প্রতিবেদন

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী: আবরার হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর সরকার

মো. শহীদ উল্যাহ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অত্যন্ত ুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই এ ঘটনায় যে বা যারা সম্পৃক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, এ ধরনের মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না, শাস্তি পেতেই হবে। জড়িত সবার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি।
খবরটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এরই মধ্যে ১৬ জন বুয়েট ছাত্রকে আটক করা হয়েছে; এদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার নেতা।
এছাড়া ফাহাদের মৃত্যুর ঘটনার একদিন পর বুয়েটের উপাচার্যের ক্যাম্পাসে উপস্থিতি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী ােভ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি কেমন ভিসি? একটা ছাত্র মারা গেল, আর এতটা সময় তিনি ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন!
বুয়েটের এই হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেউ যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘ ও ভারত সফর থেকে ফিরে গত ৯ অক্টোবর গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবরার হত্যাকা- বিষয়ে ক্ষোভ ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
আবরার হত্যাকা-ের পর শিার্থীদের বিােভ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তা অবশ্য নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তিনি বলেছেন, ‘বুয়েট চাইলে নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। তাদের সিনেট আছে, এটা তারা করতে পারে। তবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে, এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের (সামরিক শাসক) কথা। এখানে রাজনীতিটা কোথায়? এর কারণটা কোথায়? এটা খুঁজে বের করতে হবে।’
শুধু ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি হল খুঁজে খুঁজে দেখা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘এখানে আমরা কোনো প্রকার হস্তপে করব না। তাই বলে ছাত্ররাজনীতিকে দোষারোপ করা, এটা তো রাজনীতি না। তবে বুয়েট কর্তৃপক্ষ চাইলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে Ñ এ ব্যাপারে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করবো না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ মনোভাবের পর ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আবরার হত্যামামলার ১৯ আসামিকে বুয়েট থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া র‌্যাগিং, ভিন্নমাতবলম্বীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করলে শাস্তির নিশ্চয়তা দেয়া হয়। আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং মামলার খরচ দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয় এবং আবরার হত্যার পর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বুয়েট ভিসি দুঃখ প্রকাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বুয়েট শিার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে ডেকে তাদের সবগুলোকে বহিষ্কার করতে বলেছি। পুলিশকে বলেছি তাদের গ্রেপ্তার করতে। কাউকে ছাড় দেব না। অন্যায়কারীর বিচার হবেই। কিসের ছাত্রলীগÑ সে বিচার করব না। এই হত্যাকা-ের বিচার হবেই। অপরাধী অপরাধীই। কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, তা কোন দলের, কে করে সেটা দেখি না। অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করি।
এ হত্যাকা-কে অমানবিক উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন ‘একটা বাচ্চা ছেলে, ২১ বছর বয়স। তাকে কী অমানবিকভাবে হত্যা করেছে পিটিয়ে পিটিয়ে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বুয়েটে যে ঘটনা ঘটেছে, জানার পরই পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলাম অপরাধীদের ধরতে। অনেকেই ধরা পড়েছে। ছাত্ররা আন্দোলনে নামার আগেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’
আবরারকে সাধারণ পরিবারের ছেলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এত ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে। তার মায়ের কষ্ট আমি বুঝি, বাবার কষ্ট বুঝি। কারণ আমিও হত্যার বিচার চেয়ে পাইনি।’
ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে তারা আমার পার্টির, এটা আমি কখনোই মেনে নেব না।’
রাজধানীসহ সারাদেশের সকল শিাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হলে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, ‘নামমাত্র টাকা ভাড়া দিয়ে শিাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও আবাসিক হলে কারা থাকছে, কারা মাস্তানি করছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’
অবশ্য শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দেশে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা কিন্তু ছাত্ররাই নিয়েছে। সেই ছাত্রলীগ করা থেকেই আমাদের ভাষা আন্দোলন। এই যে একটা সন্ত্রাসী ঘটনা (আবরার হত্যা) বা এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক শিাপ্রতিষ্ঠানে তো সংগঠন করা নিষিদ্ধ আছে। বুয়েট যদি মনে করে তারা সেটা নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। এটা তাদের ওপর।’
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্ররাজনীতি একেবারে বন্ধের প্রসঙ্গে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি একেবারে ব্যান্ড করে দিতে হবে, এটা তো মিলিটারি ডিক্টেটরদের কথা। আসলে তারা এসেই সব সময় পলিটিকস ব্যান্ড, স্টুডেন্ট পলিটিকস ব্যান্ড, রাজনীতি ব্যান্ড, এটা তো তারাই করে গেছে।’
ছাত্ররাজনীতি থাকার পে যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশের নেতৃত্ব উঠে এসেছে তো ওই স্টুডেন্ট পলিটিকস থেকেই। আমি ছাত্ররাজনীতি করেই কিন্তু এখানে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দ চিন্তাটা আমার মাথায় ওই ছাত্রজীবন থেকে আছে বলেই আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারি। কিন্তু যারা উড়ে এসে জুড়ে বসেন, তারা আসেন মতাকে উপভোগ করতে। তাদের কাছে তো দেশের ওই চিন্তাভাবনা থাকে না। এইটা একটা শিার ব্যাপার, জানার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। এটা কিন্তু ওই ছাত্ররাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। আর আমাদের দেশের সমস্যা হলো বারবার এই মিলিটারি রুলাররা আসছে আর মানুষের চরিত্র হরণ করে গেছে। তাদেরকে লোভী করে গেছে। তাদেরকে ভোগবিলাসের লোভ দেখিয়ে গেছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি যেখানে নিজেই ছাত্ররাজনীতি করে আসছি, সেখানে আমরা ব্যান্ড করব কেন? কোনো প্রতিষ্ঠান যদি করতে চায় সেটা করতে পারে। স্বাধীনতা ভালো তবে তা বালকের জন্য নয়, এটাও একটা কথা আছে। স্বাধীনতার যে মর্যাদা দিতে পারবে না তার জন্য স্বাধীনতা ভালো না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে ছেলেটাকে হত্যা করল, এটা তো কোনো রাজনীতি না। বসুনিয়াকে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া) যে হত্যা করেছিল সেটা রাজনৈতিকভাবে। পুলিশ কিন্তু মোতায়েন আছে সব জায়গায়। আবার পুলিশ যখন আলামত সংগ্রহ করতে গেল সেখানে বুয়েটের ছাত্ররা আপত্তি জানাল, এখানে পুলিশ কেন? আলামত সংগ্রহ করতে গেলে বাধা দিল। এখন এদের সেফটি সিকিউরিটিটা কে দেবে? কিভাবে দেব? এখন যদি পুলিশ পাঠাই, কেউ পুলিশের ওপর একটা ঢিল মারল, কেউ একটা বোমা মারল, যারা এভাবে মানুষ মারতে পারে তারা মারল, তারপর যদি পুলিশ রিঅ্যাক্ট করে তার দায়দায়িত্ব কে নেবে?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি তারা দূরে থাকবে। যারা আন্দোলন করছে, করতে থাক। যতদিন খুশি আন্দোলন করতে থাক কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের নিজেদের ভেতরেই যদি কিছু হয় তো সেটার দায়িত্ব কে নেবে? আমি সেটা জিজ্ঞেস করি। সে দায়িত্ব তো আমরা নিতে পারব না।’
এদিকে আবরার ফাহাদের খুনিদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পাশাপাশি এই হত্যাকা-কে ঘিরে কোনো দল যেন ফায়দা লুটতে না পারে সে বিষয়ে সব শিাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসমাজকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আবরার হত্যাকা-ের প্রেেিত গৃহীত ব্যবস্থার পর্যালোচনা ও হত্যাকারীদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আবরার হত্যাকা-ে ছাত্রলীগের কতিপয় নেতৃবৃন্দের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় দ্রুততম সময়ে নানামুখী সাংগঠনিক পদপে নেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারও করা হয়েছে। আমরা দৃঢ় কণ্ঠে বলছি, ছাত্রলীগে কোনো অপরাধীর জায়গা হবে না। ছাত্রলীগ আদর্শিক সংগঠন, আদর্শ নিয়েই রাজনীতি করতে হবে।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, দেশের ছাত্রসমাজের প্রতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আহ্বান, নিজ নিজ শিাপ্রতিষ্ঠানে সকল প্রকার ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় আপনাদের প্রত্যেককে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। আবরার হত্যাকা-ের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাটিকে পুঁজি করে কেউ যেন দলীয় রাজনীতি চাঙা করার নামে আন্দোলন-আন্দোলন খেলায় মেতে উঠতে না পারে। শিার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে সজাগ থাকা ছাত্রসমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এমন কঠোর অবস্থানের পর আবরার হত্যাকা-ে জড়িতদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বুয়েট ও সারাদেশের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায় ছাত্রলীগও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানববন্ধন ও র‌্যালি
করেছে।
সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচারের চিন্তা করছে সরকার। এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের হত্যাকা-ের বিচার দ্রুত হওয়া উচিত। এজন্য আইনসম্মতভাবে বিচার দ্রুত শেষ করতে যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার তা-ই করবে।’