প্রতিবেদন

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ পালিত হয়। এ উপলক্ষে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এ বি তাজুল ইসলাম এবং সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল বক্তৃতা করেন। ‘দুর্যোগসহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় দু’জন ‘দুর্যোগসহনীয় বাসগৃহ’ প্রাপ্ত ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার শিউলি রানী শীল এবং কুড়িগ্রামের মো. শহীদুল ইসলাম অনুষ্ঠানে তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সেরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এ বছর ৮২ জনকে ‘সিপিপি’ পুরস্কার দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে তিনজনের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। তারা হচ্ছেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বুলবুল জান্নাত, ভোলার লালমোহন উপজেলার এ কে এম কামরুল ইসলাম এবং খুলনার মোংলা উপজেলার সুস্মিতা ম-ল। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অগ্রগতি তুলে ধরে ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠান থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নবনির্মিত ১০০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১১ হাজার ৬০৪টি দুর্যোগসহনীয় বাড়ি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন গৃহহীন ৩টি পরিবারকে দেয়া দুর্যোগসহনীয় ৩টি টিনশেড ঘর প্রদানের মাধ্যমে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের কালি এলাকায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এ কর্মকা-ের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকা- Ñ এসবে ক্ষয়ক্ষতি যাতে হ্রাস পায় তার জন্য যা ব্যবস্থা নেয়ার এরই মধ্যে আমরা তা নিয়েছি, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে এবং সবাই মনে করে, এটাও বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার রয়েছে। অনেকে আমাদের কাছ থেকে এটা এখন জানতে চায়।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত থাকবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিশ্বে এখন আমরা শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও রোল মডেল হিসেবে একটা সম্মান পেয়েছি।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কথা তুলে ধরে যেকোনো ধরনের দুর্যোগের জন্য সকলকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ আসুক আর প্রাকৃতিক দুর্যোগই আসুক সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত থাকবে, সেটাই আমি চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর জুলাই মাসে ঢাকায় গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপ্টেশনের সভা হয়েছে। সেখানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন দুর্যোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বিশ্ব অভিযোজন কেন্দ্র- ঢাকা অফিস’ স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় তাঁর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সাফল্যগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আমরা দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলী-১৯৯৭ প্রণয়ন করেছিলাম। পরবর্তীতে আমরাই আবার ২০১০ সালে এটি হালনাগাদ করি। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল গঠন করি। ২০১২ সালে সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন করা হয়েছে, যা দুর্যোগ মোকাবিলা, ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারা মানুষের দুর্দশার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে ২০১৫ সালে আমরা একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করি এবং জাতীয় রিজিলিয়েন্স পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যা সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ও এসডিজি’র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এছাড়াও সরকার ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (এনইওসি) প্রতিষ্ঠা করেছে। বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য পূর্বাচলে একটি স্টেজিং এরিয়া নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘূর্ণিঝড় থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় ১৭২টি সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণ করেন। স্থানীয় লোকজন এর নাম দিয়েছিলে মুজিব কেল্লা। তারই আলোকে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। দুর্যোগ মোকাবিলায় বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে আমাদের। তাছাড়া ৩২ হাজার নগর স্বেচ্ছাসেবক, ২৪ লাখ আনসার ভিডিপি, ১৭ লাখ স্কাউটস, ৪ লাখ বিএনসিসি, গার্লস গাইডের প্রায় ৪ লাখ সদস্য – তারাও এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যেকোনো দুর্যোগের সময় তারা সকলে সেখানে উপস্থিত হয় এবং কাজ করে।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা সব সময় যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে পূর্বাভাস দেয়া, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই লোকগুলোকে সাইক্লোন শেল্টারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করি। দুর্যোগকালে করণীয় বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও সচেতন করা হয়। এর ফলে এখন ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা একেবারে নাই।
হেলিকপ্টারে করে পাহাড় ও দ্বীপ অঞ্চলে ‘ব্যাপক হারে’ বীজ ছড়িয়ে বনাঞ্চল সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আপতকালীন সময়ে গৃহস্থালীতে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য হাউজহোল্ড সাইলো সরবরাহ করে যাচ্ছি।
নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে আমরা মানুষকে দুর্যোগসহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ করে দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশে একজন গৃহহারা মানুষও থাকবে না।
বাংলাদেশ যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছে সেখান থেকেও দুর্যোগকালে সুবিধা নেয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।