প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

স্বদেশ খবর-এ প্রকাশিত সোলার গ্রিড প্রকল্প সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিপরীতে শাহরিয়ার চৌধুরীর ভিন্নমত

বিশেষ প্রতিবেদক
১৮তম বর্ষ, ১৪ সংখ্যা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কনসালট্যান্ট শাহরিয়ার চৌধুরীর ভুল ডিজাইন ও অতি লোভের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে অধিকাংশ সোলার গ্রিড প্রকল্প: উদ্যোক্তারা দিশেহারা’ শীর্ষক প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর রিনিউয়েবল এনার্জি সার্ভিসেস লি. (সিআরইএসএল); পরিচালক, সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ইইই, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; অর্গানাইজিং কো-চেয়ার, ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন দি ডেভেলপমেন্টস ইন রিনিউয়েবল এনার্জি টেকনোলজি (আইসিডিআরইটি)-এর শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী।
প্রতিবাদপত্রে শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ সরকার পাওয়ার সেক্টরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে তৎপর। শিক্ষাবিদ ও শিল্পের অসংখ্য মানুষ এবং অন্য পেশাজীবীদের মতো সরকারও এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে এবং আমি এই কর্মক্ষেত্রের একজন। স্বদেশ খবর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যসমূহের কয়েকটি চিহ্নিত করে আমি আমার ব্যাখ্যা দিচ্ছি:
স্বদেশ খবর পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সোলার পিভি প্রকল্পের ডিজাইনগুলো ত্রুটিপূর্ণ। এটা সত্য নয়। বেশিরভাগ মিনি গ্রিডই আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ^ব্যাংক, কেএফডব্লিউ, ডিএফআইডি প্রভৃতি সংস্থার অর্থায়নকৃত। ইডকল (ওউঈঙখ) এই অর্থায়নের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। ইডকলের অনুমোদনের পর এই নকশাগুলো দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শকদের দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা হয় এবং তাদের অনুমোদনের পরই ইডকল অর্থ অবমুক্ত করে।
অধিকন্তু, ইডকল মাঝে মাঝেই সোলার মিনিগ্রিডসহ এই প্রকল্পগুলোর টেকনিক্যাল অডিটের ব্যবস্থা করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই টেকনিক্যাল ডিজাইন পুনর্মূল্যায়ন এবং অডিটগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বনামখ্যাত পরামর্শকদের দিয়ে করানো হয় এবং এখন পর্যন্ত তারা সোলার মিনিগ্রিডের টেকনিক্যাল ডিজাইনে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি অথবা অসঙ্গতি চিহ্নিত করেনি।
বৃহদাকার সোলার পিভি প্রকল্পগুলো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে এবং প্রকল্পের ডিজাইন পর্যায়ে বহু অভিজ্ঞ লোক যুক্ত ছিলেন। মাত্র একজন ব্যক্তির পক্ষে বৃহদাকার সোলার পিভি প্রকল্পের সবগুলো ডিজাইন করা সম্ভব নয়।
স্বদেশ খবর পত্রিকা উল্লেখ করেছে যে, আমি ইডকলের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং আমি ইডকলের প্রকল্পগুলো অনুমোদন দিই। তবে সত্য হলো, আমি ইডকলের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য নই এবং কখনো ছিলাম না। ইডকলের টেকনিক্যাল কমিটি গঠিত হয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক (সরকারি এবং প্রাইভেট) এবং এলজিইডি, পাওয়ার সেল, আরইবি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান নিয়ে। ইডকলের প্রকল্পগুলো ইডকলের বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ইডকল বোর্ড গঠিত হয় ৯ জন সদস্য নিয়ে, যাদের মধ্যে ৫ জন সদস্য হন বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব।
স্বদেশ খবর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিপরীতে ভিন্নমত পোষণ করে কনসালট্যান্ট শাহরিয়ার আহমেদ বলেন, আমি ইডকলের একমাত্র পরামর্শক নই। ইডকলের একটি ৬-৭ সদস্যের পরামর্শক প্যানেল আছে এবং আমি তাদের একজন। তাছাড়া ইডকলের অর্থায়নকৃত মিনিগ্রিড এবং অন্যান্য প্রকল্পের পরামর্শক ফি নির্ধারিত হয় ইডকল দ্বারা, যেখানে বার্গেনিং অথবা অধিক পরামর্শক ফি চার্জ করার কোনো সুযোগ নেই।
স্বদেশ খবর পত্রিকা উল্লেখ করেছে যে, আমি এবং আমার স্ত্রী এক্সেলন এবং এসকিউসহ বিভিন্ন কোম্পানির সাথে জড়িত। আমি এবং আমার স্ত্রী এসব কোম্পানির কোনোটিরই শেয়ারহোল্ডার নই। যেহেতু সোলার পিভি সিস্টেম ডিজাইন ও ইনস্টলেশনের ওপর আমার প্রফেশনাল ট্রেনিং আছে এবং আমি এগুলোর ওপর প্রফেশনাল ট্রেনিং দিই, তাই প্রশিক্ষিত প্রকৌশলীরা (যারা অধিকাংশই আমার ছাত্র) পরবর্তীতে এই ফিল্ডে কাজ করার জন্য কোম্পানি গঠন করলে তারা প্রকল্পগুলোর ডিজাইন করতে আমার সহায়তা চায় এবং আমি তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে থাকি।
তিনি বলেন, আমি এবং আমার স্ত্রী আদৌ কোনো রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সাথে জড়িত নই, যা স্বদেশ খবর পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজিবি প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি সেই সময়ে ভূমির অপ্রাপ্যতার কারণে। আমি বিজিবি প্রকল্পের জমি ব্যবস্থাপনার কাজে একেবারেই জড়িত ছিলাম না।
জার্মানির আইবিভিভগটই একমাত্র বিদেশি প্রতিষ্ঠান, যারা ইতোমধ্যে দু’টি প্রকল্পের জন্য এলওআই পেয়েছে এবং তৃতীয় প্রকল্পটি এলওআই প্রাপ্তির অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আইবিভগট-এর এসকল প্রকল্পে দেশীয় কনসালট্যান্ট হিসেবে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে এসকল প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান করার দায়িত্ব প্রকল্পসমূহের দেশীয় অংশীদারদের। যেখানে আমার কোনো দায়ভার নেই। বাংলাদেশে জমি ক্রয় ও তার দখলদারিত্ব পাওয়া একটি সময়সাপেক্ষ ও জটিল কাজ। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ফার্মসমূহ উল্লিখিত কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততার খবরটি সঠিক নয়। তাছাড়া এসকল প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছেÑ যার অনুসরণ ব্যতীত প্রকল্পের অনুমোদন কেবল মন্ত্রণালয় বা পিডিবি’র সাথে সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, স্রেডা (ঝজঊউঅ) এবং ইডকলের অসংখ্য প্রকল্প আছে এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞরা কাজ করছেন। একজন একক ব্যক্তি কিছুতেই ইডকল এবং স্রেডার সকল প্রকল্পে কাজ করতে পারেন না। কিন্তু স্বদেশ খবর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আমি স্রেডা এবং ইডকলের প্রায় সবগুলো প্রকল্পেই জড়িত, যা সত্য নয়।
সাধারণত, সোলার মিনি গ্রিডের ডিজাইন পরামর্শকের দায়িত্ব হলো প্রকল্পের ডিজাইন করা এবং প্রকল্প ডেভেলপার ও পরামর্শকের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আলোকে প্রকল্পের নির্মাণ এবং কর্মসূচনা (কমিশনিং) তত্ত্বাবধান করা। প্রকল্পের সফল সূচনার পর এর পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ মিনি গ্রিড অপারেটরের টেকনিক্যাল লোকজন দিয়েই সম্পাদন করা হয়।
এ পর্যন্ত দেশে ২২টি সোলার মিনিগ্রিড চালু হয়েছে এবং এগুলোর কয়েকটির পরিচালন অথবা রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা থাকতে পারে। যদি অপারেটরের টেকনিক্যাল লোকজন দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হয়, তখন তারা ইডকলকে জানাতে পারে এবং প্রায়ই ইডকল বিভিন্ন ডেভেলপার, সরবরাহকারী এবং পরামর্শকদের এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক্সপার্টদের নিয়ে মিটিং করে। আমরা ইস্যুগুলো যৌথভাবে আলোচনা করি এবং সেগুলো যৌথভাবে সমাধান করার চেষ্টা করি।
স্বদেশ খবর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের এক জায়গায় লেখা হয়েছে আমি বিপিডিবি-এর চেয়ারম্যানের আনুকূল্যে কাজ করছি। কিন্তু এই বক্তব্যটি সঠিক নয়। উল্লেখ্য, অতীতে আমি বিপিডিবিতে কাজ করেছি এবং বর্তমানে আমি স্বতন্ত্র পরামর্শক হিসেবে কাজ করি। বাংলাদেশে অসংখ্য চলমান এবং অনুমোদিত সোলার পিভি প্রকল্প আছে এবং আমি মাত্র অল্প কয়েকটির সাথে জড়িত।
আমি স্বদেশ খবরকে ধন্যবাদ জানাব, যদি বিষয়গুলো অনুসন্ধান করা হয় এবং সত্য ঘটনাবলি ব্যাখ্যা করে স্বদেশ খবর পত্রিকায় একটি পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

স্বদেশ খবর পত্রিকার
পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদন
১৮তম বর্ষ, ১৪ সংখ্যা, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কনসালট্যান্ট শাহরিয়ার চৌধুরীর ভুল ডিজাইন ও অতি লোভের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ছে অধিকাংশ সোলার গ্রিড প্রকল্প: উদ্যোক্তারা দিশেহারা’ শীর্ষক প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশের পর শাহরিয়ার চৌধুরীর লিখিত প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে স্বদেশ খবর-এর তরফ থেকে যোগাযোগ করা হয়। এবার তিনি স্বদেশ খবরকে একনিষ্ঠভাবে সময় দেন এবং বিস্তারিত জানান।
