প্রতিবেদন

ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের সবচেয়ে উদার পরিবেশ বিরাজ করছে বাংলাদেশে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারতের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বর্তমানে দণি এশিয়ার মধ্যে বিনিয়োগের সবচেয়ে উদার পরিবেশ বিরাজ করছে বাংলাদেশে।
৩ অক্টোবর নয়াদিল্লির হোটেল তাজ প্যালেসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত আলোচনাকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের শিা, হাল্কা প্রকৌশল শিল্প, ইলেকট্রনিক্স শিল্প, অটোমোটিভ শিল্প, কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা শিল্পের মতো ত্রেগুলোতে বিনিয়োগ করার সুবর্ণ সময়।
শেখ হাসিনা বলেন, এই সময়ে দণি এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি স্বাধীন ও উদার বিনিয়োগের পরিবেশ বিরাজ করছে। বিনিয়াগবান্ধব বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরদের জন্য আইনি সুরা, উদার রাজস্ব ব্যবস্থা, মেশিনপত্র আমদানির েেত্র বিশেষ ছাড়, আনরেস্ট্রিকটেড এক্সিট পলিসি, সম্পূর্ণ বিনিয়োগ ও পুঁজি নিয়ে চলে যাওয়ার সুবিধাসহ নানাবিধ সুবিধা রয়েছে। আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা ও সেবা নিশ্চিত করে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করেছি। এদের মধ্যে ১২টি অঞ্চল ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। দু’টি অঞ্চল ভারতের বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরতি রাখা হয়েছে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশ কয়েকটি হাইটেক পার্ক প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের এই ব্যাপক উন্নয়নের জন্য সামাজিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের মানুষের আস্থার প্রশংসা করে বলেন, অনেকেই বাংলাদেশকে ৩ কোটি মধ্য ও উচ্চবিত্ত মানুষের একটি বাজার ও অলৌকিক উন্নয়নের দেশ হিসেবে দেখে থাকেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থান হিসেবে নজর কাড়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করেছে। আমরা এই উপ-অঞ্চলের জন্য একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র হতে পারি। আমাদের নিজস্ব ১৬২ মিলিয়ন জনসংখ্যার বাইরেও বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষের একটি ভূখ-ের সম্মিলিত বাজারের সাথে সংযুক্ত হতে পারে।
গত বছরের এইচএসবিসির পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ২৬তম সর্ববৃহৎ অর্থনীতি হবে। দু’টি বিষয় গুরুত্ব¡পূর্ণ, এর একটি হচ্ছে আমাদের উন্মুক্ত সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উদার মূল্যবোধ, ধর্মনিরপে সংস্কৃতি। অপরটি হলো আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ। এদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ বছরের নিচে। তারা দতা অর্জন করছে, তারা প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন, তারা প্রতিযোগিতামূলক কাজে যুক্ত হতে প্রস্তুত।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের আত্মবিশ্বাসী জনগণ, সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং শাসনপ্রক্রিয়ায় উন্নয়ন যাত্রায় আমরা অব্যাহতভাবে শিখছি। একটি স্থিতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের নেতৃত্ব খুবই সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল, সেইসঙ্গে দেশটির রয়েছে দৃঢ় সামষ্টিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ, সম্ভাবনাময় ও মুক্ত অর্থনীতি, যা একটি শান্তিপূর্ণ ও অগ্রসর জাতির উদাহরণ সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ুধা, দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশ এখন জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিভিন্ন েেত্র উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা আমাদের সাহস যোগাচ্ছে।
বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্য অনেক দেশের মতোই আমরাও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি, তবে আমাদের জানা আছে কিভাবে এই চ্যালেঞ্জকে সুবিধায় রূপান্তরিত করতে হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, এ বছর আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ১ শতাংশের রেকর্ড করেছে। আমরা ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০০৯ সালের পর থেকে ১৮৮ শতাংশ বেড়েছে। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশকে একটি দ্রুতবর্ধনশীল উচ্চ মূল্য, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা গত বছরে কোরিয়ায় ১২টি শিল্প রোবট রপ্তানি করেছি। বাংলাদেশে তৈরি ৪টি জাহাজ ভারতে আসছে। ভারতের রিলায়েন্স কোম্পানি সম্প্রতি বাংলাদেশে তৈরি বিপুলসংখ্যক রেফ্রিজারেটর আমদানি করেছে। বাংলাদেশে ৬ লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। সর্বাধিকসংখ্যক লোক ফ্রিল্যান্সিং করছে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের কৃষি সম্পর্কে বলেন, আমাদের কৃষি এখন আর অন্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং পুরোপুরি স্বাবলম্বী। বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন ৪র্থ বৃহৎ দেশ, পাটে দ্বিতীয়, আমে ৪র্থ, শাকসবজি উৎপাদনে ৫ম এবং অভ্যন্তরীণ মাছ চাষে ৪র্থ। আমরা প্রধান শস্য ও ফলের জিন কোড করছি এবং এ ব্যাপারে অগ্রসর হচ্ছি।
২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে ডিজিটালে রূপান্তর করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে শতভাগ লোক আইসিটি সুবিধা পাচ্ছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ৫ম বৃহৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশ। আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা ক্যাশলেস সোসাইটির দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ শহরে বাস করে। ২০২৫ সালের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সুবিধা ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার শহরের সকল প্রকার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। ফলে পুরো দেশের নাগরিকরাই ভবিষ্যতে শহরে-গ্রামে সকল স্থানেই বিশ্বমানের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।
ডব্লিউইএফ-এর প্রেসিডেন্ট বোর্জ ব্রান্ডসহ সংস্থার নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তারা দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বের রোল মডেল হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সেমিনারে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ল্েয সরকারের ইতিবাচক বিভিন্ন পদপে তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে একটি পরিবেশবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব সরকার রয়েছে। সুতরাং বিনিয়োগের জন্য একটি উপযুক্ত বাজার হলো বাংলাদেশ।
এমতাবস্থায়, সালমান এফ রহমান সকল দেশের ব্যবসায়ী বিশেষ করে বন্ধুপ্রতিম ভারতের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের অপূর্ব সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।