রাজনীতি

আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত দলের নেতাকর্মীরা : পদ-পদবি নিয়ে চিন্তিত দুর্নীতিবাজরা: উজ্জীবিত ক্লিন ইমেজধারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, জাতীয় কাউন্সিলের আগেই জেলা ও মহানগরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন শেষ করতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জেলা সম্মেলন করার জন্য জেলা ও মহানগরের নেতাদের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও অন্যান্য ইউনিটের সম্মেলন করতে হবে।
সারাদেশে আওয়ামী লীগের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ মহানগর-জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন সম্মেলনগুলো যতটা সম্ভব সম্পন্ন করতে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। দলের ৭ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা দফায় দফায় বৈঠকে বসে একটি খসড়া পরিকল্পনাও তৈরি করেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী অক্টোবরের মধ্যে ইউনিয়ন, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা এবং বেঁধে দেয়া ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা ও মহানগরের সম্মেলন করতে চান দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। অক্টোবরের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় নেতারা সাংগঠনিক সফরের মাধ্যমে ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে যতগুলো সম্ভব তৃণমূল সম্মেলন সম্পন্ন করতে মাঠে নামবেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতিতে যখন দলের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন, ঠিক সে সময়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। আওয়ামী লীগ ও দলের সহযোগী সংগঠনের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ নেতাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ অভিযান।
২১তম জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ নেতারা পদ-পদবি পাওয়ার জন্য যখন দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন, ঠিক সে সময়ে এ অভিযান তাদের ভড়কে দেয়। পদ-পদবি পাওয়ার আশা বাদ দিয়ে তারা অনেকে আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ বিদেশ সফর বা চিকিৎসার নামে ইতোমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন। এর বিপরীতে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন ক্লিন ইমেজধারী নেতারা। তারা এই ভেবে উজ্জীবিত যে, এতদিন তারা দুর্নীতিবাজ নেতাদের দাপটে দলে যেভাবে কোণঠাসা ছিলেন, এখন আর সেরকম থাকতে হবে না। আগামী কাউন্সিলে তারা যোগ্যতা অনুযায়ী পদ-পদবি পাবেন। টাকার দাপটও এবার থাকবে না।
এবার জাতীয় কাউন্সিলের আগে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ জন্যই এই কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কোনো বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ ও অনুপ্রবেশকারী নেতা দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে আসতে না পারে।
আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার অভিযানের ঘোষণা এবং যত প্রভাবশালীই হোক সবাইকে আটকের নির্দেশের পর থেকেই দলে অস্থিরতা দেখা দেয়। কয়েকজন সিনিয়র নেতা শেখ হাসিনাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, এই অভিযানের ফলে সরকারের বদনাম হতে পারে। তাছাড়া দলে অভ্যন্তরীণ সংকট দেখা দিতে পারে।
এর মধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে পাওয়া নেতাদের নাম উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী আটকের নির্দেশ দেয়ার পর অনেকেই শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং কেউ কেউ এসব অভিযুক্তের হয়ে তদবির করতে গেলে তোপের মুখে পড়েন।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদানের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কে যাওয়ার সময় অভিযানের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। সেখান থেকে তিনি প্রতিদিনই খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে অভিযান আরও জোরালো হবে। এ অভিযান নিয়ে দলের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর সামনে মনের সুপ্ত চিন্তা প্রকাশ করার সাহস কারো নেই। মন্ত্রী-এমপিদের নাম এসেছে। কখন কাকে ধরবে এবং কোথায় অভিযান চালানো হবে অনেক শীর্ষ নেতাই তা জানেন না।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিলে অনেক পরিবর্তন আসবে, অনেকেই বাদ পড়ে যাবেন। শেখ হাসিনার নির্দেশের পর উপজেলা ও জেলা থেকে অনেকের দুর্নীতি ও অপরাধের তথ্য আসছে। তবে আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজধারী নেতাকর্মীদের মেসেজ হলো, দল থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দিলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে এবং দল শক্তিশালী হবে।
জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, এই অভিযানে ত্যাগী নেতাকর্মীরা খুশি। দুর্নীতিবাজদের দাপটে এবং এমপিদের লোকজনের দৌরাত্ম্যে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অতিষ্ঠ। এতে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেমন খুশি, জনগণও খুশি।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের উদ্দেশ করে বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ যখনই বিপদে পড়েছে এ তৃণমূলই কিন্তু দলকে রক্ষা করেছে। সেই কারণে যত দ্বন্দ্ব, সংঘাত বা গ্রুপিং থাকুক না কেন, সবকিছু মিটিয়ে ফেলে আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
২১তম জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ১২টি উপ-কমিটি গঠন করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে ঢেলে সাজাতে গঠিত কেন্দ্রীয় ৮টি টিম সারাদেশে সাংগঠনিক সফরে যাচ্ছে।
জানা গেছে, জেলা-মহানগর-উপজেলা-ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলনে যাতে কোনো দুর্নীতিবাজ নেতা কমিটিতে জায়গা করতে না পারে সেজন্য যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি চাচ্ছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মতো তৃণমূল আওয়ামী লীগেও ক্লিন ইমেজধারী নেতাকর্মীর সমাবেশ ঘটুক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই মনোভাবের কারণেই পদ-পদবি নিয়ে দুর্নীতিবাজরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন দলের ক্লিন ইমেজধারী নেতাকর্মীরা।