এ সময় শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী স্বদেশ খবরকে জানান, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি প্রায় এক যুগ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে (ডেসা এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) কাজ করেছেন। জার্মান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে শাহরিয়ার চৌধুরী এরপর জার্মানিতে পাড়ি জমান। তার পড়াশোনার বিষয় ছিল নবায়নযোগ্য শক্তি। ওল্ডেনবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের সময় তিনি তার শ্রেণিতে সর্বোচ্চ নম্বরের অধিকারী হয়েছিলেন। জার্মানিতে গবেষণারত সময়ে, তিনি সিআইজিএস (কপার ইন্ডিয়াম গ্যালিয়াম সেলেনাইড) জাতীয় থিন ফিল্ম সৌরকোষ তৈরির একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। সে সময়ে ড্রাই ফেব্রিকেশন পদ্ধতিতে প্রস্তুতকৃত এ ধরনের সৌরকোষের কার্যকারিতার রেকর্ড গড়েছিল শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরীর আবিষ্কৃত সৌরবিদ্যুৎ কোষ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত থাকার সময়ে তিনি অনুধাবন করেন যে প্রাকৃতিক গ্যাস ছাড়া বাংলাদেশের নিজস্ব অন্য কোনো প্রকার জীবাশ্ম জ্বালানির সম্ভার নেই এবং সেই প্রাকৃতিক গ্যাসের ভা-ারও ক্রমশ কমতির পথে। জার্মানিতে তার অভিজ্ঞতা তাকে উপলব্ধি করায় যে নবায়নযোগ্য শক্তিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হতে যাচ্ছে। এছাড়া তিনি এও জানতেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরিত হয়, যেগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। তিনি বুঝতে পারেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা নিরাপদ মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখে যেতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাওয়া ছাড়া উপায়ন্তর নেই।
পটভূমি বিবেচনা করলে সৌরশক্তি বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়। জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বসবাস করে সেসব দেশে কাজের এবং থাকার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও, জার্মানিতে পড়াশোনা শেষে শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী দেশে ফিরে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজের অর্জিত জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত ধারণা দেশে ছড়িয়ে দেবেন।
দেশে ফিরে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) সাথে যুক্ত হন। ২০০৬ সালে তিনি ইউআইইউর স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি কোর্সের সিলেবাস তৈরি এবং কোর্সটি চালু করেন, বাংলাদেশে যা ছিল প্রথম। সৌরশক্তির ফলিত শাখায় গবেষণাকর্ম পরিচালনা করার লক্ষ্যে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চ স্থাপন করেন। সেই থেকে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। দেশে এবং বিদেশে এ যাবৎ তার অধীনে ১৫০টির মতো প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। ইডকল এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থিক সহায়তায় তিনি তার গবেষণাগার স্থাপন করেছেন।
শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী জামালপুরের সরিষাবড়িতে বাংলাদেশের প্রথম গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পিভি প্রকল্পের নকশা করেছেন। এই প্রকল্প ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের আরও দুটি বড় আকারের গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পিভি প্রকল্পের নকশাও তিনি করেছেন। কাপ্তাইয়ে বিপিডিবির ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং পঞ্চগড়ে ১০ দশমিক ৩ মেগাওয়াটের এই প্রকল্প দুটি সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। তিনি দেশের অন্যান্য আরও বড় গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পিভি প্রকল্পের কাজেও নিয়োজিত আছেন।