প্রতিবেদন

১০০ সৃষ্টিশীল নারী নেতৃত্বের তালিকায় উঠে এলেন সায়মা ওয়াজেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ‘বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্যে উদ্ভাবনী নারী নেতৃত্ব’ নিয়ে করা একটি তালিকায় ১০০ জনের মধ্যে স্থান পেয়েছেন। পুতুল ডাকনামে পরিচিত বঙ্গবন্ধুর নাতনি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা বাংলাদেশে অটিজমসহ মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসারে নিয়োজিত। তিনি অটিজম বিষয়ক বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি।
সম্প্রতি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিভিত্তিক ‘গ্লোবাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রামস কনসোর্টিয়ামের’ চেয়ার ড. ক্যাথলিন পাইক ‘ফাইভ অন ফ্রাইডে’ শিরোনামে ব্লগে তালিকাটি তুলে ধরেছে। মানসিক রোগ অনুধাবন, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার উন্নয়নে অগ্রদূত এসব নারীর ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগ বিবেচনায় নিয়ে পরিচিতজনদের মধ্য থেকে নামের আদ্যাক্ষরের ভিত্তিতে তালিকাটি করা হয়েছে। তবে এটা কোনো বার্ষিক তালিকা নয়। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ১০০ নেতার এ বছরের তালিকার প্রতিক্রিয়ায় এটা তৈরি। শুধু একজন নারী ফোর্বসের ওই তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ড. পাইক মানসিক স্বাস্থ্যে উদ্ভাবনী নারীর নেতৃত্বের এই তালিকা তৈরি করেন।
ফোর্বসের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, উদ্ভাবন কোনো বিশেষ লিঙ্গের একার সম্পত্তি নয়। মানসিক স্বাস্থ্য বলুন, আর ব্যবসাই বলুন, কোথাও না।
২০১৭ সালে ডব্লিউএইচও পুতুলকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ‘শুভেচ্ছা দূত’ হিসেবে নিয়োগ দেয়। স্কুল সাইকোলজিস্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে সনদপ্রাপ্ত পুতুলকে এর আগে এ অঞ্চলের জন্য অটিজম বিষয়ক চ্যাম্পিয়ন নিয়োগ দেয় ডব্লিউএইচও। ওই বছরই ভুটানে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অটিজমসহ স্নায়ু বৈকল্য বিষয়ে ‘থিম্পু ঘোষণা’ প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অটিজম বিষয়ে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদানের জন্য ডব্লিউএইচও তাকে ২০১৪ সালের জন্য ‘এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছে। ডব্লিউএইচওর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য পুতুলের উদ্যোগেই ২০১১ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অটিজম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে দেশ-বিদেশে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে অনন্য সম্মান ও স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে গত বছরের ২ এপ্রিল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ বলেছিলেন, অটিজম আক্রান্তদের সফল, ক্ষমতায়িত ও কর্মক্ষম ব্যক্তিতে পরিণত করতে আমাদের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে। অটিজম আক্রান্তদের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সুযোগ করে দিতে হবে। সায়মা ওয়াজেদ তার প্রতিষ্ঠান সূচনা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সরকার, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও এনজিওদের সাথে সমন্বিতভাবে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারসহ অন্যান্য ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের কল্যাণে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন।
সে সময় সায়মা ওয়াজেদ জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ইকোসক চেম্বারে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ আয়োজিত অটিজম আক্রান্ত নারীর ক্ষমতায়ন শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। ইভেন্টে প্যানেলিস্ট হিসেবে আলোচনায় তিনি অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গ বিশেষ করে মেয়েদের যে সকল সামাজিক ও পারিবারিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া অটিজমের শিকার নারীদের বিভিন্ন বৈষম্য ও তাদের প্রতি গতানুগতিক সামাজিক ও পারিবারিক ধারণার কথা, তাদের নাজুক পরিস্থিতি এবং পরিবারের সদস্যসহ আশপাশের মানুষের দ্বারা নিগ্রহ ও নির্যাতনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
সায়মা ওয়াজেদ সেই প্যানেল আলোচনায় বলেন, অটিজম আক্রান্ত মেয়েরা নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে নিজেদের একান্ত চাওয়া-পাওয়ার কথাও ঠিকমতো বোঝাতে পারেন না। এ সকল নারীর বিবাহ ও দাম্পত্য জীবনসহ প্রাত্যহিক জীবনযাপনের বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টির ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি তারা যাতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে পারে সে বিষয়টির ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
