অর্থনীতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে পুঁজিবাজার চাঙা হওয়ার আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আসছে না পুঁজিবাজার। তাই এবার তাদের আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে নতুন করে বিনিয়োগ করার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পোর্টফোলিওতে সরাসরি বিনিয়োগ অথবা সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এই বিনিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত ৯টি শর্ত পরিপালন করে ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হবে।
২২ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন থেকে এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। সেখানে রেপোর মাধ্যমে অর্থ সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের হার (এডিআর) রেশিও বাড়ানো হয়।
এর আগে গত ১৬ মে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাবায়ন থেকে অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ বাদ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে আর্থিক খাতে তারল্যসংকট থাকায় পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেনি। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে তারল্যসংকট কাটাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ গণনায় পরিবর্তনের পর এবার ধার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হলো। এতে পুঁজিবাজারে বেঁধে দেয়া বিনিয়োগ সীমার নিচে থাকা ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো তাদের রেগুলেটরি মূলধনের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। সাবসিডিয়ারিসহ ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারে। তবে অধিকাংশ ব্যাংকেরই পুঁজিবাজারে নির্ধারিত সীমার কম বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও ২০১০ সালে পুঁজিবাজার ধসের সময়ে সেখানে ব্যাংকগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগ ছিল। সে সময় আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো মোট দায়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারত। যদিও ওই সময় অধিকাংশ ব্যাংকই সেই সীমা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে। পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধন করে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ কমিয়ে আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকের অগ্রিম ও আমানতের অনুপাত নির্ধারিত মাত্রা অপেক্ষা কম এবং এসএলআর (নগদ জমার হার) সংরক্ষণের পর অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। এসব ব্যাংকের জন্য আইনি সীমার মধ্যে থেকে পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তিক ইনস্ট্রুমেন্টে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্যাংকসমূহের এরূপ বিনিয়োগে অংশগ্রহণ (নিজস্ব পোর্টফোলিওতে সরাসরি বিনিয়োগ অথবা সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ঋণ প্রদান করত উক্ত কোম্পানির নিজস্ব পোর্টফোলিওর আকার বৃদ্ধির মাধ্যমে পরোক্ষ বিনিয়োগ) পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি গতিশীল পুঁজিবাজার নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পোর্টফোলিওতে সরাসরি বিনিয়োগ অথবা সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তারল্য বৃদ্ধির উদ্দেশে নিম্নক্ত শর্তাধীনে সাময়িক তারল্য সুবিধা প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
শর্তগুলো হচ্ছে, তারল্য সুবিধা গ্রহণেচ্ছু ব্যাংকের সলো আই কনসোলিডেটেড উভয় ভিত্তিতে পুঁজিবাজার বিনিয়োগ ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০১৮ পর্যন্ত সংশোধিত) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত সার্কুলারে বর্ণিত সর্বোচ্চসীমার (ভিত্তিতে বিবেচ্য মূলধন উপাদানের ২৫% এবং কনসোলিডেটেড ভিত্তিতে বিবেচ্য মূলধন উপাদানের ৫০%) কম হতে হবে। তারল্য সুবিধা গ্রহণের পরও বর্ণিত বিনিয়োগ সীমা পরিপালন করতে হবে।
একইসঙ্গে এই সুবিধার অধীনে প্রাপ্ত তারল্য শুধু ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিওতে সরাসরি বিনিয়োগ অথবা সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নিজস্ব পোর্টফোলিওতে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট সাবসিডিয়ারি কোম্পানিকে ঋণ হিসেবে প্রদান করা যাবে। এই সুবিধা নিয়ে প্রাপ্ত তারল্য ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিওতে বা সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নিজস্ব পোর্টফোলিওতে বিনিয়োগের জন্য নতুনভাবে পৃথক বিও একাউন্ট খুলতে হবে।
এছাড়া ব্যাংকসমূহের অতিরিক্ত তারল্য হতে ট্রেজারি বন্ড বা বিল রেপোর মাধ্যমে এই তারল্য সুবিধা গ্রহণ করতে হবে। ট্রেজারি বন্ড বা বিলের রেপো মূল্যের ৫ শতাংশ মার্জিন হিসেবে রেখে তারল্য সুবিধা প্রদেয় হবে। নগদে রেপোর অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য আদায়যোগ্য অর্থ অপেক্ষা কম হলে তা ইতঃপূর্বে গৃহীত মার্জিন হতে সমন্বয় করা হবে এবং সমন্বয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে ব্যাংক তা প্রদান করতে বাধ্য থাকবে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে রেপোর মেয়াদ ২৮ দিন হলেও তহবিল ব্যবহারের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তা সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত ঘূর্ণায়মান রাখা যাবে। এরূপ রেপোর জন্য কোনো অকশনের প্রয়োজন হবে না এবং সুদের হার হবে ৬ শতাংশ।
এছাড়া এরূপ তারল্য সুবিধা গ্রহণের জন্য যাচিত অর্থের পরিমাণ উল্লেখপূর্বক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং এতদুদ্দেশ্যে সদ্য খোলা বিও হিসাবের প্রমাণপত্রসহ মহাব্যবস্থাপক, ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে হবে। প্রদানযোগ্য তারল্য সুবিধার পরিমাণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে এবং পুনর্বিবেচনার জন্য কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের আমলে সর্বশেষ পুঁজিবাজারে সংকট শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। নানা আলোচনা-সমালোচনার পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় সরকার ২০১২ সালের ৫ মার্চ বিশেষ প্রণোদনা স্কিমের আওতায় ৯০০ কোটি টাকার ফান্ড গঠন করে, যা তিন কিস্তিতে ৩০০ কোটি টাকা করে আইসিবির মাধ্যমে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবরের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয়া ওই অর্থ থেকে আইসিবি ৫৮৬ কোটি টাকা সরাসরি বাজারে বিনিয়োগ করে। এরপর ২০১৮ সাল থেকেই দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় তারল্য সংকট দেখা দেয়, যা পুঁজিবাজারেও বড় প্রভাব ফেলে। এই বাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাওয়া ও বিদেশিদের পুঁজি প্রত্যাহারের কারণে ২০১৮ সাল থেকে ২২ শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক। স্টক এক্সচেঞ্জটিতে দৈনিক লেনদেন নেমে আসে ৪০০ কোটি টাকার নিচে। বাজার চাঙা করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে কোনো উদ্যোগই কাজে লাগেনি।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পুঁজিবাজার অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করেন, যেখানে গভর্নর ফজলে কবির পুঁজিবাজারকে সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেন। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে অর্থ ধারের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।