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত, অফ-গ্রিড গ্রামীণ এলাকাগুলোর বিদ্যুতায়নের জন্য এ যাবৎ তিনি ২৩টি সোলার-ডিজেল শংকর জাতীয় মিনি-গ্রিডের নকশা করেছেন, যেগুলো বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এই মিনি গ্রিডগুলোর কল্যাণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, যারা হয়ত অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা কখনও চিন্তাও করেননি। প্রতিটি মিনি গ্রিড এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে প্রায় ১ থেকে দেড় হাজার গ্রামীণ পরিবার এবং ২-৩টি গ্রামীণ বাজার ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ পায়। এই মিনি গ্রিডগুলোর কারণে এই গ্রামগুলোর জীবনে নিয়ত পরিবর্তন আসছে। শিক্ষার্থীরা অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারছে, মানুষজন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারছে, টিভি দেখছে, নিজেদের সংযুক্ত করতে পারছে ইন্টারনেটের সাথে। মাড়াই কল, ফটোকপি মেশিন, স-মিল, ছোটখাটো ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, বরফকল ইত্যাদির মতো ছোট পরিসরের ব্যবসা খুলতে শুরু করেছে। একটা সময় ছিল যখন এসব এলাকায় কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এজাতীয় ব্যবসা এবং ছোট কারখানাগুলোর কারণে অধিক পরিমাণে আর্থিক সংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, যা এলাকার মানুষের জীবনে নিয়ে আসছে পরিবর্তন। এসব এলাকা থেকে আর আগের হারে মানুষজন নিকটবর্তী শহরগুলোতে জীবিকার সন্ধানে আসছেন না।
শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী ২০১৬ ও ২০১৮ সালে দু’বার বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় বিদ্যুৎ সপ্তাহে তার সৃজনশীল গবেষণামূলক কাজ এবং উদ্ভাবনের জন্য ‘অদম্য বাংলাদেশ’ এবং ‘অনির্বাণ আগামী’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
এছাড়াও তার উদ্ভাবনী কাজ এবং প্রকল্পগুলোর সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। মরক্কোর মারাকাশ-এ আয়োজিত ক্লাইমেট কনফারেন্সে (কোপ ২২) জাতিসংঘের মোমেন্টাম ফর চেইঞ্জ অ্যাওয়ার্ড ২০১৬; জার্মানির মিউনিখ থেকে ইন্টারসোলার (ইওরোপ) অ্যাওয়ার্ড-২০১৬; শিক্ষকতা, নেতৃত্ব এবং নবায়নযোগ্য শক্তি সংক্রান্ত শিক্ষা খাতে অবদান রাখার জন্য ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ৭ম ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেস থেকে এডুকেশন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০১৮; সৌরশক্তি শিল্পের প্রসারে শিক্ষা খাতে অবদান এবং সৃজনশীল গবেষণার জন্য চীনের সাংহাই থেকে এশিয়ান ফটোভল্টেয়িক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এপিভিআইএ) অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ লাভ করেন।
গবেষণা কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী এ যাবৎ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা থেকে আর্থিক অনুদান পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুদান নিয়ে স্মার্ট গ্রিড এবং বিশ্বব্যাংক ও ইডকলের অনুদানে ‘অটোমেটিক স্মার্ট সোলার ইরিগেশন সিস্টেম’ প্রকল্পে কাজ করছেন। এছাড়াও তিনি বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), জার্মানির জিআইজেড, যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেইঞ্জ ও ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল, ন্যাশনাল ইউভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর প্রভৃতি থেকেও অনুদান লাভ করেছেন।
সম্প্রতি শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী সৌরশক্তি বিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের নীতিমালা প্রণয়নের সাথেও যুক্ত হয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত ‘নেট এনার্জি মিটারিং নির্দেশনা ২০১৮’-এর খসড়া তৈরি করেছিলেন।
স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান ছাড়াও শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ওয়ার্কশপ আয়োজন এবং দেশের পক্ষে কাজ করার জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য পেশাদারি প্রশিক্ষণ দেয়ার সাথেও যুক্ত আছেন। এ যাবৎ তিনি প্রায় ২ হাজারেরও বেশি লোককে সৌরশক্তি ও প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত মোট ৪টি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে সফলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। এ ৪টি সফল কানেক্টেড সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে ১টি ছাড়া বাকি ৩টির কার্যকরী ডিজাইনে কনসালট্যান্ট হিসেবে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে। কাজেই দেশে সফলভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা ৭৫% সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেই আমার অবদান রয়েছে।
নিজের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী স্বদেশ খবরকে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্বন নিঃসরণমুক্ত বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।