আন্তর্জাতিক

চীন-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির সুবাতাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারত ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন যুগ শুরু হয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সন্ত্রাসবাদ দমনে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবে। আর বাণিজ্য, যোগাযোগ, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও জোরাদার করে তুলবে নয়াদিল্লি ও পেইচিং।
কাশ্মির নিয়ে জটিলতার পরপরই সি চিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এরই মধ্য দিয়ে শান্তির সুবাতাস বয়ে যাবে গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।
কাশ্মির সংক্রান্ত ৩৭০ ধারা ভারত তুলে নেয়ার পর আন্তর্জাতিক আঙিনায় পাকিস্তানকে কার্যত খোলাখুলি সমর্থন করেছিল চীন। জাতিসংঘের বৈঠকে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পেইচিংয়ের অবস্থানও স্পষ্ট ছিল। এরপর লাদাখ সীমান্তে ভারতীয় ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে। এমন এক পরিবেশের মধ্যেই ভারত সফরে আসেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। তাকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেয় নয়াদিল্লি।
গত ১১ অক্টোবর চেন্নাই বিমানবন্দরে সি চিনপিংকে স্বাগত জানান তামিলনাড়–র রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী। বিমানবন্দরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও চীনের প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দরে সি পা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই টুইটারে তাকে স্বাগত জানান নরেন্দ্র মোদি। বিমানবন্দর থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে চীনের প্রেসিডেন্ট মমল্লপুরমে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যায় একসঙ্গে পাশাপাশি বসে ভারতীয় নৃত্যকলা উপভোগ করেন সি চিনপিং ও নরেন্দ্র মোদি। অন্ধকার নামতেই অপরূপ শোভা দেখা যায় মমল্লপুরমের মন্দিরের। ওখানেই নৈশভোজ সারেন দুই নেতা। চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য ছিল দক্ষিণ ভারতীয় নানা সুস্বাদু পদের আয়োজন। বিভিন্ন স্থাপত্য ঘুরে দেখে আলোচনার ফাঁকে ডাবের পানিতে তৃষ্ণা নিবারণ করেন দুই রাষ্ট্রনেতা।
মোদির সঙ্গে দুই দফা বৈঠকে বসেন সি চিনপিং। চিনপিংয়ের সঙ্গে এবারের বৈঠককে ‘চেন্নাই কানেক্ট’ বলে অভিহিত করেছেন নরেন্দ্র মোদি। গত বছর চিনপিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কথা উল্লেখ করে মোদি বলেন, ‘উহানের শীর্ষ সম্মেলন দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্ক জোরদার করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। আর চেন্নাই কানেক্টে দুই দেশই পারস্পরিক সম্পর্কে একটি নতুন যুগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর চিনপিং বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমার বন্ধুর মতো কথা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা হয়েছে খুবই আন্তরিকভাবে। নতুন যুগ শুরু হলো দুই দেশের সম্পর্কে।’
কাশ্মির নিয়ে কোনো অস্বস্তি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য বিষয়টি নিয়ে মোদি ও চিনপিংয়ের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। সেই দিক থেকে বৈঠকের বড় সাফল্য হলো কাশ্মির নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে চাপ চীন তৈরি করছিল, তা থেকে দুই পক্ষ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে কাশ্মির নিয়ে বড় ধরনের কোনো বিরোধিতা পেইচিং করবে না বলেও নয়াদিল্লি প্রত্যাশা করছে।
অনেকের ধারণা ছিল, মোদির সঙ্গে বৈঠকের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট কাশ্মির ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন। কারণ সম্প্রতি চীন সফরে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সেখানে যৌথ বিবৃতিতে চিনপিং বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান যেসব ইস্যুকে মৌলিক মনে করে, সেগুলোর প্রতি চীনের সমর্থন রয়েছে এবং কাশ্মিরের দিকে পেইচিং নজর রেখেছে।’ ওই বিবৃতির পরই পাল্টা বিবৃতি দেয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, ‘ভারতের অবস্থান সম্পর্কে চীন ভালোভাবেই জানে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কোনো দেশের মন্তব্য করা উচিত নয়।’
এরপরও চিনপিংয়ের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে আলোচনা হতে পারে বলে প্রত্যাশা ছিল পাকিস্তানের। চিনপিং ভারতে পৌঁছার ঘণ্টাকয়েক আগে কাশ্মির ইস্যুতে ইমরান খান বলেন, ‘কাশ্মির নিয়ে ভারত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কেন কাশ্মিরের খবর তুলে ধরছে না, তা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
চীন ও ভারত নিকট-প্রতিবেশী দুটি দেশ। প্রভাববলয় বিস্তারের রাজনীতিতে দেশ দুটির মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা থাকলেও পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির কারণে ভারতের যেমন প্রয়োজন রয়েছে চীনের সাহায্য ও সহযোগিতার, তেমনি চীনেরও প্রয়োজন রয়েছে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতার। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের কর্তৃত্ব ও প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রিকস ব্যাংক। এখন চীন ও ভারত যদি নিজেদের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রাখে, তাহলে ব্রিকস ব্যাংক বিকশিত হবে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিকিমকে স্বাধীন করার যে চীনা বক্তব্য, তা-ও গ্রহণযোগ্য নয়। এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপের শামিল। চীন এটা করতে পারে না। সাধারণত চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় নাক গলায় না। কিন্তু সিকিম প্রশ্নে চীনা গণমাধ্যমের বক্তব্য একটা ব্যতিক্রম।
একুশ শতকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান বিশ্বের সব অর্থনীতির হিসাবনিকাশ বদলে দিয়েছে। ব্রিকসে চীন ও ভারতের অন্তর্ভুক্তি এবং মোদি-চিনপিং ঘন ঘন বৈঠক সত্ত্বেও এশিয়ার এই দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।
ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জনাথন হোলসলাগ, একটি সম্ভাব্য ‘ঈযরহফরধ’ ধারণার কথা বলেছিলেন, যেখানে চীন ও ভারত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই ধারণা অমূলক নয়। সি চিনপিং ভারত সফর করেছেন। গত বছর মোদিও চীন সফর করেছেন। কাশ্মির ও অরুণাচল সমস্যা নিয়েও ভারত ও চীনের মধ্যে এক ধরনের স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ভারত-চীন বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু বৃহৎ এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর সুবাতাস ছড়িয়ে পড়বে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই।