প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

২৮তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত: বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটুকু এগিয়ে বাংলাদেশ

সাদেক মাহাবুব চৌধুরী
১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘বয়সের সমতার পথে যাত্রা’। বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
২৮তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, সম্পদ। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা আর নবীনদের উদ্যোগের সম্মিলনের মাধ্যমেই আমরা গড়ে তুলতে পারি সোনার বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যে আমি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাই।
বিশ্ব প্রবীণ দিবসে বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে, প্রবীণদের জন্য সরকার কী করছে এবং বাংলাদেশে গড়ে ওঠা বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ও গুণগত মান নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছে।
বৃদ্ধাশ্রম বৃদ্ধ নারী-পুরুষের আবাসস্থল। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সমগ্র বিশ্বে জীবন প্রত্যাশার মান বৃদ্ধি করে জনমিতিক ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে সমগ্র বিশ্বে বয়েসী নর-নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নর-নারীর গড় আয়ুও বৃদ্ধি পেয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে একবিংশ শতাব্দীকে কেউ কেউ বার্ধক্যের যুগ বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে বার্ধক্যের মোকাবিলা করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশ পৃথিবীর ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। বার্ধক্য বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ, যার মোকাবিলা বেশ কঠিন। জাতিসংঘ ৬০ বছর বয়সকে বার্ধক্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬.১ শতাংশ প্রবীণ নর-নারী। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ১০.১ শতাংশে। উদ্বেগের বিষয় হলো, তখন বাংলাদেশে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হয়ে দেখা দিবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রবীণ সাধারণ পরিবারে বসবাস করেন এবং তাদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ভার সন্তানদের ওপর বর্তায়। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নানা পরিবর্তনের কারণে যৌথ পরিবারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে প্রবীণরা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার অর্থাৎ আশ্রয় ও বাসস্থান হারাচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৮ ভাগ প্রবীণেরই কোনো না কোনো সন্তান বাবা-মার কাছ থেকে দূরে থাকে। অর্থাৎ এদের সঙ্গে পিতা-মাতার যোগাযোগ খুব কম হয়। এতে বৃদ্ধ পিতা-মাতারা আর্থসামাজিক সমস্যায় ভোগেন। বাংলাদেশে শতকরা ২০ জন হয় একাকি থাকেন অথবা স্বামী-স্ত্রী এক সঙ্গে থাকেন। দরিদ্র প্রবীণদের সংখ্যা শতকরা ৩৭ জন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতা চালু করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ১৭ লাখ দরিদ্র প্রবীণ সাহায্য পাচ্ছে। এছাড়া সহায়সম্বলহীন প্রবীণদের জন্য সরকার ৭টি বিভাগে ৭টি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ৭টি বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। বেসরকারি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম চালু করার উদ্যোগও আছে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। তবে সেই বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে প্রবীণদের অর্থের বিনিময়েই থাকতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আরো অনেক বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাংলাদেশে চাহিদার অনুপাতে বেশ কম। ঢাকায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত একটি প্রবীণ নিবাস আছে আগারগাঁওয়ে। ফরিদপুরে অরুণিমা নামে আর একটি প্রবীণ নিবাস তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু প্রবীণ নিবাস রয়েছে। এর মধ্যে একটি রয়েছে ঢাকার গাজীপুরে। বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে।

দুই.
সব বয়সের মানুষের কাছে বৃদ্ধাশ্রম একটি আতঙ্ক। আমাদের সমাজ বৃদ্ধাশ্রমকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। মানুষের ধারণা, বৃদ্ধাশ্রম হলো মানুষকে শাস্তি দেয়ার স্থান। অথচ প্রাচীনকাল থেকেই এ উপমহাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের অস্তিত্ব দেখা যায়। অসহায় শিশুদের জন্য অনাথ আশ্রম, বিধবাদের জন্য বিধবাশ্রম চালু ছিল। অসহায় প্রবীণদের ভরণপোষণ, সেবাযতেœর জন্য বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছিল।
সাধারণ মানুষ বৃদ্ধাশ্রমকে ভালোভাবে নিতে পারেনি। সে জন্য নচিকেতার বৃদ্ধাশ্রম গানটি এতটা জনপ্রিয়। মানুষ আশা করে, প্রবীণরা পরিবার-পরিজনের কাছে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাবেন।
কিন্তু পৃথিবী পাল্টে গেছে, মানুষের জীবন পাল্টে গেছে। নতুন এক বিশ্ব পরিস্থিতি মানবজাতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে গেছে। ফলে সমাজে ক্রমেই প্রবীণের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠী পৃথিবীর সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইস্যুটি এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। দেশের পাঠ্যপুস্তকে ‘প্রবীণ’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। হাসপাতাল ও জেলখানায় প্রবীণদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু হচ্ছে। এমনকি অফিস-আদালতে প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান; যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ডাচ-বাংলা ব্যাংকে প্রবীণদের সেবাদানের জন্য আলাদা কাউন্টার খোলা হয়েছে। জনৈক প্রবীণ স্বদেশ খবর প্রতিবেদককে বলেছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের প্রবীণবান্ধব উদ্যোগ খুবই ইতিবাচক। কারণ, সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে একদিন প্রবীণ হতে হবে। তাই সবাইকে মনে রাখতে হবে, প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা তার পরিবারের প্রবীণরা এ সময়ে নিজেদের খুবই অসহায় ভাবেন। তারা তখন আশা করেন, পরিবার বা সমাজের কেউ এসে তার পাশে দাঁড়াক। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অনেক ধনী ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সদস্যরাও প্রবীণ বয়সে টাকা-পয়সা ধনদৌলত পেলেও ছেলে-মেয়ে বা নিকট আত্মীয়ের সান্নিধ্য পান না। তাদের অনেকেরই নিঃসঙ্গ জীবন কাটে বৃদ্ধাশ্রমে; যা তিনি তার যৌবন বয়সে কখনও ভাবেননি।
জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দৌড়ে বিশ্বায়নের এ যুগে মানুষ নিরন্তর ছুটে চলেছে গ্রাম থেকে শহরে, আবার শহর ছেড়ে উন্নত কোনো স্বপ্নের দেশে। ক্ষমতা, টাকা-পয়সা, ধনদৌলত-বিত্তবৈভবের এ মাতাল যাত্রার যেন শেষ নেই। অবশ্য প্রবীণ বয়সে এ শ্রেণির নেশাগ্রস্ত মানুষের দৌড়ও শেষ হয় হতাশার মাধ্যমে নিঃস্ব জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে। কারণ উন্নয়নের স্রোতে ধন-সম্পদকে কেন্দ্র করে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলো হয় ভেঙে যাচ্ছে নতুবা দুর্বল হয়ে পড়ছে দিন দিন।
যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে একক পরিবার গড়ে উঠেছে। আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর একক পরিবারের হাতে বলি হয়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা। একইভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধবিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তনে শিশু ও বৃদ্ধরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ অর্থ, যশ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তির জন্য প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মানবিক সম্পর্কগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, বিপুলসংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনপ্রণালি কেমন হবে?
বাংলাদেশে জীবনযাত্রার পাঁচ ধরনের রূপ দেখা যায়। যেমন ১. স্বামী-স্ত্রীর সন্তানসন্ততিশূন্য একাকী জীবন, ২. বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধার নিজগৃহে একাকী বসবাস, ৩. ভাইবোন অথবা বন্ধু-বান্ধবসহকারে বসবাস, ৪. বিপতœীক বৃদ্ধ অথবা বিধবা বৃদ্ধা সন্তানদের কিংবা নাতি-নাতনির সঙ্গে বসবাস এবং ৫. বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র কিংবা প্রবীণনিবাস।
বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা কোন ধরনের জীবনযাত্রা নির্বাচন করবে তা কতগুলো শর্তের ওপর নির্ভরশীল। শর্তগুলো হলো, যেসব প্রবীণের আর্থিক সঙ্গতি ভালো তারা নিজ গৃহে কিংবা নতুন এলাকায় বসবাস করেন। আর্থিক সঙ্গতি দুর্বল হলে কম ভাড়ার বাসা নেন কিংবা ছেলেমেয়ের সঙ্গে বসবাস করেন। স্বামী-স্ত্রীর আয় এবং সুস্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে বাসস্থানের মান।
বিপতœীক ব্যক্তি, বিধবা নারী যেমন ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজনের কাছে থাকে এবং সঙ্গিহীন জীবন কাটায়, অবিবাহিত নারী-পুরুষ ঠিক তেমনি জীবনযাপন করে। প্রবীণদের স্বাস্থ্য খারাপ হলে ছেলেমেয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যাদের ছেলেমেয়ে আছে তারা ছেলেমেয়ের কাছাকাছি বাসা নেন, যাতে প্রতিনিয়ত দেখাসাক্ষাৎ হয়। যেসব প্রবীণের স্বাস্থ্য ভালো এবং সঙ্গলাভের ইচ্ছা আছে, তারা এমন জায়গায় বাসা নেন, যাতে আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ে, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রবীণ আর্থিকভাবে ভীষণ দুর্বল। দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তারা ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজনের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। গ্রামে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ঘরের বারান্দায় কিংবা বসবাস অনুপযোগী ঘরে থাকেন। শহরে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আলাদা কক্ষ নেই। অতিথি কক্ষে, বসার ঘরে থাকতে হয়। অনেক সময় এসব ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে না। দেখাশোনা করার লোক থাকে না। ঠিকমতো খাবারদাবার পাওয়া যায় না। ওষুধ-পথ্য অনিয়মিত হয়ে পড়ে। টাকার অভাব অথবা ব্যস্ততার অজুহাতে ডাক্তারের কাছে নিতে গড়িমসি করে। মনোযোগ, সেবাযতœ পাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
আমাদের দেশে বৃদ্ধনিবাসে প্রবীণরা থাকতে আগ্রহী হন না। এর প্রধান কারণ হলো বৃদ্ধনিবাস নিজ এলাকার বাইরে। বৃদ্ধনিবাসে যাওয়া-আসা সহজ হলে এবং সুবিধামতো সময়ে অনায়াসে বাড়িতে যেতে-আসতে পারলে বৃদ্ধনিবাসের প্রতি নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন হবে। তবে বৃদ্ধনিবাসের কিছু সুবিধা এবং কিছু অসুবিধা রয়েছে।
সুবিধাগুলো হলো: ১. কম মূল্যে খাবার, ২. একই বয়সী ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকা, ৩. চিত্তবিনোদন ও আনন্দলাভের সুযোগ, ৪. ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতে হয় না, ৫. সার্বক্ষণিক চিকিৎসার সুযোগ এবং ৬. নিরাপত্তাব্যবস্থা ভালো।
অসুবিধাগুলো হলো: ১. নিজ গৃহের চেয়ে বেশি খরচ, ২. নিম্ন মানের খাবার, ৩. বৈচিত্র্যহীন একই রকম খাবার পরিবেশন, ৪. রুমগুলো ছোট, ৫. যাদের অপছন্দ হয় তাদের এড়ানো যায় না ৬. পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব থেকে কিছুটা দূরে থাকতে হয়।
বৃদ্ধাশ্রম হলো বিনা খরচে অসহায় প্রবীণের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা। প্রবীণরা পরিবারের সঙ্গে থাকলে মানসিক ও শারীরিকভাবে বেশি ভালো থাকেন। যাদের পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ নেই তাদের প্রবীণনিবাসে থাকা উত্তম। প্রবীণনিবাস গড়তে হবে পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জে, যাতে বৃদ্ধরা পরিচিত পরিবেশে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে থাকতে পারে। ব্যক্তিউদ্যোগে প্রবীণনিবাস গড়ে উঠলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো নিজের স্বার্থ আগে দেখা। প্রবীণ যত বেশি ভালো থাকবেন, তত বেশি ছেলেমেয়ের লাভ। ছেলেমেয়েদের হাসপাতাল ও ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। প্রবীণের সেবাযতœ করতে বেশি সময় দিতে হয় না। কারণ, প্রবীণ নিজে নিজেই ব্যক্তিগত কাজগুলো করতে পারেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবক-সেবিকা দরকার হয় না। প্রবীণদের বাসস্থান, থাকা-খাওয়া, বিনোদনের প্রতি সজাগ হলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

তিন.
ওল্ডহোম বা বৃদ্ধনিবাস ধারণাটি পশ্চিমা বিশ্বের। বিগত শতকের শুরু থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আধুনিক, গতিশীল জীবনযাত্রার উত্তরণ এবং একান্নবর্তী পরিবারভিত্তিক সমাজব্যবস্থার ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্তির প্রত্যক্ষ ফল এসব বৃদ্ধাশ্রম। পশ্চিমা বিশ্বে একদিকে মুনাফাপ্রত্যাশী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনুৎপাদনশীল জনসংখ্যাকে রাখতে চায় মূল কাঠামোর বাইরে, অন্যদিকে ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায় সারতে চায় সহজেই। এর সাথে আছে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রবল আকাক্সক্ষা। তাই শেষ জীবনের আনন্দাশ্রম হিসেবে বৃদ্ধাশ্রমই হলো তাদের কাছে সুন্দর স্বাভাবিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা এখন তাদের সংস্কৃতিরই অংশ। সন্তানের বয়স যখন ১৮ পার হয়, তখন থেকেই শুরু হয় তার স্বাধীন স্বতন্ত্র কার্যক্রম আর পিতা-মাতার সংসার ছেড়ে নিজের জীবন গড়ে তোলার সংগ্রাম। আবার সুদীর্ঘ কর্মজীবন শেষে বৃদ্ধ বয়সে অবসরে সবাই নিজের মতো করেই স্বাধীনভাবে শেষ দিনগুলো কাটাতে চান, সন্তানের গলগ্রহ হয়ে থাকতে চান না। তাই কেউ কেউ নিজের মতো একাই থাকেন, কেউবা ওল্ডহোমে সমবয়সী অন্য বয়স্কদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। জীবনের শুরুতে স্কুলে যাবার মতোই শেষ জীবনে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা তাদের অনেকের কাছেই খুব স্বাভাবিক এবং তারা এজন্য মানসিকভাবে তৈরিই থাকেন।
আজকাল আমাদের দেশেও বয়স্কদের জন্য এমন নিবাস গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমে যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রার উপকরণ, আমাদের দেশে তার বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে এখনও ব্যক্তি থেকে পরিবারের গুরুত্বই বেশি। পূর্বের একান্নবর্তী ব্যবস্থা এখন খুব-একটা না দেখা গেলেও অন্তত পিতা-মাতাকে নিজের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য করা হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে পরস্পরের সান্নিধ্যের শান্তিটুকুর মূল্য এখানে অনেক বেশি। তাই ছেলে বা মেয়ে স্বাবলম্বী হলেই পিতা-মাতাকে ত্যাগ করে নিজে একা একা চলবে বা পিতা-মাতাকে আলাদা রেখে নিজে আলাদা থাকবে, এটা প্রত্যাশিত নয়। এখানে যেমন সন্তান সাবালক হলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয় না, তেমনি পিতা-মাতা বৃদ্ধ হলে এবং কর্মক্ষম না থাকলে তার দেখাশোনা করার দায়ভার সন্তানের ওপরই বর্তায়।
তাই পশ্চিমের ওল্ডহোম আমাদের জীবনধারায় অনুপস্থিত থাকাটাই কাম্য ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমের ন্যায় আমাদেরও জীবনযাত্রার ব্যস্ততা যেমন বাড়ছে, তেমনি ধীরে ধীরে একটি-দুইটি করে বেশকিছু বৃদ্ধাশ্রমও গড়ে উঠছে। উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি পারিবারিক বন্ধনসমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এভাবে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি হওয়া অবশ্যই বেমানান। তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রবীণদের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে হবে।