেলা করতে পারি না। দুঃখের কথা, কতিপয় শিকের মধ্যে এমন আচরণও দেখা যায়। তারা নিজ শিার্থীর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়ার মানসিকতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। এটাকে সেই শিকের সংকীর্ণচিত্ততা ছাড়া আর কী বলা যায়!
লেখক: সাবেক সদস্য
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন
সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়