প্রতিবেদন

পানিচুক্তির মাধ্যমে ভারতকে দায়বদ্ধতায় ফেলা গেছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ফেনী নদীর পানিচুক্তির মাধ্যমে মাত্র ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি দিয়েই ভারতকে দায়বদ্ধতার মধ্যে ফেলা গেছে। এখন বিশ্ববাসীর সঙ্গে তাদের পত্রপত্রিকাও বলছে, ভারত তিস্তার পানি না দিলেও বাংলাদেশ এ ব্যাপারে মহানুভবতা দেখিয়েছে।
১২ অক্টোবর সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, চুক্তির মাধ্যমে না দিলে তারা তো টিউবওয়েল পাম্প দিয়ে এর চেয়ে বেশি পানি নিয়ে নিত। এখন একটা দায়বদ্ধতায় পড়েছে তারা, এর চেয়ে বেশি পানি নিতে পারবে না। আর খাওয়ার পানি চাইলে কাউকে ‘না’ করাও তো যায় না!
জানা গেছে, ফেনী নদীর যে পানিবণ্টন চুক্তি সেটি এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে। এর বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই হচ্ছে এবং শিগগিরই ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি হবে। সম্প্রতি ফেনী নদী থেকে ভারতকে প্রতিদিন যে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে সেটা শুধুই মানবিক কারণে, সাব্রুম শহরে পানি সরবরাহের জন্য। চুক্তির সময় এই ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি তাদের প্রাপ্য থেকে সমন্বয় করা হবে। আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে যে পানিবণ্টন চুক্তি, এটা আসলে তা নয়।
জানা গেছে, ভারত ফেনী নদীর অর্ধেক পানি দাবি করেছিল। কিন্তু এ নদীর ৬০ ভাগ পানির অধিকার বাংলাদেশের।
যৌথ নদী কমিশন সূত্র জানায়, ২০১০ সালে কমিশনের ৩৭তম বৈঠকে ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের মানুষের খাবার পানি সরবরাহের জন্য ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের সিদ্ধান্ত ছিল। ২০১২ সালে কারিগরি কমিটির বৈঠকে ৭টি শর্তসাপেক্ষে খাবার পানি সরবরাহের জন্য ‘লো লিফট’ পাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। গত আগস্টে ঢাকায় সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ এ প্রতিশ্রুতি রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ অক্টোবর ভারতে হাসিনা-মোদি শীর্ষ বৈঠকে এ নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এবারের সমঝোতা অনুযায়ী, ফেনী নদী থেকে প্রতিদিন ভারত প্রতি সেকেন্ডে ৫২ লিটার এবং দিনে প্রায় ৪৫ লাখ লিটার পানি তুলবে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, মানবিক কারণে সাব্রুমের পানিসংকট মেটাতে যে পানি দেয়া হচ্ছে, শুষ্ক মৌসুমে মোট পানির সেটি মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ।
এবার ভারতকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের সম্মতি দেয়া হয়েছে ৭টি শর্তে। শর্তগুলো হলো লঞ্চিং অ্যাপ্রোচের প্রশস্ততা ৭ দশমিক ৬৫ মিটারের পরিবর্তে ৪ দশমিক ৫ মিটার হবে। পাম্পের বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশে তা সরবরাহ করতে হবে। পানি উত্তোলনের পরিমাণ ১ দশমিক ৮২ কিউসেকের বেশি হবে না, যা উভয় দেশের প্রকৌশলীরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন। বাস্তবায়নের পর উভয় দেশের প্রকৌশলীদের দ্বারা পাম্পের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি সরবরাহ পাইপ একটির বেশি হবে না। ইনটেক ওয়েলের (কূপ) অবস্থান যৌথভাবে উভয় দেশের প্রধান প্রকৌশলীরা নির্ধারণ করবেন। ইনটেক ওয়েলের বিপরীতে ফেনী নদীর বাংলাদেশের দিকে ভাঙন দেখা দিলে ভারতীয় পক্ষ ওই অংশের নদীতীর সংরক্ষণমূলক কাজ বাস্তবায়ন করবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ফেনী নদীতে বর্ষা মৌসুমে ৮ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে এ পানির প্রবাহ থাকে মাত্র ৫০ কিউসেক। অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ড যেখানে পানি পরিমাপ করে, ভারত তার ৫ কিলোমিটার উজানে পানি পরিমাপ করে থাকে। তাই যৌথ নদী কমিশনে ভারতীয় তথ্য অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে ফেনী নদীতে পানি প্রবাহ থাকে ১০৯ কিউসেক।
যৌথ নদী কমিশন বলছে, পানিপ্রবাহের যে ফিগারটা ভারত বলছে এবং বাংলাদেশ যা বলছে, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। এটা নিয়ে যৌথ নদী কমিশন শিগগিরই মিটিং করতে যাচ্ছে। সেখানে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে ফেনী নদীতে চুক্তি ছাড়াই পাম্প বসিয়ে পানি তোলার অভিযোগ আছে ভারতের বিরুদ্ধে। উজানে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে কি না সে প্রশ্নের চেয়ে স্থানীয় মানুষের কাছে বিদ্যমান ভারতীয় পাম্পগুলো নিয়েই প্রশ্ন বেশি। ফেনীর রামগড় এলাকায় নদীর তীরে ভারতীয় অংশে এ রকম পানির পাইপ এবং পাম্প মেশিনের অস্তিত্ব দেখা গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, ২০০২ সাল থেকে এখান থেকে পানি তুলছে ভারত। বিজিবির পক্ষ থেকে এ নিয়ে প্রতিবাদও করা হয়েছে।
রামগড়ে অবস্থিত ৪৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারিকুল হাকিম স্বদেশ খবরকে বলেন, সীমান্তে ৩৬টি পাম্প মেশিন দিয়ে পানি তুলছে ভারত। নো ম্যান্স ল্যান্ড থেকে এগুলো সরিয়ে নিতে বিএসএফের সঙ্গে বৈঠকে তাগাদা দেয়া হলেও জানানো হয়েছে, এটি তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি দেয়ার যে চুক্তি হয়েছে, সেটা তেমন কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু এখনই যে পাম্পগুলো ভারতের অংশে বসানো আছে তার প্রতিটির ন্যূনতম পানি তোলার ক্ষমতা ২ কিউসেক। ২০ বছর আগে ফেনী নদীতে শুষ্ক মৌসুমে ১২০ কিউসেক পানির প্রবাহ ছিল। সেটা এখন ৫০ কিউসেকে নেমে এসেছে। এর কারণ তারা উজানে পাম্প দিয়ে পানি প্রত্যাহার করছে।
যদি এখন ১ দশমিক ৮২ কিউসেক নেয়া হয়, তা হলে অন্যান্য যে ৩৬টি পাম্পে ভারত পানি ওঠাচ্ছে তার কী হবে Ñ এ বিষয়ে যৌথ নদী কমিশন বলছে, এ বিষয়ে অফিসিয়ালি কোনো তথ্য যৌথ নদী কমিশনের কাছে নেই। ভারত যদি পানি তুলে থাকে সেটা হতে পারে। বাংলাদেশও তার নিজ অংশে প্রয়োজনে পানি তুলে থাকে। এটা ঠিক একতরফা নয়। উভয়ের প্রয়োজনে উভয়ে তুলে থাকে। এটা চুক্তিবহির্ভূত যেসব নদী আছে, সেখানে হয়েই থাকে। ৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর যে পানিবণ্টন চুক্তি হতে যাচ্ছে, তখন এগুলো সমাধান হয়ে যাবে।