ফিচার

উন্নয়নের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা জরুরি

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
আত্মহত্যা-প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা, মনের স্বাস্থ্য-সংকটের জরুরি এক অবস্থা। মানসিক রোগাক্রান্তদের মাঝে আত্মহত্যার হার বেশি এবং আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক রোগের হার বেশিÑ যা এখন গবেষণালব্ধ প্রতিষ্ঠিত সত্য।
আত্মহত্যার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে বিষণœতা রোগ। অন্যান্য মানসিক রোগ, যেমন, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার বা দ্বি-প্রান্তিক আবেগজনিত রোগ, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে মানসিক চাপজনিত রোগ, জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা অত্যধিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের সমস্যা বা পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্তদের মধ্যেও আত্মহত্যার হার সাধারণের চেয়ে বেশি। মানসিক সুস্থতা আত্মহত্যা প্রতিরোধের অন্যতম শক্তি। জীবনের খারাপ সময়ে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা, নেতিবাচক চিন্তা চ্যালেঞ্জ করার দক্ষতা, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস, সমস্যা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা Ñ এসব আত্মহত্যার প্রতিরোধী বিষয়। সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক, অন্যকে অসম্মান কিংবা কষ্ট বা আঘাত না করে মনের কথা দৃঢ়ভাবে প্রকাশের যোগ্যতাও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন তথা আত্মহত্যা-প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। এছাড়া সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাশক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক-মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যা প্রবণতা কমায়। সার্বিক বিবেচনায় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০১৯-এর প্রতিপাদ্য -‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ’ (গবহঃধষ ঐবধষঃয চৎড়সড়ঃরড়হ ধহফ ঝঁরপরফব চৎবাবহঃরড়হ) খুবই সময়োপযোগী ও যুক্তিযুক্ত।
আমরা বাংলাদেশে আত্মহত্যার পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে পারি:
আত্মহত্যার বিপদসঙ্কেত
নিজেকে শেষ করার বেশ কয়েক দিন ও ঘণ্টা আগে থেকে সাধারণত সঙ্কেত ও বিপদের ইঙ্গিত দেখা যায়। ঝোঁকের মাথায়ও অনেকে আত্মহত্যা করে। তবে তার হার কম।
সবচেয়ে সুদৃঢ় ও ভয়াবহ সঙ্কেত মৌখিকÑ ‘আর পারছি না’, ‘সব কিছু অর্থহীন’ এমনকি ‘সব শেষ করে দেব ভাবছি’ এসব মন্তব্যে সবসময় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়।

অন্যান্য পরিচিত বিপদসঙ্কেত
নিজেকে গুটিয়ে নেয়া বা বিষণœ বোধ করা, বেপরোয়া ভাব, সবকিছু গুছিয়ে নেয়া ও মূল্যবান জিনিসপত্র বিলিয়ে দেয়া, আচরণ, ভাবভঙ্গি ও চেহারায় আমূল পরিবর্তন, ড্রাগ ও অ্যালকোহলে আসক্তি, ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া বা জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটা। বিভিন্ন পরিস্থিতি, আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তন আত্মঘাতী হওয়ার অগ্রিম লক্ষণ হতে পারে। অবশ্যই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পরিস্থিতির পরিণাম আত্মহত্যা হয় না। তবে সাধারণভাবে একজন মানুষের মধ্যে যত বেশি লক্ষণ দেখা যায় আত্মহননের তত বেশি আশঙ্কা থাকে।

পরিস্থিতি
পরিবারে আত্মহত্যা বা হিংস্রতার ইতিহাস, যৌন বা শারীরিক নির্যাতন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদ বা পৃথক হওয়া, সম্পর্কে ইতি, পড়াশোনায় ব্যর্থতা, পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়া, চাকরি হারানো, কর্মক্ষেত্রে সমস্যা, আসন্ন আইনি প্রক্রিয়া, সাম্প্রতিক হাজতবাস বা আসন্ন মুক্তি।

আচরণ
কান্নাকাটি করা, ঝগড়া করা, আইনভঙ্গ করা, আবেগপ্রবণতা, নিজেকে আহত করা, মৃত্যু ও আত্মহত্যার বিষয়ে লেখা, আগেকার আত্মহননমূলক আচরণ, চরম ব্যবহার, ব্যবহারে পরিবর্তন।

শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন
কর্মশক্তির অভাব, ঘুমের প্যাটার্নে বিঘœ, খুব বেশি বা কম ঘুম, ক্ষুধা নষ্ট হয়ে যাওয়া, হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া, অল্পস্বল্প রোগব্যাধি বেড়ে যাওয়া, যৌন উৎসাহে পরিবর্তন, চেহারায় আকস্মিক পরিবর্তন, অনুভূতি ও ভাবনাচিন্তার পরিবর্তন, আত্মহত্যার চিন্তা, একাকিত্ব – পরিবার ও বন্ধুদের সাহায্যের অভাব, প্রত্যাখ্যাত হওয়া, বিচ্ছিন্ন বোধ করা, গভীর অপরাধবোধ বা দুঃখ, সঙ্কীর্ণ ভাবনাধারার বাইরে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট দেখায় অক্ষমতা, দিবাস্বপ্ন, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ, অসহায়বোধ, আত্মপ্রত্যয় হারানো ইত্যাদি।
আত্মহত্যাপ্রবণ বন্ধু বা স্বজনদের সাহায্য করতে হবে: আত্মহত্যাপ্রবণ বন্ধু বা স্বজনদের সাহায্য করতে হলে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে।

কথা শোনা জরুরি
কেউ যদি বিষণœতায় ভোগে বা আত্মহত্যার কথা ভাবে তাদের সাহায্য করা, তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। শান্ত হয়ে তাদের কথা শোনা উচিত। যারা আত্মঘাতী হতে চায় তারা উত্তর বা সমাধান চায় না। তার চায় একটি নিরাপদ জায়গা যেখানে তারা আপন উদ্বেগ ও ভয়ভীতি ব্যক্ত করতে পারে, নিজের মতো করে বাঁচতে পারে। একনিষ্ঠভাবে কথা শোনা সহজ নয়। আমাদের কথা বলার ইচ্ছাকে দমন করতে হবে। মন্তব্য করা, আরো কিছু বলা বা উপদেশ দেয়ার ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শুধু যে বন্ধুর মুখের কথা শুনতে হবে তা নয়, তাদের মতো করে তাদের উপলব্ধি করতে হবে, আমাদের মতো করে নয়। আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে চাইলে এই বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে।

যারা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে তারা কী চায়?
কেউ যেন তাদের কথা শোনে: যেন সময় নিয়ে, মন দিয়ে তার কথা শোনে। যিনি বিচার করতে বসবেন না, উপদেশ শোনাবেন না বা মতামত জাহির করবেন না, সত্যিকার অখ- মনোযোগ দেবেন।
এমন কেউ যাকে বিশ্বাস করা যায়, যিনি তাকে সম্মানের চোখে দেখবেন ও তার ওপর আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা করবেন না। যিনি সম্পূর্ণ ব্যাপারটা একান্ত গোপন রাখবেন। যিনি তার প্রতি যতœবান হবেন: যিনি আশ্বস্তবোধ করবেন, শান্তভাবে কথা বলবেন ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করবেন। তিনি বলবেন, ‘আমি তোমার প্রতি মনোযোগী ও যতœবান।’
যারা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে তারা কি চায় না? একা থাকতে অগ্রাহ্য করা বা দল থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হলে তাদের সমস্যা ১০ গুণ বেড়ে যায়।

পরামর্শ ও উপদেশ
লেকচার দিয়ে সাহায্য করা যায় না। ‘দুশ্চিন্তা করবে না’-র মতো পরামর্শ কিংবা ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’-র সহজ আশ্বাসও বিশেষ ফলদায়ক হয় না। যাদের আত্মহননের ইচ্ছা জাগে তাদের বিশ্লেষণ, তুলনা, শ্রেণিভুক্ত কিংবা সমালোচনা করা যাবে না। শুধু শুনতে হবে।

জিজ্ঞাসাবাদ করা
দয়া দেখানো বা প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। অনুভূতির ব্যাপারে কথা বলা কঠিন। তাদের তাড়া দেয়া যাবে না বা প্রতিরক্ষামূলক করে তোলা উচিত নয়। শুধু শুনতে হবে তাদের কথা।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজসমূহের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে মানসিক রোগাক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল সাইকোলজি, কিনিক্যাল সাইকোলজি, কাউন্সেলিং ও এডুকেশনাল সাইকোলজি এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগও সেবা দিয়ে আসছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগেও একই সেবা কমবেশি চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সারা দেশব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের কয়েকটি গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে, যা সরকারের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি-নির্ধারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। ব্যক্তির শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সরকারের বিশেষ সুদৃষ্টি দেশের ভবিষ্যৎ সুস্থ সুনাগরিক গড়ে তোলার পথে অন্যতম জরুরি পদক্ষেপ। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘ঘড় যবধষঃয রিঃযড়ঁঃ সবহঃধষ যবধষঃয’, ‘ঘড় ংঁংঃধরহধনষব ফবাবষড়ঢ়সবহঃ মড়ধষং (ঝউএ) ধপযরবাবসবহঃ রিঃযড়ঁঃ সবহঃধষ যবধষঃয’।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি বর্তমান সরকারের বড় কৃতিত্ব। এ পদক্ষেপ দেশজুড়ে জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস।
লেখক: পরিচালক ও অধ্যাপক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল