আন্তর্জাতিক

যে কারণে নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টনকে সরিয়ে দিলেন ট্রাম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে রবার্ট ও ব্রায়েনকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি এই পদ থেকে জন বোল্টনকে অপসারণ করেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রধান দুই দলের হয়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে ও ব্রায়েনের। বর্তমান নিযুক্তির আগে তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরে জিম্মি বিষয়ক আলোচনার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। বৈদেশিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি পূর্বসূরীর অনুরূপ। সুতরাং এই নিয়োগের ফলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কোনো রকম পরিবর্তন না হওয়ারই সম্ভাবনা। তাহলে জন বোল্টনকে কেন সরিয়ে দিলেন ট্রাম্প?
জন বোল্টন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান। তার মধ্যে উগ্রবাদী ঝোঁক ছিল। তাকে সরিয়ে দেয়া থেকে বোঝা যায় যে আগামী বছর নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এখন একটা সমঝোতার মেজাজ নিয়ে থাকতে চান। এটা আমেরিকার শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিককালে অনেক ফ্রন্টেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বোল্টনের সংঘাত দেখা দিয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে আলোচনায় তাকে ছাড় দিতে বোল্টনের অনড় বিরোধিতা এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে ও জারি রাখতে তার ঘোর আচ্ছন্নতায় ট্রাম্প অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ যতটা টেকসই বলে বোল্টন প্রচার করেছিলেন তার চেয়ে বেশি টেকসই প্রমাণিত হয়। এটাও ট্রাম্পের বিরক্তির কারণ ঘটায়। ট্রাম্প অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে পেশীশক্তি প্রদর্শনকে দরকষাকষি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখেন সেখানে তার আশা যে শত্রুরা দ্রুত আলোচনার টেবিলে গিয়ে বসবে। অন্যদিকে বোল্টন শত্রুর আত্মসমর্পণের চাইতে কম কিছুতে তুষ্ট হতে রাজি নন। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে বৈঠকে বসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে ইরানের ওপর অবরোধ শিথিল করার জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন বোল্টন। তবে দু’জনের বিরোধের শেষ বিষয়টি ছিল খুব সম্ভবত তালেবান ইস্যু। ক্যাম্প ডেভিডে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে তালেবানদের প্রতি ট্রাম্পের আমন্ত্রণ জ্ঞাপনের (যা পরে বাতিল করা হয়) প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন বোল্টন।
আফগানিস্তানে ১৮ বছর স্থায়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকার যে আলাপ-আলোচনা চলছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করে দিয়েছেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর কাবুলে তালেবানদের এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে এক মার্কিন সৈন্য ও অন্য ১১ জন নিহত হওয়ার পর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান আলোচনা বাতিল করা হয়। এর বলি হন বোল্টন।
আমেরিকা ও তালেবান উভয় পক্ষই জানিয়েছে তারা এখন সামরিক তৎপরতা দ্বিগুণ করে তুলবে। কাজেই প্রচ- লড়াই হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন যে, সম্প্রতি শুধু ১০ দিনেই ১ হাজার তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তবে তার এই সাফল্য দাবি সত্ত্বেও আফগানিস্তানের সামরিক বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তালেবানদের শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগই তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে মার্কিন সাহায্য সমর্থনে বিশেষ করে বিমান বাহিনীর ছত্রছায়ার জোরে সব শহরই আফগান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে।
কিছুদিন আগে ট্রাম্প ৩টি টুইট করেন। প্রথমটিতে তিনি তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকার আলোচনার অগ্রগতির কথা জানিয়ে বলেন, তালেবান নেতাদের ক্যাম্প ডেভিডে তার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা আছে। এর পরের টুইটে তিনি বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর কাবুলে তালেবানদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্যদের সঙ্গে এক মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার কথা তিনি জানতে পেরেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৈঠক বাতিল করে শান্তি আলোচনা পরিত্যাগ করেন এবং বলেন, ওরা যদি অতি গুরুত্বপূর্ণ এই শান্তি আলোচনার সময় যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে রাজি হতে না পারে তা হলে অর্থবহ চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা চালানোর মতো ক্ষমতা সম্ভবত তাদের নেই।
দু’দিন পর আলোচনা বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনরুল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আলোচনার অপমৃত্যু ঘটেছে।’ আর এর মাধ্যমে বোল্টনের নীতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন ট্রাম্প। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বোল্টনকে তার পদ থেকে সরে যেতে হলো।
তার কারণ বোল্টন সিরিয়া থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়া, তালেবানদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং কিমের সঙ্গে খায়-খাতির জমানোর ব্যাপারে ট্রাম্পকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। তথাপি তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের অভিপ্রায় ফুটে ওঠে। ট্রাম্প নিজেকে যত কুশলী খেলোয়াড়ই ভাবুন না কেন, ৩ বছর প্রেসিডেন্ট পদে থাকার পরও তিনি বড় ধরনের কোনো কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদন বা এক্ষেত্রে বিশাল কোনো অর্জন করতে পারেননি। মাদুরো ক্ষমতায় দৃঢ়ভাবে টিকে আছেন। রাশিয়ার সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ধসে পড়ছে। উত্তর কোরিয়া পরমাণু বোমার জ্বালানি তৈরি করে চলেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আবারও প্রসারিত হচ্ছে। আফগানিস্তানে সিভিলিয়ানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রায় রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে।
এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শত্রুদের সঙ্গে তার দরকষাকষির মহাকর্মযজ্ঞ নতুন উদ্যোগে শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে তার তালিকার প্রথমে স্থান পেতে পারে ইরান। তিনি রুহানির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতে পারলে সেটা হবে ৬ মাসব্যাপী ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিরসনের একটা সহজ পথ। ট্রাম্প যদিও তালেবানদের সঙ্গে আলোচনাকে বাতিল ঘোষণা করেছেন তথাপি সেই পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে যায়নি। ঠিক কি কারণে আলোচনা ভেস্তে গেল তা জানতে পারা কঠিন, যদিও বাহ্যিকভাবে বিভিন্ন কারণ দেখানো হয়েছে।
যা-ই হোক, ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সামনে আশু যেসব চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়াচ্ছে তার একটি হচ্ছে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার পর ইরানের সঙ্গে পুরোদস্তুর সংকটের মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি সঠিকভাবে মোকাবিলা করা। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। কিন্তু ইরান এই হামলার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে।