ফিচার

রেনিটিডিন নিষিদ্ধ করলো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক
রেনিটিডিন ওষুধের উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গত ২৯ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানায়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রেনিটিডিনের বেশকিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। বিদেশে একাধিক গবেষণায় এর প্রমাণ মিলেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর রেনিটিডিনের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বড় কোম্পানিই এই ওষুধ তৈরি করে। কোনো পরামর্শপত্র ছাড়াই মানুষ নিজে থেকেই এই ওষুধ ব্যবহার করে থাকে। রেনিটিডিনজাতীয় ওষুধ গ্রহণ করেনি, দেশে এমন মানুষ হয়ত খুঁজেও পাওয়া যাবে না।
বিশ্বজুড়ে বহুল প্রচলিত ওষুধ রেনিটিডিনের মধ্যে সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান পাওয়ার ঘটনায় কয়েকটি দেশ সতর্কতা জারির পর বাংলাদেশেও এই ওষুধটির উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
স্যান্ডোজের তৈরি রেনিটিডিন ক্যাপসুলের মধ্যে এন-নিট্রোসডিমিথাইলামাইন (এনডিএমএ) নামে পরিবেশ দূষণকারী এ উপাদানের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর কোম্পানিটি তাদের এই ওষুধ বাজার থেকে তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয়।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন সংস্থা (এফডিএ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রাথমিক পরীক্ষায় বেশকিছু ব্র্যান্ডের রেনিটিডিনের মধ্যে এনডিএমএর উপস্থিতি পাওয়ার পর সতর্কতা জারি করা হয়। তখন এই ওষুধের কোনো ব্র্যান্ডের মধ্যে এনডিএমএর ক্ষতিকর মাত্রা নিশ্চিত না হলেও সতর্কতা হিসেবে কানাডা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি কোম্পানি রেনিটিডিন সরবরাহ বন্ধ করার এবং বাজার থেকে তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন স্বাস্থ্য সেবাদাতা ও রোগীদের উদ্দেশে এক সতর্কবার্তায় বলেছে, উচ্চমাত্রার এনডিএমএর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর স্যান্ডোজ তাদের তৈরি দুই মাত্রার রেনিটিডিন ক্যাপসুলের (১৫০ ও ৩০০ মিলিগ্রাম) ১৪টি লট বাজার থেকে স্বেচ্ছায় তুলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সতর্ক করার পর, স্যান্ডোজ তাদের সব রেনিডিটিন ওষুধ বাজারে সরবরাহ বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছে এফডিএ।
সংস্থাটি জানিয়েছে, স্যান্ডোজের ক্যাপসুল ছাড়া অন্য রেনিটিডিনজাতীয় ওষুধ সেবনে এখনই তারা বারণ করছেন না। তবে কেউ চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শে অন্য কোনো কোম্পানির রেনিটিডিন সেবন করতে পারেন।
স্যান্ডোজের ক্যাপসুলে উচ্চমাত্রার এনডিএমএর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর সতর্কতা হিসেবে কানাডার ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপোটেক্স, প্রো ডক লিমিটেড, স্যানিস হেলথ ও সিভেম ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের তৈরি রেনিটিডিনজাতীয় ওষুধ বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে।
এর আগে কোনো কোম্পানির রেনিটিডিন বাজার থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা না দেয়া হলেও ওষুধে উচ্চমাত্রার এনডিএমএর উপস্থিতি নেই বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে বাজারে রেনিটিডিন সরবরাহ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানায় হেলথ কানাডা।
এফডিএর অনুরোধে ভারতের ওষুধ কোম্পানি স্ট্রাইডস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের রেনিটিডিন বিক্রি বন্ধ রেখে তাদের ট্যাবলেটে এনডিএমএর উপস্থিতি আছে কি না তা পরীক্ষা করছে। এর আগে ভারতের ওষুধ কোম্পানি ড. রেড্ডিস ফার্মাসিউটিক্যালস ও গ্ল্যাক্সো স্মিথক্লাইন পূর্ব সতর্কতা হিসেবে তাদের রেনিটিডিন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রেনিটিডিনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রেনিটিডিনে তাৎক্ষণিক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে যারা এই ওষুধ নিচ্ছেন, তারা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ওষুধ পরিবর্তন করতে পারেন।
ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (ইএমএ) জানাচ্ছে, এনডিএমএ নামের উপাদানটি পানি ও খাদ্যে পাওয়া যায়। বিশেষত মাংস, দুগ্ধজাত ও শাকসবজিতে এই উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। তবে সীমিত মাত্রায় এনডিএমএ শরীরে ঢুকলে সেটা কোনো ক্ষতি করে না।
দেশে গ্যাস্ট্রিকের খুব জনপ্রিয় কিছু ওষুধের ব্র্যান্ড রয়েছে যেগুলোর মূল উপাদান বা জেনেরিক নাম হলো রেনিটিডিন। যেকোনো ওষুধের দোকানেই এটি কিনতে পাওয়া যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, রেনিটিডিন নিজে ক্যান্সার তৈরি করে না। খাওয়ার সাথে সাথেই কিছু ঘটবে না। এর নিজের ক্যান্সার জাতীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। রেনিটিডিনের কাঁচামাল উৎপাদনের সময়, কিছু কাঁচামালের একটি মিশ্রণে ক্যান্সারের ঝুঁকিযুক্ত কোনো উপাদান তৈরি হয়েছে। বিশ্বে বহু ল্যাবে এর কাঁচামাল তৈরি হয়। এটি সব কাঁচামাল উৎপাদকের ক্ষেত্রে ঘটেনি।
চিকিৎসকরা বলছেন, ধরুন রান্নায় যদি লবণ বেশি হয়ে যায় বা একটা ভুল মশলা দিয়েছেন তখন সেটি আপনি খেতে পারবেন না। বিষয়টা সেরকম। এখন যেটি করা হচ্ছে সেটি সতর্কতা।
বাংলাদেশ মূলত ভারতের দুটি ল্যাব থেকে রেনিটিডিন ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। ওই দুটি ল্যাবের কিছু নমুনায় কারসিনোজেনিক উপাদান বা ক্যান্সারের ঝুঁকি আছে এমন উপাদান পাওয়া গেছে। সেই কাঁচামাল ব্যবহার করে যারা বাংলাদেশে ওষুধটি বানাচ্ছে সেই ওষুধের ক্ষেত্রে এই সাবধানতার অংশ হিসেবেই রেনিটিডিনের উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।