আন্তর্জাতিক

সৌদি আরবের তেলখনিতে ড্রোন হামলায় নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সৌদি আরবের দু’টি তেলখনিতে ড্রোন হামলার উপযুক্ত জবাব দেবে তার দেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করার পর ট্রাম্প এ হুঁশিয়ারি দেন।
এদিকে ন্যাটো সামরিক জোটের প্রধান জেনস স্টলটেনবার্গ সৌদি আরবের দু’টি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ হামলার জের ধরে বিশ্বজুড়ে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা করছেন তিনি।
জেনস স্টলটেনবার্গ বলেন, ইরান পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এর আগে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি ও গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানই ওই হামলার জন্য দায়ী।
তবে ইরান শুরু থেকেই সৌদি আরবের তেল খনিতে ড্রোন হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, ইয়েমেনের জনগণ তাদের প্রতিরামূলক বৈধ অধিকার প্রয়োগ করছে।
ইরানের সঙ্গে জোটবদ্ধ ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা তেল স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হামলার ধরন ও ব্যাপকতা বিবেচনা করে জানিয়েছে, হুতিদের পে এমন হামলা চালানো সম্ভব নয়। ইয়েমেনের সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিশ্বাস, হুতিদের ড্রোন সরবরাহ করেছে ইরান।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে ১৪ সেপ্টেম্বর ভোরে আরামকোর সবচেয়ে বড় তেল পরিশোধনাগার আবকায়িক ও খুরাইসে ড্রোন হামলা হয়। হামলার পরপরই উভয় কেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। ওই হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। তবে এর কারণে সৌদি আরবের দৈনিক তেল উৎপাদন অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমেছে ৫ শতাংশ, আর অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব বৈশ্বিক বাজারে দৈনিক ৭০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল সরবরাহ করে। তেলের স্থাপনায় হামলার কারণে দেশটির উৎপাদন তাৎণিকভাবে ৫৭ লাখ ব্যারেল কমে যায়।
সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, ওই হামলার পর সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল উত্তোলন এক দিনে কমে গেছে ৫৭ লাখ ব্যারেল, যা সৌদি আরবের মোট তেল উত্তোলনের অর্ধেকেরও বেশি। এমন প্রোপটে সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, সর্বশেষ এই হামলার জবাব দিতে ইচ্ছুক ও সম সৌদি আরব। সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) মতে, হামলার পরপরই দুই নেতার মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়। এ সময় মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, এই সন্ত্রাসী আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত তিনি।
শুধু সৌদি আরবেই নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলত্রে সৌদি আরবের আবকাইক এবং খুরাইস তেলেেত্রও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ভয়াবহ তি হয় এসব তেলেেত্রর। এর বড় রকমের প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়েছে বিশ্ব তেলবাজারে।
রাষ্ট্রীয় সৌদি আরামকোর মালিকানাধীন এ তেলেেত্র হামলার দায় স্বীকার করে ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতিরা বিবৃতি দিয়েছে। তাদের বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করে এ জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে ট্রাম্প বলেছেন, ড্রোন হামলার প্রোপটে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সুরতি করতে সহযোগিতায় প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি আরো বলেছেন, এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত লেগেছে।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে চলমান গৃহযুদ্ধে লড়াই করছে হুতিরা। তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাত নেতৃত্বাধীন জোট। সৌদি আরবে ওই হামলার দায় স্বীকার করে হুতিরা জানায়, এতে ১০টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলত্রে আবকাইকে এবং খুরাইসে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের সৃষ্টি হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, সৌদি আরব যখন আরামকোর প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক সে সময়ে ওই হামলা চালানো হয়েছে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে টুইট করেছেন। তিনি লিখেছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ যখন কূটনৈতিক উপায় অবলম্বনের কথা বলছেন তখন সৌদি আরবে প্রায় ১০০ হামলার নেপথ্যে রয়েছে তেহরান। উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানোর মধ্যে ইরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় অপ্রত্যাশিত হামলা চালিয়েছে। অবশ্য এ অভিযোগের পে কোনো প্রমাণ দেখাননি মাইক পম্পেও।
ওদিকে হুতিদের পেণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহের জন্য তেহরানকে দায়ী করেছে রিয়াদ। তারা বলছে, এসব অস্ত্রই সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে হামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইয়েমেনে অবস্থানরত জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিথস বলেছেন, সর্বশেষ এই পরিস্থিতিতে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সব পকে সংযত থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেছেন, এমন ঘটনা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। এরই মধ্যে এ অঞ্চলের এমনকি বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ যখন ইয়েমেন যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করার চেষ্টা করছে, তাকে বিপন্ন করছে এসব ঘটনা।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এরই মধ্যে বহু মাত্রা পেয়েছে। এই ড্রোন হামলার পর সেই উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। গৃহযুদ্ধে এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। চরম এক দুর্ভিরে কবলে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কর্মকর্তারা শিগগিরই সৌদি আরব সফর করবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।