প্রতিবেদন

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অগ্রগতি: কানাডার আদালতে নূর চৌধুরীর বিষয়ে জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদন মঞ্জুর

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীর অবস্থান সংক্রান্ত তথ্যের বিধিনিষেধ তুলে নিতে বাংলাদেশের আবেদন মঞ্জুর করেছে কানাডার আদালত। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কানাডার আদালতের দেয়া রায়ে খুনি নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগে এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। ফেডারেল কোর্টের বিচারক ও’রেইলি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সে দেশের প্রশাসনকে এই নির্দেশ দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, কানাডার কোর্ট আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং খুনি নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাস প্রকাশের বাধাগুলো দূর হয়েছে। আমরা কানাডার অভিবাসনমন্ত্রীর কাছে আগেও আবেদন করেছিলাম। শিগগিরই আবারও আবেদন করব, যাতে তারা নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাস প্রকাশ করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে বলেন, আইনি পথে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার।
ঘাতক নূর চৌধুরী কানাডায় কিভাবে আছেন এবং বহিষ্কার ঠেকাতে তার ‘প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের’ (পিআরআরএ) আবেদন কোন পর্যায়ে আছে সে বিষয়ে বাংলাদেশকে কানাডা কোনো তথ্য দিচ্ছে না অভিযোগ করে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ গত বছরের জুন মাসে জুডিশিয়াল রিভিউর (বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা) আবেদনটি করেন। কানাডার আদালতে এ আবেদন নিয়ে গত মার্চে শুনানি হয়। দেশটির উচ্চ আদালত ১৮ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে রায়ে আবেদনটি মঞ্জুর করে বলেছেন, কানাডা কর্তৃপক্ষ ও নূর চৌধুরী বাংলাদেশকে তথ্য না দেয়ার বিষয়ে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। গোপনীয়তা আইনেও এসব যুক্তি খাটে না।
বাংলাদেশ বলেছে, নূর চৌধুরী কিভাবে কানাডায় আছেন তা জানতে পারলে তার ব্যাপারে আইনি উদ্যোগ নেয়া সহজ হবে। কিন্তু কানাডা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের আবেদন যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি। তাই আদালত বাংলাদেশের আবেদন আবার বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ রায় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় আইনি বিজয়। কারণ, গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশকে নূর চৌধুরীর বিষয়ে তথ্য দিচ্ছিল না কানাডা। তার ব্যাপারে বাংলাদেশের কাছে কানাডার তথ্য গোপন করা যে ঠিক হয়নি তা দেশটির আদালতের রায়ের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের পাশাপাশি নূর চৌধুরীকেও পক্ষভুক্ত করেছিল। গত ২৫ মার্চ কানাডার অন্টারিওতে ফেডারেল আদালতে শুনানির সময় বাংলাদেশ পক্ষ কানাডায় নূর চৌধুরীর ‘লিগ্যাল স্ট্যাটাস’ জানতে চেয়েছিল। তবে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ আদালতকে বলে, নূর চৌধুরীর ‘লিগ্যাল স্ট্যাটাস’ না জানায় কানাডায় জনগণের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর প্রায় ১০ বছর ধরে নূর চৌধুরীর একটি আবেদন ঝুলিয়ে রেখে কার্যত তাকে ওই দেশে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। সেই আবেদন নিষ্পত্তির কোনো লক্ষণ নেই। এই প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে বাংলাদেশ মামলাটি দায়ের করে। বাংলাদেশের পক্ষে আইনি প্রতিষ্ঠান টরিস এলএলপি মামলা পরিচালনা করে।
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী কানাডায় ‘ভিজিটর’ স্ট্যাটাস পান। এর কিছুদিন পরই তারা রিফিউজি প্রটেকশনের (শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষা) আবেদন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার দায়ে বাংলাদেশে ফেরারি হিসেবে নূর চৌধুরীর বিচার হয় এবং সেখানে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।
কানাডার আদালত বলেছে, গুরুতর ‘অরাজনৈতিক’ অপরাধের কারণে নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী ২০০২ সালে ‘রিফিউজি প্রটেকশন’ থেকে বাদ পড়েন। গুরুতর অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালে তারা কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য হিসেবেও বিবেচিত হন। বাংলাদেশে ফিরলে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হতে পারে Ñ এমন যুক্তি দেখিয়ে ২০০৯ সালে নূর চৌধুরী ‘প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের’ জন্য আবেদন করেন।
রায়ে বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে কানাডায় নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাস জানতে কানাডার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তার প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ার ব্যাপারেও বাংলাদেশ উদ্বেগ জানাচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের হাইকমিশনার কানাডার নাগরিকত্ব, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক মিনিস্টারের কাছে লেখা চিঠিতে নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাস ও প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের আবেদনের স্ট্যাটাস জানানোর অনুরোধ করেন। কানাডার নাগরিকত্ব, শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক মিনিস্টার বাংলাদেশের হাইকমিশনারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল, গোপনীয়তা আইন অনুযায়ী ওই তথ্য জানানোর সুযোগ নেই। তাছাড়া বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে তথ্য বিনিময়ের চুক্তিও নেই।
বাংলাদেশের হাইকমিশনার সীমিত পরিসরে তথ্য পাওয়ার জন্য হলেও চুক্তি করতে আগ্রহ দেখান। কিন্তু কানাডা কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নূর চৌধুরীর প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের স্ট্যাটাস জানতে জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদন করে।
বাংলাদেশের যুক্তি, নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাস জানতে চেয়ে বাংলাদেশের আবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কানাডা কর্তৃপক্ষের ভুল হয়েছে। বিশেষ করে জনস্বার্থে তথ্য জানানোর গুরুত্ব বিবেচনা করতে কানাডার কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনুরোধ কানাডা কর্তৃপক্ষের প্রত্যাখ্যানের কারণগুলো যথেষ্ট নয় বলেও বাংলাদেশ যুক্তি তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে কানাডা কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, নূর চৌধুরীর ব্যাপারে বাংলাদেশের অনুরোধ ‘প্রিম্যাচিউর’ এবং এটি বিচারযোগ্য নয়। জনস্বার্থের জন্য তাদের সিদ্ধান্ত ও যুক্তিগুলো স্পষ্ট ও পর্যাপ্ত বলেও দাবি ছিল কানাডা কর্তৃপক্ষের।
আদালতের বিচারক ও’ রেইলি বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে জুডিশিয়াল রিভিউর জন্য বাংলাদেশের আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দেয়া উচিত। কারণ, কানাডা কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
রায়ে বিচারক লিখেছেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ৪টি বিষয় বিবেচনা করেছেন। এগুলো হলো জুডিশিয়াল রিভিউ ‘প্রিম্যাচিউরড’ (উপযুক্ত সময়ের আগে) কি না, বাংলাদেশের দাখিল করা হলফনামা যৌক্তিক কি না, বিষয়টি বিচারযোগ্য কি না এবং কানাডা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক কি না।
কানাডা কর্তৃপক্ষ ও নূর চৌধুরীর যুক্তি ছিল, ‘প্রাইভেসি কমিশনারের’ (গোপনীয়তা বিষয়ক কমিশনারের) কাছে অভিযোগ দায়ের না করে আদালতে জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদন করতে পারে না বাংলাদেশ।
তারা আরো বলেছিলেন, প্রাইভেসি কমিশনারের কাছে আবেদন করে ব্যর্থ হলেই বাংলাদেশ জুডিশিয়াল রিভিউর জন্য যেতে পারে।
বিচারক ওই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশের দাখিল করা হলফনামার কিছু অংশ নিয়ে কানাডা কর্তৃপক্ষ ও নূর চৌধুরীর আপত্তিও আমলে নেননি বিচারক।
বাংলাদেশের আবেদন বিচারযোগ্য কি না এ প্রশ্নে কানাডা কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, ব্যক্তিবিশেষের অধিকার খর্ব না হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার যোগাযোগের বিষয়টি বিচারযোগ্য নয়। নূর চৌধুরীও গোপনীয়তা আইনের ধারা এবং বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে তথ্য বিনিময় চুক্তি না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে দাবি করেন যে, বাংলাদেশের আবেদন ওই আদালতে বিচারযোগ্য নয়। বিচারক দু’টি যুক্তিই প্রত্যাখ্যান করেন।
নূর চৌধুরীর ব্যাপারে বাংলাদেশকে তথ্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক কি না Ñ এই প্রশ্নে কানাডা কর্তৃপক্ষ ও নূর চৌধুরী আদালতে দাবি করেছেন, ওই তথ্য জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এ ধরনের তথ্য জানালে তা ব্যতিক্রমী ঘটনা হবে। বাংলাদেশের আবেদন আনুষ্ঠানিক নয় বরং অনানুষ্ঠানিক। তাছাড়া প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট ব্যক্তির গোপনীয় বিষয়।
এসব দাবি ও যুক্তি নাকচ করে দিয়ে বিচারক বলেছেন, কানাডা কর্তৃপক্ষ নূর চৌধুরীর ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সঠিক হয়েছে বলে দাবি করলেও তা কিভাবে ‘সঠিক’ তা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শুরু থেকে তার আবেদনকে ‘আনুষ্ঠানিক’ বলে অভিহিত করেছে। বলেছে, নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাসের বিষয়ে জানতে পারলে তারা আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ পাবে। আর তথ্য জানালে বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে সম্পর্ক আরো জোরালো হবে। তাছাড়া বাংলাদেশ মনে করে, দ-িত অপরাধীদের স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ না দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে তা কানাডা, বাংলাদেশ Ñ দুই দেশের জনগণের স্বার্থেই কাজে লাগবে। এগুলোর কোনো ব্যাপারেই কানাডা কর্তৃপক্ষ জবাব দেয়নি বলে আদালতের রায়ে উল্লেখ আছে।
উল্লেখ্য, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল উচ্চাভিলাসী সদস্যের হাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হন। বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে তদানীন্তন সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ রুদ্ধ করে দেয়। অবশেষে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করে। ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের বিচার প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান প্রাণভিক্ষার আবেদন করলেও সিদ্ধান্ত হয়, জাতির পিতাকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের আসামিকে প্রাণভিক্ষা দেয়া যায় না।
জানা গেছে, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা ৫ খুনির ফাঁসির আদেশ কার্যকর এবং ১ জন বিদেশে মারা গেলেও বাকি ৬ আসামি ৯ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে এএম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নূর চৌধুরী অবস্থান করছে কানাডায়। শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান অথবা হংকংয়ে। তার পাকিস্তানের পাসপোর্ট রয়েছে বলে জানা গেছে। রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ও আব্দুল মাজেদ চৌধুরী ভারতে, কর্নেল (অব.) আব্দুর রশিদ লিবিয়া, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। লে. কর্নেল (অব.) আজিজ পাশা ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা গেছে।