প্রতিবেদন

দ্রুতই দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের মানুষ দ্রুতই দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসছে। দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাংলাদেশের যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, এর বেশিরভাগই সম্ভব হয়েছে শ্রম আয় বৃদ্ধির কারণে। ২০১০-১৬ সময়ে ৮০ লাখ বাংলাদেশি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমাচ্ছে।
গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর গুলশানের আমারি হোটেলে ‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট’ নামে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের এ চিত্র উঠে আসে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উপস্থিতিতেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দারিদ্র্যের হার কমেছে অসমভাবে। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমের বিভাগগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ঐতিহাসিক পার্থক্য আবার ফিরে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মারিয়া ইউজেনিয়া জেননি প্রতিবেদনের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে বলেন, ২০১০-১৬ সালে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক উন্নতি করেছে। বিশেষ করে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি এই উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে বাংলাদেশে ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে আলোচ্য সময়ে যে হারে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে তা ২০০৫-১০ সময়ের তুলনায় কম। ২০০৫-১০ সময়ে যেখানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে, সেখানে ২০১০-১৬ সময়ে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে বছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে।
ইউজেনিয়া জেননি দারিদ্র্যহার কমার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০১০-১৬ সময়ে দেশে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য কমেছে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। উল্লেখিত সময়ে পশ্চিমের রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য বেড়েছে, রাজশাহীর পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামে দারিদ্র্য কমেছে পরিমিতভাবে, বরিশাল, ঢাকা ও সিলেটে কমেছে দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে দারিদ্র্য বিমোচনের েেত্র বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকারের প্রচেষ্টায় ২০৩০ সাল নাগাদ দারিদ্র্য থাকবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, এখন স্বাভাবিক নিয়মেই প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে।
এছাড়াও বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংক পুরাতন ডাটা দিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আপডেট ডাটা দিলে চিত্রটি আরও উন্নত হতে পারত। কেননা দারিদ্র্য বিমোচনে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষি আধুনিক হচ্ছে। বাংলাদেশে ওয়ার্কিং পপুলেশনও শক্তিশালী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু পদ্মাসেতু ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেবে। আমি আশ্বস্ত করেছি, প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে পৌঁছবে। ৮ দশমিক ৩ থেকে ১০ শতাংশে যাবে প্রবৃদ্ধি। তখন দারিদ্র্য আরও কমবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে যারা দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন, তারা আর গরিব হবেন না। সে সুযোগ নেই। তারা সামনের দিকে এগোবেন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা ১০০ ইকোনমিক জোন করছি। ১০ বছরে ১০ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কঠোর হচ্ছে। আমরা শিায় বেশি নজর দিচ্ছি। বর্তমানে আমরা ৩১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ২০২৮ সালে ২৭তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবো। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা ও দরিদ্র গ্রুপকে টার্গেট করে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণে আমরা দৃঢ় আশাবাদী।
বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, গত দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করে। কিন্তু এখনও প্রতি ৪ জনের ১ জন দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছু করতে হবে, বিশেষত দারিদ্র্যের নতুন ত্রেগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যেমন শহর এলাকায় দারিদ্র্য মোকাবিলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের অর্ধেক শহরে বাস করবে বলে প্রপেণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে গ্রাম ও শহর নিয়ে বলা হয়েছে আলোচ্য সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের ৯০ শতাংশই গ্রামে হয়েছে। শহরে দারিদ্র্য কমেছে সীমিত হারে এবং অতি-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শহরের লোকের অংশ একই রয়ে গেছে। ফলে জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচনের গতি ধীর হয়েছে। কৃষি নয়, গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য হার কমাতে শিল্প ও সেবা খাত বেশি অবদান রেখেছে। আলোচ্য সময়ে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ধীর ছিল এবং আগের চেয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে কম অবদান রেখেছে। শহর অঞ্চলে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতে বিশেষত তৈরি পোশাক খাত দারিদ্র্য কমাতে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখেছে।
উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানে ধীরগতির কারণে সুবিধা পেতে পারত এমন পরিবারের অংশ সীমিত হয়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতে আত্ম-কর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, যা নগর দারিদ্র্য কমানোর েেত্র বাধা সৃষ্টি করছে।
বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখানো হয়েছে, ২০১০ সালে বরিশালে দারিদ্র্য হার ছিল ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে। একইভাবে চট্টগ্রামের দারিদ্র্য হার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। আর সিলেটের দারিদ্র্য হার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। উল্টো দিকে দেখা গেছে, ২০১০ সালে রংপুরে যেখানে দারিদ্র্য হার ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল, উল্লেখিত সময়ে তা বেড়ে ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। দারিদ্র্য কমার এই চিত্রে পূর্ব-পশ্চিমের ঐতিহাসিক পার্থক্য ফিরে আসার শঙ্কা করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম, বিশ^ব্যাংকের অন্যান্য কর্মকর্তা এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।