প্রতিবেদন

আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রাখছে নারীসমাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্রাম-শহর সমানভাবে উন্নত হলেই একটা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। কেবল শহরের উন্নয়ন দিয়ে কখনোই একটা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানকার গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী। আর গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি ভূমিকা পালন করে থাকেন।
বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের ‘গ্রাম-শহর সমান উন্নতি’ নীতির কারণে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, অবদান রাখছেন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে। গ্রামে গিয়ে তারা চেষ্টা করছেন কিছু না কিছু অর্থ উপার্জন করে স্বাবলম্বী হতে। এর ফলে চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে বলা হয়েছে, এখন দেশের মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। ১৯৯৫-৯৬ সালে শ্রমে নারীর অবস্থান ছিল শহরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, গ্রামে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০৩ সাল পর্যন্ত এ হার শহরেই বেশি ছিল।
সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালে গ্রামে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশে। অন্যদিকে শহরে কমে হয়েছে ৩১ শতাংশ। গ্রামের শ্রমশক্তিতে যুক্ত নারীদের ৬০ শতাংশই আছেন কৃষি খাতে।
বিবিএসের ২০১৫-১৬ সালের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বিভাগীয় পর্যায়ে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি। রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। খুলনায় ৪২ দশমিক ২ শতাংশ। রংপুরে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৩৪ শতাংশ, ঢাকায় ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ, বরিশালে ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নারীদের উন্নয়নে অনেক কিছুই করেছে। কিন্তু অধিকাংশ নারীই সেসব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। যদি তারা একটু সচেতন হন, তবে অনেক সুযোগ-সুবিধাই রয়েছে যাতে করে নারীরা ঘরে বসেই উপার্জন করে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
আগে নারীরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য গ্রাম থেকে শহরে চলে আসত। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল গার্মেন্টস শিল্প। মূলত নারীরা শহরে আসত এসব পোশাক কারখানায় চাকরি করে নিজের খরচ চালানোর জন্য। আর এদের অধিকাংশের বাড়ি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে। কারণ এসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার অন্যান্য এলাকার চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব এলাকার চিত্র অনেকটা পাল্টে গেছে। কারণ এই সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। পাশাপাশি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকেও চাঙা করতে চায় সরকার। এজন্য নেয়া হয়েছে বেশকিছু উদ্যোগ। যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে আমার বাড়ি, আমার খামার প্রকল্পটি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সরকারের আমার বাড়ি, আমার খামার প্রকল্পে আগ্রহী হয়ে এখন অধিকাংশ বাড়িতেই গড়ে উঠেছে খামার। আর এসব খামারে হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া ও গরু পালনের পাশাপাশি অনেকে শাকসবজির চাষ অথবা পুকুরে মাছ চাষ করছে। আর এসব করছে বাড়ির মেয়েরাই বেশি। এর ফলে নারীরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন আবার গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙা হচ্ছে।
আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত সমবায় সমিতিভিত্তিক একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিকল্পনা। এই প্রকল্পটির আওতায় গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে তৈরি করার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
২০২০ সালের মধ্যে দেশে দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। সমন্বিত গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কার্যাবলির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াসে আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।
আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পে প্রাথমিক জরিপের ভিত্তিতে গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য সমবায়ভিত্তিক গ্রাম উন্নয়ন সংগঠন সৃষ্টি করে সদস্যদের দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ঋণ, অনুদান ও কারিগরি সহায়তা দেয়া হয় এবং সেই সাথে দরিদ্রদের মধ্যে দুগ্ধবতী গাভী, মৎস্য, হাঁস-মুরগি ও ফসলের বীজ বিতরণ করা হয়।
প্রকল্পটি ৬৪ জেলার ৪৯০ উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৯৫০টি গ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রাথমিক অবস্থায় এই প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রথম সংশোধনীতে তা পুনরায় ১ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়; যেটি বর্তমানে চলমান দ্বিতীয় সংশোধনীতে ৩ হাজার ১৬৩ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রকল্পের বর্তমান মূলধন ৮ হাজার কোটি টাকা এবং গঠিত সমিতির সংখ্যা ৮০ হাজার। প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটির কার্যক্রম দেশের মোট ১ হাজার ৯৩২টি ইউনিয়নে চলমান আছে; যেটি পুনরায় সংশোধন করে দেশের সকল ইউনিয়নে (৪ হাজার ৫০৩টি) বিস্তৃত করা হয়েছে।