রাজনীতি

ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি: হতাশ দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ এক যুগ ধরে অব্যাহত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে রাজনীতি করছে বিএনপি। নানামুখী চাপ ও প্রতিবন্ধকতায় সংকুচিত হয়ে গেছে দলটির রাজনৈতিক কর্মকা-। দলটির চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায়ে কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফেরারি। এই অবস্থায় রাজনীতিতে ইউটার্ন নিয়ে দলটি গঠন করেছিল ঐক্যফ্রন্ট। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছিল বিএনপি। গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়া দলটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে একটি অনুকূল পরিস্থিতি ও সুদিনে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। মাত্র ৭ জন এমপি নিয়ে তাদের সংসদে যেতে হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট এখন মৃতপ্রায়। দলটির নেতারা সিদ্ধান্তহীনতা ও পারস্পরিক অবিশ্বস্ততায় হাবুডুবু খাচ্ছেন। এ অবস্থায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা দিশেহারা ও হতাশ।
বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন। তারা বলেছেন, সিদ্ধান্তহীনতার পেছনে নেতাদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এবং অগ্রাধিকার বা সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারাসহ বেশকিছু বিষয় রয়েছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা এবং এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাদের অনেকের মতে, খালেদা জিয়ার মুক্তি অথবা নেত্রীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বিএনপির ঠিক হয়নি। এমনকি সংসদে যোগদানের মাধ্যমে নির্বাচন ও সংসদকে বৈধতা দেয়াকে ভুল সিদ্ধান্ত বলেও মনে করে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
সংসদে যোগ না দেয়ার পুরনো সিদ্ধান্ত থেকে বিএনপি যে হঠাৎ সরে এসেছে এবং অল্পসংখ্যক এমপি নিয়ে সংসদে যোগ দিয়েছে, এ নিয়ে দলটির নেতৃত্ব দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এ নিয়ে দলের সিনিয়র নেতারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়ে তাদের মধ্যে যে ঐক্য নেই এবং পরস্পরের প্রতি যে বিশ্বাসের ঘাটতি আছেÑ সে বিষয়টি উন্মোচন করে দিয়েছেন।
সংসদে যোগ দেয়া অথবা না দেয়া, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়া অথবা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা Ñ এরকম বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বলে মনে করছে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যারা আছেন তাদের মধ্যে আছে তীব্র মতবিরোধ। স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যই অপর সদস্যকে বিশ্বাস করেন না। মওদুদ যদি বলেন এটা ঠিক, তাহলে নজরুল ইসলাম বা মঈন খান বলবেন, না এটা ঠিক নয়। গয়েশ্বর যদি বলেন এভাবে করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে মির্জা আব্বাস বলে দেবেন, এভাবে করা মোটেও ঠিক হবে না। নেতায় নেতায় এই অবিশ্বাস এতই প্রকট যে, কোনো ইস্যুতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় জেলে রয়েছেন, আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মামলার কারণে দেশে আসতে পারছেন না। দলটির নেতারা বলছেন, তাদের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের সাথে আলোচনা করে যৌথভাবে দল চালাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের থেকে নিজের ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বেশি। তাদের এই মনোবৃত্তি পুরোপুরি পেয়ে বসেছে ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্যদেরও। বলা হয়, ঢাকা মহানগর কমিটির নেতাদের অবিশ্বস্ত আচরণ এবং সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চলার মনোবৃত্তির কারণেই খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বা যেকোনো আন্দোলন জমাতে পারছে না বিএনপি।
বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটি উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে উত্তরের অবস্থা মোটামুটি হলেও দক্ষিণের সাংগঠনিক অবস্থা একেবারেই বেহাল। সাবেক ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দায়িত্ব পাওয়ার আগে মহানগরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কমিটি গঠনে নগরের শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতাও পাননি তিনি। নিজেও যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। দক্ষিণের প্রভাবশালী দুই নেতা সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের অনুসারীদের সহযোগিতাও পাননি সোহেল। এছাড়া মহানগর দক্ষিণের প্রভাবশালী আরও কয়েকজন নেতার ভিড়ে সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার তেমন গ্রহণযোগ্যতা পাননি। তার কথায় কর্মীরা পর্যন্ত সাড়া দেননি।
মহানগর দক্ষিণের ঘুরে দাঁড়াতে না পারার কারণ প্রসঙ্গে কমিটির একাধিক নেতা বলেন, অনেক কারণ আছে। এক. মহানগরের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালামের অনুসারীরা মহানগর রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ সোহেলকে মেনে নেননি। দুই. কাজী আবুল বাশার কারো কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পাননি। তিন. মহানগর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থের প্রয়োজন হয়, কিন্তু এই শীর্ষ দুই নেতা কোথাও কোনো অর্থের যোগান দেননি। চার. নগরীর নেতাকর্মীদের মামলা নিষ্পত্তির কোনো খবর কেউ রাখেনি। ছয়. অনেকগুলো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যের অভিযোগ আছে।
সংগঠনের বেহাল অবস্থা সম্পর্কে দক্ষিণ কমিটির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ দুই নেতা মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা Ñ এই দুই নেতা ব্যক্তিগত স্বার্থে বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটিকে কখনোই সক্রিয় হতে দেননি। ঢাকা মহানগর কমিটি খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন প্রশ্নে কোনো জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি মূলত মির্জা আব্বাস ও খোকার পরস্পরবিরোধিতার কারণে। এদের প্রথমজন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য গলা ফাটালেও সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গেই তার ব্যাংক ব্যবসাসহ যাবতীয় কাজকারবার। দ্বিতীয়জন সরকারের সঙ্গে নেগোশিয়েট করে এখন আমেরিকা প্রবাসী হয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। তবে মহানগর কমিটিকে চাঙা করার জন্য তার কোনো তৎপরতা না থাকলেও গত সংসদ নির্বাচনে নিজ পুত্রকে ঢাকার একটি আসন থেকে মনোনয়ন পাইয়ে দেয়ার জন্য তিনি অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এখন তিনি সক্রিয় আছেন মনোনয়ন না পাওয়া পুত্রকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে মনোনয়ন পাইয়ে দেয়ার কাজে।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদে স্ত্রী আফরোজাকে মনোনয়ন পাইয়ে দেয়ার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছেন মির্জা আব্বাস। ফলে দক্ষিণের মেয়র পদ নিয়ে মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার মধ্যে একটা কোল্ডওয়ার শুরু হয়ে গেছে। বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটি সক্রিয় না হওয়া এবং বিএনপির ঘুরে দাঁড়াতে না পারার পেছনে এটি অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন নীতিহীন আচরণ দেখে ক্ষুব্ধ ও হতাশ তৃণমূল নেতাকর্মীরা।