অর্থনীতি

ক্রমেই সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠছে মোবাইল ব্যাংকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
একটা সময় ছিল যখন সাধারণ মানুষ ঘরের গোপন জায়গায় টাকা জমিয়ে রাখত। কেউ আবার প্রতিবেশী কোনো নির্ভরযোগ্য মানুষের কাছে রাখত। এখন সময় পাল্টেছে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। মানুষ নিজের মোবাইল ফোনেই লুকিয়ে রাখছে তার জমানো টাকা। এভাবে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিপ্লব ঘটে গেছে। ছোটখাটো লেনদেনের জন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর বেশ নির্ভরশীল। পকেটে টাকা পুরিয়ে গেলে যেকোনো সময়ে যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে দূরবর্তী স্থানে অবস্থানরত নিকটজনের কাছ থেকে মুহূর্তের মধ্যেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা বা মোবাইল রিচার্জ করা সম্ভব হচ্ছে।
জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ২৬ লাখ, যা বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ। বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), যা মোবাইল ব্যাংকিং নামে পরিচিতি পেয়েছে, তার মাধ্যমে দিনে গড়ে ৪৯ লাখ ৫ হাজারটি লেনদেন হয়। গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হওয়া অর্থের পরিমাণ ৮৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বর্তমানে এমএফএস সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭টি। এজেন্ট সংখ্যা ৭ লাখ ৪৬ হাজার এবং গ্রাহক ৫ কোটি ২৬ লাখ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক এখন বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা হলো এই অ্যাকাউন্ট করতে আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হয় না। মোবাইল ফোন থাকলেই যে কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে এবং টাকা লেনদেন করতে পারেন দেশের যেকোনো স্থান থেকে। এজন্য তাকে ব্যাংকের শাখায় যেতে হয় না।
মোবাইল ফোনের কল রিচার্জ বা ফ্লেক্সিলোড যারা করেন, মূলত তারাই এখন মোবাইল ফোন ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট। তাদের কাছে ন্যাশনাল আইডি কার্ড জমা দিলে তারাই অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। মোবাইল ফোন নম্বরটিই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নম্বর। থাকে একটি পাসওয়ার্ড। এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন। নগদ টাকা তুলতে মাঝখানে থাকেন একজন এজেন্ট। তারা মূলত ছোট ব্যবসায়ী, যারা নিজের দোকানেরই লাইসেন্স নিয়ে থাকেন ব্যাংকের কাছ থেকে। অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিং মানুষের সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে, কমিয়েছে ভোগান্তি। মাত্র ১ মিনিটেই লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। নগদ টাকা বহনের ঝুঁকিও কমে যাচ্ছে। এ কারণেই এ পদ্ধতি এত দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয় ২০১০ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স নিলেও চালু করে ১৭টি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ছিল ৩ কোটি ১২ লাখ। আর প্রতিদিন গড়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হতো প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। মাত্র দেড় বছরে গ্রাহক এবং টাকা লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৮০ ভাগ বেড়েছে।
বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি বোঝার জন্য আরো একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে যে, এর প্রবৃদ্ধি হঠাৎ করে হয়নি। শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এটা দ্রুত জনপ্রিয় হয়। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক দাঁড়ায় ৩ কোটিতে, যা তখন ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ। গত ৪ বছরে গ্রাহক বাড়ার হার হলো শতকরা ৫২৪ ভাগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং সহজ এবং এর নেটওয়ার্ক অনেক বিস্তৃত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের এজেন্ট আছে আর মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও দেশজুড়ে বিস্তৃত। প্রচলিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিছুটা ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় এই মোবাইল ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষ সহজে দ্রুত টাকা পাঠাতে চায় এবং দ্রুত তুলতে চায়।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সাধারণ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সব সুবিধা নেই। এটা প্রধানত টাকা লেনদেনের কাজ করে। মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো না কোনো ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর যারা সরাসরি ব্যাংকিংয়ের আওতায় আগে আসেননি, তারাও এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সিস্টেমে চলে এসেছেন। এতে অর্থনীতি বিশেষ করে ইনক্লুসিভ অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে। বিরাট জনগোষ্ঠীকে বিকল্প এক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা যাচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সেবাগুলোর মধ্যে অর্থ স্থানান্তর (পিটুপি), নগদ জমা (ক্যাশ ইন) এবং নগদ উত্তোলন (ক্যাশ আউট) সবচেয়ে জনপ্রিয়। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ব্যবহার করে বেতন-ভাতা প্রদান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। বাড়ছে কেনাকাটাও।