প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

সামরিক সক্ষমতায় ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক
সামরিক শক্তির বিচারে গত বছরের চেয়ে এবার ১১ ধাপ উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বের ১৩৭টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম, যা গত বছর ছিল ৫৬তম। এবার প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় রাশিয়া, তৃতীয় চীন ও চতুর্থ স্থানে ভারত।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার (জিএফপি) নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের করা ‘২০১৯: মিলিটারি স্ট্রেন্থ র‌্যাংকিং’ শীর্ষক এই তালিকা ১ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১২ বছর ধরে সংস্থাটি এ ধরনের তালিকা প্রকাশ করছে।
জিএফপি জানায়, একটি দেশের সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা দিয়ে কেবল এই শক্তিমত্তার বিষয়টি নির্ণয় করা হয়নি, দেশটির সামরিক সরঞ্জাম কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান, জনশক্তি, উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদসহ আরো কিছু বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এই তালিকা তৈরিতে। সামরিক শক্তি পরিমাপের ক্ষেত্রে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর শক্তি-সামর্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জরিপে কোনো দেশের পরমাণু শক্তির বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি। তবে স্বীকৃত ও সন্দেহভাজন পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
৫৫টি মাপকাঠির ভিত্তিতে এই সামরিক শক্তিমত্তার সূচকে স্কোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ০.৭১৫৬ শক্তিসূচক নিয়ে ৪৫তম অবস্থানে রয়েছে। এ তালিকায় মিয়ানমার ০.৬১৬২ শক্তিসূচক নিয়ে এবার দুই ধাপ পিছিয়ে ৩৭তম অবস্থানে রয়েছে; গত বছর ছিল ৩৫তম।
তালিকায় থাকা প্রথম ২০টি দেশ হলো: ১. যুক্তরাষ্ট্র, ২. রাশিয়া, ৩. চীন, ৪. ভারত, ৫. ফ্রান্স, ৬. জাপান, ৭. দক্ষিণ কোরিয়া, ৮. যুক্তরাজ্য, ৯. তুরস্ক, ১০. জার্মানি, ১১. ইতালি, ১২. মিশর, ১৩. ব্রাজিল, ১৪. ইরান, ১৫. পাকিস্তান, ১৬. ইন্দোনেশিয়া, ১৭. ইসরাইল, ১৮. উত্তর কোরিয়া, ১৯. অস্ট্রেলিয়া ও ২০. স্পেন।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ২ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার। নৌবাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার এবং বিমান বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। তাছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নামের আধা সামরিক বাহিনী দু’টি সাধারণ সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, তবে যুদ্ধকালীন সময়ে এই বাহিনীদ্বয় যথাক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর অধীনে পরিচালিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হলো প্রধান প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সামরিক আইন তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হয়। সামরিক নীতিমালা এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর একটি ৬ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। এই উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর অন্তর্গত তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক বাহিনী বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবগণ। এছাড়া এনএসআই, ডিজিএফআই ও বিজিবি’র সাধারণ পরিচালকগণ এই উপদেষ্টা পদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী গঠিত হয়। এ কারণে এই দিনটিকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই দিনে বঙ্গভবন, ঢাকা, সামরিক বাহিনী সদর দপ্তর, ঢাকা সেনানিবাস এবং দেশের প্রতিটি সামরিক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ ৩ বছর সময় পর্যন্ত ভাটিয়ারির বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, পতেঙ্গার বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি এবং যশোরের বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন। কর্মজীবনে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য রয়েছে বাংলাদেশ ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি
এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্সেস। কর্মজীবনে অনেকেই মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
সামরিক বাহিনীর মেডিকেল কোরের সদস্যদের সাধারণ মেডিকেল কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করার পর নিয়োগ করা হয়ে থাকে। নিয়োগপ্রাপ্তির পর মেডিকেল কোরের সদস্যগণ মিলিটারি একাডেমি থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকেন। পরবর্তীতে পেশাদার পর্যায়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তারা মেডিকেল কোর সেন্টার এবং আর্মড ফোর্স মেডিকেল কলেজে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তবে বর্তমানে আর্মড ফোর্স মেডিকেল কলেজ থেকে ক্যাডেটগণ সরাসরি কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর পদবিন্যাস কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের জন্য আলাদা আলাদা সামরিক পদবিন্যাস রয়েছে। আধা-সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পদবিন্যাস নৌবাহিনীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২০০১ সালে সামরিক বাহিনী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদটি সন্নিবেশিত করে। সকল অফিসার কমিশনপ্রাপ্ত হন সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসেবে। ২০০৭ সালের আগে শুধু দু’জন ব্যক্তি জেনারেল পদমর্যাদা পেয়েছেন: জেনারেল ওসমানী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং মুস্তাফিজুর রহমান, ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান।
২৬ মে ২০০৭ সালে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের পদ এক ধাপ উন্নীত (আপগ্রেড) করেছে। তিন বাহিনীর পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রথম প্রধানরা হলেন জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, ভাইস অ্যাডমিরাল সরোয়ার জাহান নিজাম এবং এয়ার মার্শাল এস এম জিয়াউর রহমান।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী এবং বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত।

শেষ কথা
২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাঁর শক্তিশালী ও সাহসী নেতৃত্বে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রার পাশাপাশি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে যায় সমান তালে। সশস্ত্র বাহিনীকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা প্রণয়ন করেন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’।
উল্লেখ্য, ফোর্সেস গোল ২০৩০ হলো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর আকার বৃদ্ধি, আধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম সংগ্রহ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রদান। পরিকল্পনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর জোর দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের নজিরবিহীন ধারাবাহিকতা থাকার কারণে ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় তিন বাহিনীর পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠছে একটি দক্ষ, চৌকস ও আধুনিক শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে। আর এ কারণেই গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার (জিএফপি) নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের করা ‘২০১৯: মিলিটারি স্ট্রেন্থ র‌্যাংকিং’ শীর্ষক জরিপে দেখা যায়, সামরিক শক্তিতে দ্রুত উন্নতি করছে বাংলাদেশ।