প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা : উৎসবের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সহাবস্থানই বাংলাদেশের বড় অর্জন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ৮ অক্টোবর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে যথাযথ ধর্মীয় মর্যদায় দেশব্যাপী ৩১ হাজারেরও বেশি পূজাম-পে পূজা-অর্চণা, শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এবং প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে দেবী দুর্গার ভক্তরা ৫ দিনব্যাপী দুর্গোৎসব উদযাপন করেন।
উৎসবের প্রত্যেক দিনই সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল বয়সের নারী-পুরুষ বিভিন্ন ম-পে গিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন। পাশাপাশি দূর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার কৃপা লাভের আশায় আরাধনা করেন।
প্রতিবারের ন্যায় এ বছরও দুর্গাপূজা উপলে রাজধানীসহ সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি পূজাম-পে বিপুলসংখ্যক আনসার, ব্যাটালিয়ান পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বসানো হয় মেটাল ডিটেক্টর ও কোজ সার্কিট টেলিভিশন ক্যামেরা (সিসিটিভি)। সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরাও এক্ষেত্রে সদাতৎপর ছিল। ফলে সারাদেশেই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বিঘেœ শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হয়।
৫ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন ৮ অক্টোবর ছিল বিজয়া দশমী বা উমার (দেবীদুর্গা) ফিরে যাওয়ার দিন। অকাল বোধনে কৈলাস থেকে শরতের পঞ্চম তিথিতে ঘোড়ায় চড়ে উমা আসেন পিতৃগৃহে। ৫ দিন পর দশমী তিথিতে আবার ফিরে যান কৈলাসে।
দশমীর দিন-শেষে দেবী দুর্গার বিদায়বেলায় আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে মা দুর্গা ভক্তদের হৃদয় সিক্ত করে তোলেন। সকাল ১০টার মধ্যে দশমীবিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন দেয়া হয়। দশমীতে বিভিন্ন পূজাম-পে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন মা দুর্গা ভক্তরা। বিকেল ৪টার দিকে প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গন থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন পূজাম-প থেকে ভক্তরা জমা হতে থাকে পুরান ঢাকার পলাশী মোড়ে। সেখান থেকে সম্মিলিতভাবে মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিজয়ার শোভাযাত্রা।
ঢাক-কাশরীর বাদ্যি-বাজনার তালে-তালে শোভাযাত্রাটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদণি শেষে গোধুলিলগ্নে সদরঘাটের ওয়াইজঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতীরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে রাজধানীর বিভিন্ন ম-পের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। এছাড়া রাজধানীর আশপাশের নদ-নদীগুলোতেও যেমন বালু, তুরাগ ও শীতল্যা নদীতেও প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়।
সকল ধর্মাবলম্বীর জন্য যথাযথ মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে দেশে উৎসব উদযাপনের সহনীয় পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার সমর্থ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমাদের উৎসবগুলো সবাই আমরা এক হয়ে উদযাপন করি। আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে চলতে শিখেছি।
প্রধানমন্ত্রী ৭ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীর দিনে রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশনের পূজাম-প পরিদর্শন করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রদত্ত ভাষণে একথা বলেন।
তিনি এ সময় দেশে ও প্রবাসে অবস্থানকারী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে আমরা এক হয়ে পথ চলি। প্রত্যেকের ধর্মকে আমরা সম্মান করি এবং আমরা চাই আমাদের দেশে শান্তি বজায় থাকুক। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক, দুর্নীতি Ñ এ ধরনের যেসব ব্যাধি সমাজকে নষ্ট করে, দেশকে নষ্ট করে, পরিবারকে নষ্ট করে, পারিবারিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে, তা যেন না থাকে। বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে Ñ এটাই আমরা চাই।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে চমৎকার একটা পরিবেশ যে, আমাদের ঈদের জামায়াত যখন অনুষ্ঠিত হয়, তখন আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের যুবসমাজ সেখানে কিন্তু নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। আবার যখন পূজা-পার্বন হয়, আমাদের মুসলমান সমাজের যুবকরা সেখানে উপস্থিত থাকে, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, একটা সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ যে আমরা সৃষ্টি করতে পেরেছি, এটাই হচ্ছে সব ধর্মের মূল কথা Ñ শান্তি ও মানবতা। এই শান্তি ও মানবতার ল্য নিয়েই বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এভাবে এগিয়ে যাবে, এটা আমরা বিশ্বাস করি।
মহান মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের সব ধর্মের মানুষ Ñ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এক হয়ে যুদ্ধ করে বুকের রক্ত বিলিয়ে দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে।
দিল্লি সফরের সময় সেখান থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ যৌথভাবে রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্রাবাস এবং একটি শিা প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করার কথাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।
স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ, আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারী এবং রামকৃষ্ণ মিশন মঠ ও হেড অব মিশন স্বামী পূর্ণানন্দ মহারাজ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। এর আগে রামকৃষ্ণ মিশনে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার প্রধান স্বামী পূর্ণানন্দ মহারাজ। প্রধানমন্ত্রী সেখানে পূজাম-প ঘুরে দেখেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিদর্শনে যান। সেখানে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যদি সহনশীলতা থাকে এবং একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি থাকে সেটাই একটি দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে এবং একটি দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধশালী হতে পারে।
সরকার এ দেশকে ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং উন্নত, সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার ল্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যার সুফল আজকে সারাদেশের মানুষ পাচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একেবারে গ্রামের মানুষ থেকে নিয়ে শুরু করে রাজধানীর মানুষ পর্যন্ত তার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে মানুষের মাঝে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ এসেছে বলেই আপনারা দেখছেন প্রতিনিয়ত পূজাম-পের সংখ্যা কেবল বেড়েই চলেছে।
তিনি এসময় পূজায় আইনশৃঙ্খলা রায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেন। তিনি কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে পূজার আয়োজন না করে প্রতিষ্ঠিত ম-পগুলোতেই পূজা অনুষ্ঠানের জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অনুরোধ জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেখানে পূজাম-প রয়েছে সেখানেই সবাই যদি সম্মিলিতভাবে পূজা করে তাহলে এর নিরাপত্তা দেয়াটা আরো সহজ হয়ে যায়। এটা আমি পূজা কমিটিকে সবসময়ই বলি। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে, মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের মনে একটা আনন্দ আছে বলেই আজকে কিন্তু পূজাম-পের সংখ্যা বেড়েছে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেভাবে আমরা সকল ধর্মের মানুষ একত্রিত হয়ে উৎসব পালন করছি সেই পরিবেশ যেন বজায় থাকে, সেটাই আমরা চাই।
প্রধানমন্ত্রী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যখন পূজা করেন তখন বাংলাদেশের জন্যও আশীর্বাদ করবেন যাতে দেশের সকল মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকতে পারে, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে থাকতে পারে, সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই যেন মঙ্গল হয়, উন্নত জীবন হয়, দারিদ্র্যের হাত থেকে সকলেই যেন মুক্তি পেয়ে উন্নত-সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারে। আমাদের দেশ নিয়ে বিশ্বে আজকে আমরা যে গর্ব করে যাচ্ছি, সে গর্ব যেন করে যেতে পারি।
মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত, সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।