ফিচার

সম্পত্তি বণ্টনের কতিপয় প্রাথমিক সাধারণ কথা

অ্যাডভোকেট মোমিন শেখ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ফারায়েজ কী তা আগের সংখ্যায় মোটামুটি আলোচনা করা হয়েছে। চলতি সংখ্যায় ফারায়েজের উদ্দেশ্য ও উৎস নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

ফারায়েজের উদ্দেশ্য
প্রাক-ইসলামি যুগেও মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন করার বিধান প্রচলিত ছিল, যদিও তা মোটেও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে করা হতো না। যে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা অস্ত্র চালাতে পারতো বা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারতো শুধু তারাই সম্পত্তির মালিক হতো। নারীরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতো।
ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ অন্যায় প্রথার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ইসলাম ধর্মের অনুসারী কোনো মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারদের মধ্যে ন্যায়নীতির ভিত্তিতে ভাগ বাটোয়ারা বা বণ্টন করাই হলো মূল উদ্দেশ্য। মৃতের পরিত্যক্ত বা ফেলে যাওয়া সম্পত্তি কার অধিকারে থাকবে, কিভাবে থাকবে এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ কিভাবে হবে ফারায়েজ বিষয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না করলে তা অসমাপ্ত রয়ে যেত। ফলে সমাজে দেখা দিত চরম বিশৃঙ্খলা, যা প্রাক ইসলামি যুগে বিরাজমান ছিল। এ ধরনের বিশৃঙ্খলা থেকে সমাজ এবং সমাজের মানুষকে একটা সুন্দর ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসার জন্যই মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারদের মধ্যে ন্যায়নীতির ভিত্তিতে বিলিবণ্টন করার ব্যবস্থাই হলো মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে এর বণ্টনব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা অর্জন করা এবং উত্তরাধিকারদের মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে যে হক আছে, দাবি বা অধিকার আছে সে সম্পর্কে জানা বা জ্ঞাত হওয়া।

ফারায়েজের উৎস
ফারায়েজ আইন বা নীতির প্রধান এবং অন্যতম উৎস হলো পবিত্র আল-কোরআন। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি উৎস রয়েছে, যা সংক্ষেপে নিচে আলোচনা করা হলো। যেমন-
ক্স আল কোরআন
ক্স সুন্নাহ বা হাদিস
ক্স ইজমা
ক্স কিয়াস
ক্স প্রাক ইসলামিক প্রথা
ক্স ইসতিদলাল
ক্স রাষ্ট্রীয় আইন
ক্স আদালতের আইন।
ক্স পবিত্র কোরআন শরীফে: সুরা আন নিসার প্রধান ৩টি আয়াত যেমন ১১, ১২ এবং ১৭৬নং আয়াত হলো অন্যতম দলিল। এছাড়াও ৭নং আয়াতে পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনদের রেখে যাওয়া ধনসম্পদ পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই নির্দিষ্ট অংশ রেখে গেছেন শুধু এতটুকুই বলা হয়েছে। সুরা বাকারার ১৮০-১৮২নং আয়াতে মৃত ব্যক্তির পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ওসিয়ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ফারায়েজ সম্পর্কে নির্দেশ হলো সকল মুসলিম এ নির্দেশ মানতে বাধ্য।
ক্স সুন্নাহ বা হাদিস: ইসলামি আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হলো সুন্নাহ বা হাদিস। আমরা সকলেই সুন্নাহ সম্পর্কে অবগত আছি যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাচার বা জীবনধারার সকল কাজকর্ম কথাবার্তা এবং তাঁর সম্মতি-অসম্মতি, ভালো লাগা, ভালো না লাগা সমস্ত বিষয়ই হলো সুন্নাহ বা হাদিস। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সুন্নাহ বা হাদিস লিপিবদ্ধ না করায় তাঁর ইন্তেকালের পর যে সকল সমস্যা দেখা দিতে লাগল এবং তা মীমাংসার জন্য আল কোরআনের নির্দেশনা মোতাবেক সমাধানও হতে লাগল। কিন্তু যে সকল সমস্যার সমাধান আল কোরআনের আলোকে সমাধান দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না সেখানে নবীজীর সুন্নাহ অনুসরণ করে সমাধান দেয়া শুরু হলো। এভাবে সুন্নাহ ফারায়েজের ভিত্তি বা উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে লাগল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফারায়েজের ওপর এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে তিনি বলতেন, ফারায়েজ থেকে তোমরা নিজেরা শিক্ষা গ্রহণ করো এবং অন্যদেরকেও শিক্ষা দাও। কারণ ফারায়েজের ওপর অর্জিত জ্ঞান সমস্ত জ্ঞানের অর্ধেক। এজন্যই তিনি সর্বদা বলতেন, ফারায়েজ শিক্ষা সকল মুসলমানের জন্য ফরজ।
ক্স ইজমা: ইজমা আরবি শব্দ যার অর্থ হলো ঐক্য বা ঐকমত্য বা একমত। অর্থাৎ কোনো বিতর্কিত বিষয়ে একমত হয়ে সমাধান করা। যখন গণ্যমান্য ইসলামি চিন্তাবিদ বা মুজতাহিদগণ কোনো সমস্যার সমাধানে একমত হন তখনই তাকে ইজমা বলে।
ক্স কিয়াস: আরবি শব্দ। অর্থ সাদৃশ্যমূলক সিদ্ধান্ত। কোরআন, সুন্নাহ ও ইজমা – এ ৩টি উৎস যখন প্রযোজ্য হয় না, তখন ওই ৩টির সাথে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে যে সমাধান দেয়া হয় তাকে কিয়াস বলে। সমাজজীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিয়াসের প্রয়োজন দেখা যায়।
কিয়াসকে ইসলামি আইনের প্রাণশক্তি হিসেবে অনেকে অভিহিত করেছেন। আবার অনেকেই মনে করেন, ফারায়েজে কিয়াসের কোনো ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায় না। যেমন দাউদ যাহেরী কিয়াসকে স্বীকার করেনি।
ক্স প্রাক ইসলামিক প্রথা: আভিধানিক অর্থ হলো রীতি। সমাজে দীর্ঘকাল কোনো আচার-অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট নিয়মে পালন করা হতো বা প্রচলিত ছিল, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্র আইন দ্বারা নির্ধারণ করে আইনে পরিণত করে তাকেই প্রথা বলে। প্রাক ইসলামি যুগেও প্রথার প্রচলন ছিল যেমন বহু বিবাহ, তালাক, মোহরানা, উইল, উত্তরাধিকার ইত্যাদি প্রথা। হযরত মোহাম্মাদ (সা.) প্রাক ইসলামি যুগে যে সকল সামাজিক নিয়মনীতি মানুষের জন্য কল্যাণমুখী বলে মনে করেছেন সেই নীতিগুলোর ব্যাপারে কোনো প্রকার বিরোধ করেননি; অর্থাৎ নীরব থেকেছেন। সেই নিয়মগুলো বা প্রথাগুলো আইনের উৎস বলে গণ্য হয়েছে। যে নিয়মগুলো সমাজের জন্য কল্যাণকর, আল্লাহর চোখে তা ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইসলামি বিধান দ্বারা উল্লিখিত প্রথাগুলো সম্পূর্ণ বাতিল না করে সংশোধন ও সংস্কার করে, ন্যায় ও যুক্তির মাধ্যমে প্রথাগুলো রেখে দিয়েছেন। যেমন বহু বিবাহকে নিরুৎসাহিত করা হলেও সর্বোচ্চ ৪ জনের অধিক মহিলাকে বিয়ে করা যাবে না। প্রাক ইসলামি যুগে কোনো ব্যক্তি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি যেকোনো ব্যক্তিকে উইল করে দিতে পারত কিন্তু ইসলামি আইনে তা সংশোধন করে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ বা ১/৩ অংশ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
ক্স ইসতিদলাল: ইসতিদলাল আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ হলো অনুমান করা বা ধারণা করা, যা যুক্তির ওপর নির্ধারিত হয়। হানাফি মাযহাবের চিন্তাবিদগণ এ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। হানাফি মাযহাবের মতে প্রাক ইসলামিক যুগে অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে যে সকল আইন বা বিধিবিধান প্রচলিত ছিল পবিত্র কোরআন শরীফে তাঁর সমর্থন যতটুকু মিলতো ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করা হতো। নিখোঁজ হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির উত্তরাধিকার সম্পর্কেও মতামত দিয়েছেন।
ক্স রাষ্ট্রীয় আইন: মানবিক ও ন্যায়পরায়ণতার দিক থেকে অনেক সময় রাষ্ট্র অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমেও উত্তরাধিকার আইন করে থাকেন। যেমন ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সরকার মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১ জারি করেন।
ক্স আদালতের আইন: আইনের প্রধান ৩টি উৎসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং ডিক্রিও আইনের একটি উৎস। ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার সম্পর্কিত সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত আইনে পরিণত হয়। Ñ(চলবে)