প্রতিবেদন

যে কারণে কমে আসছে ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমার হার কমানো, সুদের হার কমানোর ঘোষণা, আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ, ঋণ প্রদানে ভাটাসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অথচ বছরখানেক আগেও ব্যাংকগুলো তারল্য নিয়ে এক ধরনের চাপের মুখে ছিল।
আগে ২০টিরও বেশি ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাতের (এডিআর) সীমা অতিক্রম করেছিল। এখন সেই তালিকায় রয়েছে ১০টি ব্যাংক। তবে এখনও ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণপ্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। গত জুনে আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ও ঋণে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি উল্টো হলে ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট আরো কম হতো বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে জানুয়ারি-জুন এ ৬ মাসেই বেড়েছে ১৮ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। এর সঙ্গে অবলোপন করা ঋণ যোগ করলে খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তবে ব্যাংক খাতে আমানত বেশি বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে। গত অর্থবছর এসব ব্যাংকে ৯৫ হাজার ২৭৮ কোটি টাকার আমানত বেড়ে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা হয়েছে। এর মধ্যে শেষ ৩ মাসে বেড়েছে ৪৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
অপরদিকে ১ বছরে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ১৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকার আমানত বেড়ে ৩ লাখ ৯৯৯ কোটি টাকা হয়েছে। বিশেষায়িত দু’টি ব্যাংকে মাত্র ১ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা আমানত বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ৯ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা আমানত বেড়ে ৫৪ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা হয়েছে। সব মিলিয়ে জুন পর্যন্ত ১ বছরে ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আর ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ৩ মাস আগে ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। শেষদিকে আমানত বেশি আসার কারণে ঋণ ও আমানত প্রবৃদ্ধি কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা ধরে রাখাসহ নানা কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানত বাড়াতে মরিয়া ছিল। এেেত্র সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা বয়ে এনেছে। তাছাড়া এবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমিয়ে দেয়ার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতও বেড়েছে।
আমানত বৃদ্ধির ফলে ঋণ বিতরণে স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে। জুন পর্যন্ত ১ বছরে ব্যাংকগুলোর মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকার ঋণ বেড়েছে। এর মধ্যে শেষ ৩ মাসে বেড়েছে ৪০ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে। জুন পর্যন্ত এডিআর সীমার ওপরে রয়েছে ১৫টি ব্যাংক। ৩ মাস আগে যেখানে ১৯টি ব্যাংক সীমার ওপরে ছিল। বর্তমানে এডিআর সীমা ওপরে রয়েছে ১০টি ব্যাংক।
জানা যায়, সরকার গত অর্থবছর ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ২৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এ অর্থের একটি অংশ দিয়ে অর্থবছরের শেষ সময়ে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করেছে, যা ব্যাংকে আমানত বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে বাজার থেকে টাকা উঠে যাওয়ার প্রবণতা শেষ সময়ে কমেছে।
উচ্চ সুদের কারণে ব্যাংকের টাকা সঞ্চয়পত্রে চলে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে ব্যাংকাররা অনেকদিন ধরে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর দাবি করে আসছেন। তবে সুদহার না কমিয়ে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আবার ১ লাখ টাকার বেশি মূল্যমানের সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই ব্যক্তি একাধিক জায়গা থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা ঠেকাতে নেয়া হয়েছে পদপে। বাংলাদেশ ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর, পোস্ট অফিস, বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ সবাই এখন অভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করছে। এসব তথ্য জমা হচ্ছে একটি সেন্ট্রাল ডাটাবেজে। ফলে কারও সীমাতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র থাকলে তা ধরা পড়ছে। গত অর্থবছরের শেষ সময়ে এসব উদ্যোগের কারণে সঞ্চয়পত্রের একটি অংশ ব্যাংকে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর আমানত পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, তারল্যসংকট কমছে।
এদিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি কমছে প্রতি মাসেই। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। গত জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। আগস্টে তা আরও কমে হয় ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ কারণে সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার সীমা বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো আমানতের ৮৫ শতাংশ ও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। আবার ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য নগদ টাকার সুবিধা (রেপো) দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ কমলেও চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে সরকার। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৫১ দিনেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ২৬ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা ধার করেছে। এর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে তফসিলি ব্যাংক থেকে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দিয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পুরো সময়ে ব্যাংক থেকে সরকার ধার করেছিল ২৬ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা।