রাজনীতি

বিএনপির শূন্যস্থান পূরণ করে শক্তিশালী বিরোধী দল হতে চায় জাপা

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা তথা শূন্যতা পূরণ করে রাজনৈতিক মাঠে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আর্বিভূত হতে চায় জাপা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি; যারা ক্ষমতার মূল অংশীদার হিসেবে রাজনৈতিক মাঠে বরাবরই সক্রিয় ছিল। কিন্তু ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজনৈতিক ওই সমীকরণ তথা বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়ে বিএনপি। কারাবন্দি হন বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়ার পুত্র ও দলের অন্যতম কান্ডারি তারেক রহমান। পরবর্তীতে কারাবন্দি অবস্থায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন তারেক রহমান। এরপর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিএনপি সংসদের সরকারি দল অথবা বিরোধী দল ঊভয় স্থান থেকেই ছিটকে পড়ে। এমনকি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মাঠেও তাদের অবস্থান সংকুচিত হয়ে ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্রমেই দল ছাড়তে থাকে অথবা রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অনেকে আবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে ব্যবসাবাণিজ্য করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এতে বিএনপি ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। সর্বশেষ গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে দলের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। দল হয়ে পড়ে নেতৃত্বশূন্য এবং অনিশ্চিত গন্তব্যে হাঁটতে থাকে বিএনপি। রাজনৈতিক এ শূন্যস্থানকে পুঁজি করেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার টার্গেট নির্ধারণ করেছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। যদিও সেই লক্ষ্য পূরণে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বেশিদূর এগুতে পারেনি জাপা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, দলের প্রতিষ্ঠাতা এইচএম এরশাদ ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত থাকার কারণে তাঁর জীবদ্দশায় রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির শূন্যস্থানটুকুকে কাজে লাগাতে না পারলেও জাপার নতুন নেতৃত্ব বিএনপিকে টপকিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই এরশাদের ছোট ভাই ও দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং এরশাদপতœী ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ সামনে এগিয়ে যেতে দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিএনপিসহ সকল দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। টানা তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটি অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৯টি আসনে জয়লাভ করে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২২ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে শপথ নেয় জাতীয় পার্টি। এছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭টি আসনে জয়লাভ করে।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের ৪৩ জন নারী সংসদ সদস্য, জাতীয় পার্টির ৪ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির ১ জন, স্বতন্ত্র ১ জন ও বিএনপির ১ জনসহ মোট ৫০ জন শপথ গ্রহণ করে।
৩০০ আসনের মধ্যে ২২টি আসন পেয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারেনি, কিন্তু দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল-বিএনপির চেয়ে অনেক ভালো করেছে। অর্থাৎ জাপা এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে Ñ এটিই এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এদিকে দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে এখন আর জাতীয় পার্টি নেই। কারণ সংসদের বিরোধী দলের নেতা থাকা অবস্থায় গত ১৪ জুলাই এরশাদ প্রয়াত হয়েছেন। জীবিত থাকা অবস্থায় এরশাদ তাঁর অবর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ছোট ভাই জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করে যান। এরশাদের সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁর মৃত্যুর পরপরই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জি এম কাদের।
এরশাদ বেঁচে থাকা অবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই জাতীয় পার্টি স্বল্পসংখ্যক সদস্য নিয়েই শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে প্রস্তুতি নেয়। দশম জাতীয় সংসদেও জাতীয় পার্টি সরকারের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। কিন্তু ওই সংসদে দলটি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করায় প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রাজনৈতিক মাঠে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক কম। আর এটা বুঝতে পেরেই একাদশ জাতীয় সংসদে এরশাদ মন্ত্রিত্ব নেয়া থেকে বিরত থাকেন। বড় ভাই এরশাদের ইচ্ছানুযায়ী ছোট ভাই জিএম কাদেরও একাদশ সংসদে মন্ত্রিত্ব নেয়া থেকে বিরত আছেন এবং চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী বিরোধী দলে পরিণত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্লিন ইমেজের জি এম কাদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে দলীয় একাধিক কর্মসূচিতে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, দেশ ও দেশের স্বার্থে শক্তভাবেই বিরোধিতা করবে জাতীয় পার্টি। কোনো মন্ত্রিত্ব না নিয়ে দেশ ও মানুষের স্বার্থে কথা বলেই জাতীয় পার্টি সাধারণ মানুষের মাঝে জনপ্রিয়তা অর্জন করবে, যাতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে আরও ভালো ফলাফল করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় পদ-পদবি ও সাংগঠনিক নানা ইস্যুতে জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মতানুসারীদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলেও জি এম কাদের অনেকটা ছাড় দিয়ে সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রীর পদটি ভাবীকে ছেড়ে দেন এবং রংপুর-৩ আসনে রওশনের ইচ্ছানুযায়ী সাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। অথচ পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পদাধিকার বলে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হওয়ার কথা জিএম কাদেরেরই।
জিএম কাদের এটা করেন মূলত জাতীয় পার্টিকে আরেক দফা ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই। তিনি চাচ্ছেন ভাবী রওশনকে নিয়ে জাতীয় পার্টিকে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের আসনে বসাতে। সে লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে চলেছেন।