রাজনীতি

দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পারছে না বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
২০০৬ সালের পর থেকে একের পর এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে নানামুখী সংকটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন দায় হয়ে পড়েছে। দলে একের পর এক সংগঠনবিরোধী কর্মকা- চললেও কারো বিরুদ্ধেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। দলটির চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায়ে কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফেরারি থাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ফ্রিস্টাইলে চলাফেরা করছেন। এককভাবে কিছু করতে না পেরে রাজনীতিতে ইউটার্ন নিয়ে দলটি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেছিল। গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়া দলটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে একটি অনুকূল পরিস্থিতি ও সুদিনে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। মাত্র ৭ জন এমপি নিয়ে তাদের সংসদে যেতে হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট এখন মৃতপ্রায়। পারস্পরিক অবিশ্বস্ততায় হাবুডুবু খেয়ে একেক নেতা একেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আবার সে সিদ্ধান্ত দলের বিপক্ষে গেলেও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, মৌখিকভাবে সতর্কও করতে পারছেন না। অবস্থা দেখে মনে হয়, মহাসচিব মির্জা ফখরুল একপ্রকার ভয়ই পান বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদের।
গুটিকয়েক নেতাকর্মী নিয়ে ছোটখাট মানববন্ধন আর পল্টনের অফিস থেকে প্রেস রিলিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে বিএনপির রাজনীতি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে প্রায় ২ বছর ধরে কারাগারে থাকলেও তার মুক্তির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি কেন্দ্রীয় নেতারা। দলটির মহানগর কমিটির নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে দ্বৈত নীতি গ্রহণ করেছেন। তারা নতুন করে আবার যেন জেলে যেতে না হয়, সে চেষ্টায়ই আছেন সর্বক্ষণ। সরকারি দলের নেতাদের পোঁ ধরে তারা রিলাক্স মুডেই দিন পার করছেন।
বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর েেত্র নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন। তারা বলেছেন, সিদ্ধান্তহীনতার পেছনে নেতাদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এবং অগ্রাধিকার বা সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারা, কোনো নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে না পারার ব্যর্থতাসহ বেশ কিছু বিষয় রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যারা আছেন তাদের মধ্যে আছে তীব্র মতবিরোধ। স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যই কোনো সদস্যকে বিশ্বাস করেন না। ফখরুল একটা বললে মওদুদ বলেন আরেকটা। গয়েশ্বর কিছু বললে মির্জা আব্বাসের শরীর যেন জ্বলে ওঠে। মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যদি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে আনা হবে, তাহলে খায়রুল কবির খোকন সঙ্গে সঙ্গেই বলে দেবেন, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়।
নেতায় নেতায় এই অবিশ্বস্ততা এতই প্রকট যে, সিদ্ধান্ত নেয়ার েেত্র মতপার্থক্যটা এখন ওপেন। ফলে কোনো ইস্যুতেই সিদ্ধান্তগ্রহণে এক জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় জেলে রয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মামলার কারণে দেশে আসতে পারছেন না। দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের সাথে আলোচনা করে যৌথভাবে দল চালাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে মোটেও বিশ্বাস করেন না তারেক রহমান। এমনকি মির্জা ফখরুলকেও নাকি তিনি বিশ্বাস করেন না। তারেক রহমানের এখন একমাত্র বিশ্বাসের পাত্র হলেন যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মির্জা ফখরুলকে টপকে এখন রিজভীই বিএনপিতে ছড়ি ঘুরাচ্ছেন। মূলত রিজভী বিএনপির স্থায়ী কমিটিকে মোটামুটি দু’ভাগে ভাগ করে ফেলেছেন। একভাগ তারেকপন্থি, আরেকভাগ তারেকবিরোধী। তবে দুই অংশের সদস্যরাই দলের থেকে নিজের ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বেশি। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের এই মনোবৃত্তি পুরোপুরি পেয়ে বসেছে ঢাকা মহানগর কমিটির সদস্যদেরও। বলা হয়, ঢাকা মহানগর কমিটির নেতাদের অবিশ্বস্ত আচরণ এবং সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চলার মনোবৃত্তির কারণেই খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন বা যেকোনো আন্দোলন জমাতে পারছে না বিএনপি।
খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়া অথবা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করাÑ এরকমের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এক যুগের বেশি সময় মতার বাইরে থাকা বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বলে মনে করছে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি নেবেন না প্যারোলে মুক্তি নেবেন Ñ তা নিয়েও আছে নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব। রিজভীপন্থিরা চাচ্ছেন, খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেয়ে দেশেই চিকিৎসা গ্রহণ করুন। অপরদিকে ফখরুলপন্থিদের মত হলো, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে খালেদা জিয়া আজীবনের জন্য বিদেশে চলে যাক। এই অংশটি আবার মির্জা ফখরুলকে বিএনপিপ্রধান হওয়ারও স্বপ্ন দেখাচ্ছে। অবশ্য বিএনপিপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন এখন স্থায়ী কমিটির অনেক নেতাই দেখছেন।
তবে দলের নীতিবিরোধী তথা সংগঠনবিরোধী কর্মকা-ের জন্য বিএনপি হাই কমান্ড কোনো নেতার বিরুদ্ধেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পারছে না। আসলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে বিএনপির সর্বস্তরের নেতারাই নিজেদের দলীয় হাই কমান্ড মনে করছেন। তারা এটাও মনে করছেন, আমি যেহেতু দলের অপরিহার্য নেতা বা হাই কমান্ড Ñ আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় আবার কে?