প্রতিবেদন

বিশ্ব বসতি দিবস-২০১৯ উদযাপন উপলে আয়োজিত গৃহায়ন মেলায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ : ‘সবার জন্য আবাসন, কেউ থাকবে না গৃহহীন’- এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার

এম নিজাম উদ্দিন
১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্ব বসতি দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। সে হিসেবে এবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ৭ অক্টোবর বিশ্ব বসতি দিবস উদযাপিত হয়।
বিশ^ বসতি দিবস-২০১৯ উদযাপন উপলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আয়োজিত গৃহায়ন মেলা উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।
মেলা উদ্বোধনকালে রাষ্ট্রপতি বলেন, বসতি হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। অন্ন, বস্ত্রের পরই মানুষের প্রয়োজন আবাসন। ‘সবার জন্য আবাসন, কেউ থাকবে না গৃহহীন’ Ñ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
মেলায় ২৪টি আবাসন তৈরি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মেলা চলে। আয়োজকরা জানান, আবাসন মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবারের মতো এবারও আবাসন সংক্রান্ত বিশেষ প্রকল্প ও ছাড় দিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছে। এক ছাদের নিচে এই আয়োজনে ক্রেতাদের যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাধ ও সাধ্যের মধ্যেই স্বপ্নের ঘরের (ফ্যাটের) চাবি অথবা পৃথিবীর বুকে এক টুকরো জায়গার মালিক হওয়ার বিশেষ সুযোগ ছিল ওই আবাসন মেলায়। অনেকে কিস্তিতে প্লট ও ফ্যাট কেনার বিশেষ সুযোগটি গ্রহণ করেছে মেলা থেকে। ক্রেতাদের সুবিধার্থে মেলায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ছাড় এবং সহজ কিস্তিতে ফ্যাট নির্মাণ করার দ্রব্যসামগ্রী কেনার অফারও নিয়ে এসেছে।
বিশ্ব বসতি দিবস উপলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর দেয়া ভাষণে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের চলমান অভিযান ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে আশা প্রকাশ করে দুর্নীতিবাজদের হুঁশিয়ার করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আপনি যত বড় নেতা, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার হোন না কেন, অনিয়ম-দুর্নীতি করে পার পাবেন না। সরকার ইতোমধ্যে সমাজ থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে অভিযান শুরু করেছে। আশা করি, এ অভিযান দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখবে এবং অবকাঠামোসহ উন্নয়নের সকল েেত্র গুণগত মান নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের সমতার কথা তুলে ধরে আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পা রেখেছে। আমরা ২০ তলা ভবন মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে নির্মাণ করার সমতা অর্জন করেছি। কিছু অসাধু লোকের জন্য জাতির এ অর্জন ম্লান হতে পারে না।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাজে কঠোর তদারকির তাগিদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বসতি নির্মাণের েেত্র গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এককভাবে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর এ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব প্রকল্পের গুণগত মান কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে, প্রকল্পের টাকা কতটুকু সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে Ñ তা কঠোরভাবে মনিটরিং করা জরুরি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের অপকীর্তি ও অনিয়ম গণমাধ্যমে প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। কোনো কোনো সময় এসব সংবাদ ‘টক অব দ্য সিটি’ বা ‘টক অব দ্য কান্ট্রিতে’ পরিণত হয়। অনেক সময় ভবনের কাজ শেষ না হতেই ভবনে ফাটল দেখা দেয় বা পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে সরকারি কাজের মান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয় এবং সরকারের ভাবমূর্তি ুণœ হয়।
রাষ্ট্রপতি সুস্পষ্ট করে বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দায় সরকার নেবে না বরং তাদেরকেই এর দায় নিতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের েেত্র বাস্তবায়নকারী কর্তৃপ এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্ব নিতে হবে মন্তব্য করে আবদুল হামিদ বলেন, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি কাজের জন্য কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে তাৎণিকভাবে চিহ্নিত করা এবং দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা যায়। কাজের প্রতিটি স্তরে সঠিকভাবে তদারকি হলে রডের পরিবর্তে বাঁশ আর সিমেন্টের বদলে বালি ব্যবহারের গল্প শুনতে হবে না। ছোটখাটো ক্রয় ছাড়া সরকারি সব কেনাকাটাই ঠিকাদারের মাধ্যমে হয়।
‘প্রতারক’ ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা জানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। তবে ব্যবসার নামে প্রতারণা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কাজ না করে বা আংশিক কাজ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অশুভ আঁতাত করে বিল নেয়ার চেষ্টা করবেন না। অহেতুক বিলম্ব করে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ফায়দা লুটবেন Ñ এ ধরনের মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
জনগণের টাকায় বাস্তবায়িত প্রকল্পে কোনো ধরনের আপস ‘বরদাশত করা হবে না’ মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সৎভাবে ব্যবসা করবেন, সরকার আপনাদের পাশে থাকবে এবং সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
অবকাঠামো নির্মাণের সময় পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় রাখারও পরামর্শ দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন প্রকৃতির শিল্প-কলকারখানা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। ফলে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যবহারজনিত কারণে উন্নয়নের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের তরল ও কঠিন বর্জ্য; যা এ পৃথিবী, আমাদের পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিকতাকে করে তুলছে দূষিত। এ কারণে শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে মানুষ যেমন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি অনেক জীবপ্রজাতিও এর প্রভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্বের শহরগুলো প্রতি বছর ৭ থেকে ১০ বিলিয়ন টন বর্জ্য সৃষ্টি করছে। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তাদের বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ কঠিন বর্জ্য খোলা আকাশের নিচে স্তূপ করা হচ্ছে। এর এক-পঞ্চমাংশ রিসাইকিং এবং কম্পোস্টিংয়ের আওতায় আসছে। ৮০ শতাংশ তরল বর্জ্য সরাসরি জলাধারে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর ১ লাখ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যাচ্ছে এবং প্রতি ৩০ সেকেন্ডে ১ জন মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে দূষণ। তাছাড়া ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, হৃদরোগ ও ক্যান্সারে প্রতি বছর ৪ থেকে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এজন্য বর্জ্যরে নেতিবাচক প্রভাব থেকে মানবজাতি ও প্রাণিসম্পদকে রা করতে আমাদের থ্রি আর নয়, ফাইভ আর, অর্থাৎ রিথিংক, রিফিউজিং, রিইউজিং, রিডিউসিং এবং রিসাইকিংয়ের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং মানব সভ্যতা ও মানব অস্তিত্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন রাষ্ট্রপতি।
একই দিন বিশ্ব বসতি দিবস উপলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শাহবাগস্থ ঢাকা কাবের সামনে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি বলেন, সারা বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ বিশ^ বসতি দিবস উদযাপন করছে। এবারে প্রতিপাদ্যের মূল কথা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে সেটাকে কাজে লাগানো।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মনে করে সবার জন্য আবাসন, কেউ থাকবে না গৃহহীন। এটি ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার কাজ করে চলেছে। বিত্তবান, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, এমনকি যাদের কোনো কিছু নেই অর্থাৎ যারা ভাসমান বস্তিবাসী তাদের জন্যও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। একজন লোকও দেশে আবাসহীন থাকবে না। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার বাসস্থান বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করে চলেছি।
মন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের আবাসন প্রকল্পের অন্যতম ল্য হচ্ছে বাসযোগ্য, পরিবেশসম্মত আধুনিক আবাসন নিশ্চিত করা। ঢাকা শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে এবং ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ ধারণাকে কার্যকর করে নাগরিক সুবিধা সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। সারা বিশ^কে বাসযোগ্য, পরিবেশসম্মত ও সমৃদ্ধ আধুনিক বিশ্বে পরিণত করার যে বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনা তার রোল মডেল বাংলাদেশ। এ রোল মডেল হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুপরিকল্পিতভাবে বিশ^ বসতি দিবস পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা চাই সব মানুষ সম্মিলিতভাবে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলুক।