রাজনীতি

ক্লিন ইমেজের নেতৃত্বের সন্ধানে আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে এবার নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীর ওপর এখন ভীষণ ক্ষুব্ধ তিনি। দলের আসন্ন জাতীয় সম্মেলন এবং সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে তাদের পদচ্যুত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারেন শেখ হাসিনা।
আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি আগামী ২ নভেম্বর কৃষক লীগ, ৯ নভেম্বর শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ২৩ নভেম্বর যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগেই এসব সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগরের দুই অংশে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ চার সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। পদপ্রত্যাশীরা সক্রিয় হয়েছেন। কার্যালয়গুলোতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। এখন প্রতিদিন বিকেল হলেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর অফিস উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ায় পদপ্রত্যাশী অনেকেই কোণঠাসা ছিলেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীসহ নিজ নিজ বলয়ে যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেছেন তারা। আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আড্ডা ও শোডাউন দিতে শুরু করেছেন পদপ্রত্যাশীরা। এছাড়া এতদিন সংগঠনগুলোর যেসব নেতাকর্মী শীর্ষ নেতাদের সুনজর কাড়তে সক্ষম হননি, তারাও সক্রিয় হতে শুরু করেছেন।
দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন জমজমাট। দুই অফিসের সামনে টানানো হয়েছে অসংখ্য ব্যানার। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন নেতাদের সঙ্গে কেউ কেউ যোগাযোগ করছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সুনজর পেতে বিভিন্ন কর্মসূচিও নিচ্ছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন অনেকে।
ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে নেতাকর্মীদের খুব বেশি উপস্থিতি দেখা যায়নি যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। তবে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরদিনই জমজমাট হতে শুরু করে যুবলীগের অফিস। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনের সর্বশেষ প্রেসিডিয়াম বৈঠকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। পুরো বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায় যুবলীগ নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল চোখের পড়ার মতো।
সম্মেলন সামনে রেখে যুবলীগের মতো স্বেচ্ছাসেবক লীগ অফিসেও ভিড় অনেক বেড়েছে। অন্যান্য সময়ের চেয়ে এখন এই অফিসে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ায় যোগ্য অনেক নেতাই কোণঠাসা হয়ে আছেন। সম্মেলনের আভাস পেয়ে তাদের তৎপরতাও বেড়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন হয় না প্রায় এক যুগ। সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর মহানগর নেতারাও উজ্জীবিত।
আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল ও সহযোগী ৪ সংগঠনের সম্মেলনের প্রস্তুতিতে যখন দলের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত, ঠিক সে সময়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। আওয়ামী লীগ ও দলের সহযোগী সংগঠনের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ নেতাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ অভিযান। ২১তম জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ নেতারা যখন পদ-পদবি পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে, ঠিক সে সময়ে এ অভিযান তাদের ভড়কে দেয়। আওয়ামী লীগের পদ-পদবি পাওয়ার আশা বাদ দিয়ে তারা আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন ক্লিন ইমেজধারী নেতারা। তারা এই ভেবে উজ্জীবিত হন যে, এতদিন তারা দুর্নীতিবাজ নেতাদের দাপটে দলে যেভাবে কোণঠাসা ছিলেন, এখন আর সেরকম থাকতে হবে না। আগামী কাউন্সিলে তারা যোগ্যতা অনুযায়ী পদ-পদবি পাবেন।
জানা গেছে, এবার জাতীয় কাউন্সিল ও চার সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের আগে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ জন্যই এ কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কোনো বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ দলের নেতৃত্বের পদে ভিড়তে না পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল ও চার সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে অনেক পরিবর্তন আসবে। অনেকেই বাদ পড়ে যাবেন। শেখ হাসিনার নির্দেশের পর উপজেলা ও জেলা থেকে অনেকের দুর্নীতি ও অপরাধের তথ্য আসছে। তবে আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজধারী নেতাকর্মীরা মনে করেন, দল থেকে দুর্নীতিবাজদের বের করে দিলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে এবং দল শক্তিশালী হবে।
জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, এই অভিযানে ত্যাগী নেতাকর্মীরা খুশি। দুর্নীতিবাজদের দাপটে এবং এমপিদের লোকজনের দৌরাত্ম্যে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অতিষ্ঠ। তাই চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ফলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেমন খুশি, জনগণও তেমনি খুশি।
সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের চার সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে এবার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। মেয়াদপূর্তির পর প্রায় ৪ বছর পার হয়ে যাওয়ায় চার সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের বিলাসিতা ভর করেছে। দলের ভাবমূর্তির চেয়ে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত লাভকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। এ কারণেই শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চার সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজাবেন। আর এরই অংশ হিসেবেই নতুন পদ-পদবি পাওয়ার জন্য নেতাদের মধ্যে শুরু হয়েছে দৌড়ঝাঁপ। পুরনো পদ-পদবিওয়ালারাও ক্লিন ইমেজধারী হওয়ার চেষ্টা করছেন।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশকারী বা হাইব্রিড নেতাদের তালিকাও রয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতির হাতে। এই তালিকায় আছে প্রায় দেড় হাজার জন। তারা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। সরকারি দলের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তারা সুবিধাভোগী। বিগত ১০ বছরে দলটিতে অনুপ্রবেশ করেছে তারা। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ফ্রিডম পার্টিসহ বিভিন্ন দল তো বটেই, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষের প্রজন্মও অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় রয়েছে। তালিকাভুক্ত এসকল অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জানা গেছে, সর্বশেষ আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যাকা-ে যে ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে তার মধ্যে অন্তত ৩ জন ছাত্রশিবির থেকে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করেছে। ২০০৯ সালের পর থেকে যারা আওয়ামী লীগে বা অঙ্গ সংগঠনে ঢুকেছে, তাদের অনুপ্রবেশকারী এবং দলের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। দলের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী হিসেবে তারাই চিহ্নিত হচ্ছে যারা অর্থ আত্মসাত করা বা দুর্নীতি করে ফুলেফেঁপে উঠেছে। যারা দলের প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদকের মামলায় জড়িত বা চার্জশিটভুক্ত তারাও চিহ্নিত হচ্ছে। চিহ্নিত করা হচ্ছে দলে অনুপ্রবেশ করে সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ, নিয়োগবাণিজ্য ও দলীয় কোন্দলে জড়িত ব্যক্তিদেরও। দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, যারা দলের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্মে নিজেদের জড়াচ্ছে তাদের আগামী জাতীয় কাউন্সিল ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে দল থেকে বহিষ্কারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীর অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, শেখ হাসিনার ওপর হামলাকারী ফ্রিডম পার্টির লোকজনও ঢুকে পড়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকা দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, খালেদ মাহমুদ একসময় ফ্রিডম পার্টি করত। তারপর যুবদল হয়ে যুবলীগে ঠাঁই নিয়েছে। পরে জানা গেল, খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া শুধু ফ্রিডম পার্টি নয়, শেখ হাসিনার ওপর হামলা মামলার আসামিও ছিল। একইভাবে টেন্ডার সম্রাট জি কে শামীম এক সময় মির্জা আব্বাসের ডান হাত ছিল, করতো যুবদল। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে দল বদলে যুবলীগ হয়ে গেছে জিকে শামীম।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় শ্রীমঙ্গল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানকে। পাগলা মিজানও একসময় ফ্রিডম পার্টি করত এবং শেখ হাসিনার ওপর হামলা মামলার আসামি ছিল।
তাছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি সাব-কমিটি (উপ-কমিটি) গঠন করা হয়েছে যাতে এমন ব্যক্তিরা স্থান পেয়েছেন যারা জেলা, থানা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নয়। অথচ দলটির কেন্দ্রীয় সাব-কমিটিতে কিভাবে স্থান পেয়েছে, কারা স্থান করে দিয়েছে তা-ই এখন দলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন। জামায়াত হোক, শিবির হোক, বিএনপি হোক, ফ্রিডম পার্টি হোক তারা তো নিজেদের অতীত ঢাকতে, সুবিধা পেতে আওয়ামী লীগের আড়াল চাইবেই। প্রশ্ন হলো, কারা তাদের আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার, বড় পদ বাগিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে তাদের বিষয়েও খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।
বিএনপি, জামায়াত, ফ্রিডম পার্টির নেতাকর্মীরা খোলস বদলে আওয়ামী লীগে ঘাপটি মেরে থাকার বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অনেক আগেই বলেছিলেন, ছাত্রলীগে শিবির ঢুকেছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও অনেকদিন ধরেই আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বক্তব্য দিয়ে আসছেন। ওবায়দুল কাদের কখনও তাদের ‘হাইব্রিড’, কখনও ‘কাউয়া’ বলেছেন। এখন এই হাইব্রিডদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে আগামী কাউন্সিল ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে। অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব পদে নিয়ে আসা হবে। ফলে আসন্ন কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলের হাইব্রিড নেতারা এখন শঙ্কিত আর ক্লিন ইমেজধারী নেতারা উচ্ছ্বসিত।