প্রতিবেদন

বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাবের মধ্যেও ভালো করছে বাংলাদেশ: আইএমএফ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আইএমএফ আরো বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাবের মধ্যেও ভালো করছে বাংলাদেশ।
এর আগে বিশ^ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের অনুরূপ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল এবং এই দুই সংস্থাও বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই এগুচ্ছে।
আইএমএফ-এর তথ্যমতে, চীন-মার্কিন বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতেই পড়ছে। বর্তমান সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি সবচেয়ে ধীর গতিতে এগোচ্ছে। বাণিজ্যবিরোধ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ^ অর্থনীতিতে যখন এমন মন্দাভাব বিরাজ করছে, ঠিক তখন বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রশংসার চোখে দেখছেন আইএমএফের অর্থনীতিবিদরা। এই প্রাক্কলন প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফের এ পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে এবার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সম্প্রতি প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ।
গত মাসে প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থমন্ত্রী মন্ত্রিসভাকে অবহিত করে বলেন, ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ পর্যন্ত এই ১০ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বিশ্বে সবার উপরে। গত ২৯ আগস্ট ‘দ্য স্পেক্টেটর ইনডেক্স’ প্রকাশিত বিশ্বের ২৬টি শীর্ষ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের তথ্যের ভিত্তেতে এ বিষয়টি তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
এদিকে সদ্য প্রকাশিত আইএমএফ আউটলুক প্রতিবেদন অনুষ্ঠানে সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ জানান, সামনের দিনগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। চলতি বছরের তুলনায় ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে দশমিক ৫ শতাংশ। যেকোনো দেশেই প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধ অর্জনে শক্তিশালী মুদ্রানীতি একটা বড় ভূমিকা রাখে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সফলতা দেখাতে পারছে না। এখানকার আর্থিক খাতের নীতিমালাগুলো ঘন ঘন পরিবর্তন হয়। স্বাভাবিকভাবে প্রবৃদ্ধি কিছু কমছে ঠিকই, কিন্তু শেষ হয়ে যাওয়ার মতো সময় হয়নি। সুতরাং এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে সবাইকে।
আইএমএফ বলছে, চলমান প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। যদিও এক্ষেত্রে শক্তিশালী মুদ্রানীতি আর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ।
গীতা গোপীনাথ বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় বাড়ানো খুব জরুরি। কারণ, কাউকে পেছনে ফেলে অর্জিত উন্নয়ন টেকসই হয় না। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও অর্থনীতির দেশগুলো এক ধরনের আধিপত্য দেখাচ্ছে, এটা ঝুঁকিও তৈরি করছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির আশঙ্কা করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর কয়েক দফায় বাড়বে তেল, স্বর্ণ, হীরা ও প্লাটিনামের দাম।
আইএমএফ বলছে, চলতি বছর শেষে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ শতাংশ। ২০০৯ সালের পর এটাই হবে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। অর্থনীতিতে নানা আশঙ্কা সত্ত্বেও উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে বলে আশা করছে আইএমএফ। পূর্বাভাস অনুযায়ী এ বছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী বছর এই হার কমে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।
আইএমএফের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এশিয়ার উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে প্রবৃদ্ধি হবে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের পরই থাকবে নেপাল; ৭ দশমিক ১ শতাংশ। পূর্বাভাস অনুযায়ী ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ১ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ভিয়েতনাম সাড়ে ৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার পেছনে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করছে আইএমএফ।
আইএমএফ তার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে এর সদস্য ১৮৮টি দেশের অর্থনীতি কেমন যাবে, তা নিয়ে প্রক্ষেপণ রয়েছে। ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। আইএমএফ বলছে, ২০০৭-০৮ সালে শুরু হওয়া বিশ্ব মন্দার পর এটি সবচেয়ে কম অগ্রগিত। ২০১৭ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, এবার ২০১৯ সালে ৩ শতাংশে নেমে আসবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি।
সংস্থাটি বলছে, বাণিজ্য শুল্ক এবং ভূ-রাজনীতির কারণে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তবে ২০২০ সাল নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা করছে আইএমএফ। ৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে ২০২০ সালে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নত বিশ্বের প্রবৃদ্ধি এ বছর ১ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা ২০২০ সাল নাগাদ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। গত বছরের তুলনায় তুরস্ক, আর্জেন্টিনা ও ইরানের অর্থনীতির গতি কমেছে। তুলনামূলক ভালো করেছে ব্রাজিল, মেক্সিকো, ভারত, রাশিয়া ও সৌদি আরব। উচ্চ শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করছে। চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।