সায়মা ওয়াজেদ বলেন, অটিজম আক্রান্তদের সমাজে জায়গা করে দিতে হবে, যাতে তারা সমাজ বা রাষ্ট্রে অবদান রাখতে পারে; অন্যথায় সমাজে বড় ধরনের বিভেদ তৈরি হবে।
অটিজম বিশেষজ্ঞের বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুনভাবে আলোচনায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্তরাধিকারী কে হবেন? এমন প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুই সন্তান ও ছোট বোন শেখ রেহানার তিন সন্তানই উচ্চ শিক্ষিত। আবার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের অবদানের কথা প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন। বেশি সময় বিদেশে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয় দেশের জন্য কাজও করছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁর অনন্য অবদান রয়েছে। তবে সজীব ওয়াজেদ জয় ততটা রাজনীতিঘেঁষা নন, বরং বাবা ওয়াজেদ মিয়ার মতোই বিজ্ঞানমনষ্ক।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলেন, আজকে যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়েছি, এই ডিজিটাল বাংলাদেশ জয়ের কাছ থেকে শেখা। জয়ই আমাকে এ ব্যাপারে সব রকম পরামর্শ দিয়েছিল।
তবে সম্প্রতি দেশ-বিদেশে প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হতে দেখা যায় তারই কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলকে। অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে হাতেকলমে রাজনীতির অনেক বিষয় শেখাচ্ছেন। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আলোচনাও করছেন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পুতুল রাজনীতিতে আসছেন বলে আলোচনা চলছে।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিভিন্ন সামাজিক কর্মকা-েও যুক্ত। তিনি ভালো বক্তাও। বিশেষ করে পুতুল একজন প্রখ্যাত অটিজম বিশেষজ্ঞ। সারা বিশ্বেই তিনি অটিস্টিক শিশুদের অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একজন সদস্য। তিনি একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী। সারা বিশ্বে অটিজম বিষয়ে মানুষকে সংবেদনশীল সচেতন করার ক্ষেত্রে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল একজন রোল মডেল।
শেখ হাসিনা যখন লন্ডনে চোখের অপারেশনের জন্য গিয়েছিলেন, সেই সময় তার সফরসঙ্গী ছিলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পুতুল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ফটোসেশনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলও। এছাড়া বিল গেটসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। যদিও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সজীব ওয়াজেদ জয়ও উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু সার্বক্ষণিকভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা গেছে পুতুলকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, একাধিক সাইড ইভেন্টে পুতুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে সাইড ইভেন্টটি হয়েছিল, সেখানে পুতুলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়ে সাইড ইভেন্টেও পুতুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেন। তাঁর তিন কন্যা এবং এক ছেলে। স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেন আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে ফরিদপুর জেলা থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
সায়মা ওয়াজেদ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি, ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
পুতুল ২০০৪ সালে স্কুল সাইকোলজির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তার গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত
হয়।
সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম এবং স্নায়বিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুতুলকে ডব্লিউএইচও অ্যাক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে। মনস্তত্ববিদ সায়মা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটিজম স্পিকস-এর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন।
নেতৃত্ব দেয়ার সকল গুণ তার রয়েছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। অনেকেই বলছেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল যদি আওয়ামী লীগে সক্রিয় হয়ে মানুষের পাশে থাকেন তাহলে তিনিও হতে পারেন দলটির কা-ারি।
অনেকেই এখন বলছেন, বিনয়ী, সংযত, মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তুলছেন শেখ হাসিনা?