প্রতিবেদন

পিঁয়াজের দাম ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
পিঁয়াজের দাম ক্রেতাদের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। টিসিবির মাধ্যমে বিক্রয় বাড়ানোসহ পিঁয়াজ আমদানির অর্থায়নে সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মিসর, তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে পিঁয়াজ আমদানির পাশাপাশি অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধ করতে দেশের বিভিন্ন জায়গার পাইকারি বাজারগুলোতে অভিযান শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে রড-সিমেন্টের গুদাম থেকে ৫ টন পিঁয়াজ জব্দ করা হয়েছে।
এছাড়া খুচরা বাজারে পিঁয়াজের দাম বেঁধে দেয়ার চিন্তা করছে সরকার। পিঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে।
পিঁয়াজের দামে লাগাম টানতে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এতে সেখানে পিঁয়াজের দাম পাইকারিতে ৭৫-৮০ টাকায় নেমেছে, যা একদিন আগেও ছিলো ১১০-১২০ টাকা। অভিযান চালানো হয়েছে কয়েকটি জেলা শহরেও। এর কিছুটা সুফলও দেখা গেছে বাজারগুলোতে।
সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানির অর্থায়নে সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেয়ার পাশাপাশি পিঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে মার্জিনের হার ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নির্দেশনা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ পিঁয়াজ আমদানি অর্থায়নে সুদহার সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে। এর আগে পিঁয়াজ আমদানির অর্থায়নে সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ১১ শতাংশ।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক বাজারে পিঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাজারেও পিঁয়াজের মূল্যে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে পিঁয়াজের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে স্থানীয় বাজারে পিঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পিঁয়াজের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধকল্পে পিঁয়াজ আমদানি অর্থায়নের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো।
জানা গেছে, ভারত পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। ৭০ টাকার পিঁয়াজ এক লাফে ১২০ টাকায় উঠে যায়। পিঁয়াজের ভালো মজুদ থাকা সত্ত্বেও অতি লাভের আশায় পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আগের কেনা পিঁয়াজেই কেজিপ্রতি ৫০ টাকা দাম বাড়িয়ে দেয়। ভারত পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে Ñ এটা শুনে ক্রেতারাও আরো দাম বেড়ে যাবে ভেবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পিঁয়াজ কিনতে শুরু করে। বিক্রেতারা এই সুযোগটি ভালোভাবে কাজে লাগায়। ক্রেতার অহেতুক চাহিদা এবং বিক্রেতাদের মুনাফাখোরি প্রবণতায় এক রাতেই পিঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা বেড়ে যায়। বাজার বিশ্লেষকরা এই প্রবণতার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অতি আগ্রাসী মনোভাবকেই দায়ী করেছেন।
এদিকে পিঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, মিয়ানমার থেকে পিঁয়াজ দ্রুত আনা যায়। ল্যান্ডেড কস্ট ৪২-৪৩ টাকা, ঢাকায় আনার খরচ লাভ নিয়ে দাম ৫৫ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। তারপরও বাজারে দাম বেশি। আমরা চেষ্টা করছি দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, বেশকিছু বাজারে জরিমানা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আশা করছি, দাম কমবে।
সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, পিঁয়াজের মূল্য কোনোক্রমেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে দেয়া হবে না। সরকার যে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দেবে সেই মূল্যেই ব্যবসায়ীদের পিঁয়াজ বিক্রি করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পিঁয়াজের মূল্য স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিশেষ অভিযান চলবে। শক্ত মনিটরিংয়ের মধ্য দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু মিসর, তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে পিঁয়াজ আসছে সেহেতু স্বল্প সময়ের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য ক্রেতার দৈনিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কেনার পরামর্শ দিয়ে তারা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কিনে বাসায় মজুদ করলে যেকোনো পণ্যেরই কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয়। দাম বেড়ে যাচ্ছে Ñ এই ভেবে বেশি কিনলে সরবরাহের চাপ সৃষ্টি হয়, অহেতুক দাম বেড়ে যায়।
বাজার বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পিঁয়াজের দাম সর্বোচ্চ ৬০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। ভারতের পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সুযোগ নিয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির কারসাজিতে যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। না হয় এই প্রবণতা অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে। ভোক্তারাও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। সব ভোক্তা যদি ৭ দিন পিঁয়াজ না কেনেন তাহলে মজুদদারদের পিঁয়াজ কিন্তু পচে যাবে। এ সুযোগটা ব্যবসায়ীরা নিচ্ছে কারণ ভোক্তারা পিঁয়াজের জন্য অহেতুক হাহাকার করছেন।